রাজনীতি

জিয়া অরফানেজ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ : খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী

নিজস্ব প্রতিবেদক
আর্থিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক গতিকে ব্যাহত করে এবং এর বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়। তাই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাতের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ৬ আসামিই রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের দুর্নীতির মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এমনই অভিমত দিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই মামলার আসামিগণ কর্তৃক যোগসাজশে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। পরিমাণের দিক থেকে তার বর্তমান বাজারমূল্য অধিক না হলেও তর্কিত ঘটনার সময়ে ওই টাকার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া ওই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন। আসামি কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সরকারি কর্মচারী হয়েও আসামি খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা এবং পরবর্তী সময়ে ওই হিসাব থেকে ২টি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বেআইনিভাবে দেয়া বর্ণিত ২ আসামিকে অপরাধ করতে সহায়তার শামিল। আসামি তারেক রহমান, মমিনুর রহমান ও শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে এই মামলার ৬ আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন মর্মে অত্র আদালত মনে করে।
দুই ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলেও একটি ধারায় দ- প্রদান সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী খালেদা জিয়া’র মিনস রিয়ো (মৌন সম্মতি) নিয়ে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দুই ভাগে ভাগ করে দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে হস্তান্তর করেন, যার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট অন্যতম। ওই ট্রাস্টে ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা স্থানান্তরের পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সেখানে জমা হয়। আসামি তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান ট্রাস্টের নামীয় এসটিডি ৭নং হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রথমে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ২ দশমিক ৭৯ একর জমি কেনেন। অবশিষ্ট টাকা প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করেন। তৎপরবর্তী সময়ে কাজী সালিমুল হক কামাল ও গিয়াস উদ্দিনের হাত হয়ে আসামি শরফুদ্দিনের হাতে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা চলে যায় এবং তা আত্মসাৎ করা হয়। এগুলো সবই আসামিদের মিনস রিয়ো ইঙ্গিত করে। ফলে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (১) ধারায় বর্ণিত ক্রিমিনাল মিসকনডাক্টের উপাদান যেমন এই মামলায় উপস্থিত আছে, ঠিক তেমনি আসামিদের মিনস রিয়োসহ রংফুল গেইনের উদ্দেশ্য বর্ণিত পরিমাণ টাকা বিভিন্ন পন্থায় রূপান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন মর্মেও আদালত মনে করেন। খালেদা জিয়া এ মামলায় আত্মপক্ষ শুনানিতে বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানীতে স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় তাকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই। আদালত মনে করে আসামিরা একে অপরের সহায়তায় যেভাবে টাকা আত্মসাৎ করেন তার একটি প্রিসামটিভ ভ্যালু রয়েছে এবং যা এই মামলা নিষ্পত্তির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আরও বলা হয় আসামিদের মধ্যে একজন ব্যতীত অপর সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেন। দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ওই ধারায় সংঘটিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- বা যেকোনো বর্ণনার কারাদ-, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদ-ে দ-নীয় হওয়ার বিষয়েও বিধান রয়েছে। প্রসিকিউশনপক্ষ থেকে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় আসামি খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মমিনুর রহমান, কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে কাজী কামাল এবং ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী উভয় আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। তবে ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারার বিধান বিবেচনায় গ্রহণ করে পূর্বে বর্ণিত ৫ আসামিকে যেকোনো একটি আইনে দ-িত করে আদেশ প্রচার করা বিধেয় হবে বলে আদালত মনে করে।
সব আসামি সরকারি কর্মচারী এবং মার্চেন্ট কিভাবে হলোÑ এ সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয় দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান পর্যালোচনায় লক্ষ্য করা যায়, এই ধারায় কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করতে হলে তাকে সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার, মার্চেন্ট বা এজেন্ট হতে হবে। আগেই দেখা গেছে, এই মামলায় আসামি খালেদা জিয়া এবং কাজী সালিমুল হক ওরফে কাজী কামাল ঘটনার সময় জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। জাতীয় সংসদ সদস্য বিদ্যমান আইন অনুসারে সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য। আলোচনায় দেখা গেছে, আসামি তারেক রহমান এবং মমিনুর রহমান প্রাইভেট ট্রাস্ট এবং ট্রাস্টি হলেও বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে ট্রাস্টিগণ সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হন। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ মার্চেন্ট বা এজেন্ট হিসেবে গণ্য হন। ফলে তাদের সবার বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯ ধারার বিধান প্রয়োগযোগ্য হবে বলে এই আদালত মনে করে। সরকারি এতিম তহবিলে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাতের আসামিদের একে অপরের সহায়তা করায় দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক সবাই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য মর্মে এই আদালত মনে করে। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ ব্যতীত সব আসামি সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা প্রয়োগযোগ্য বলেও এই আদালত মনে করে। আসামি শরফুদ্দীন আহমেদের ক্ষেত্রে ওই আইনের ৫ (২) ধারা প্রয়োগযোগ্য না হলেও দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারা প্রয়োগযোগ্য হবে। ফলে এই আসামি ছাড়া অপর আসামিদের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে ৫ (১) ধারায় বর্ণিত সকল শর্তাবলি প্রযোজ্য হবে বলে এই আদালত মনে করে।