কলাম

নানামুখী সংকটে কঠিন সময় পার করছে বিএনপি : ঐক্য ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদ- দিয়েছে বিশেষ আদালত। খালেদা জিয়া বর্তমানে জেলে রয়েছেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি তার জামিন হতেও পারে আবার না-ও হতে পারে। বিএনপি চেয়ারপারসন জেলে থাকায় এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে ফেরারিজীবন অতিবাহিত করায় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই প্রথম দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি অভিভাবকহীন সময় পার করছে। এই অবস্থায় দলটি দুই-তিনভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পাশাপাশি বিএনপির সিনিয়র নেতারাও অভিযোগ করছেন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে সরকার বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে।
বিএনপিকে ভেঙে কয়েক টুকরা করার সব উপাদান এখন রাজনীতিতে বিদ্যমান। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি এখন কা-ারিবিহীন অবস্থায় আছে। দলের চেয়ারপারসন দুর্নীতির মামলায় কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফেরারি। এ অবস্থায় দলটির সুবিধাবাদী পক্ষের জন্য ভিন্ন বিএনপি গঠন করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। দলের একটি পক্ষ এ বিষয়ে সক্রিয়ও আছে। মেজর হাফিজ (অব.), লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.), সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, আমানউল্লাহ আমান, মির্জা আব্বাসসহ আরো কয়েকজন নেতার কার্যক্রমের প্রতি বিএনপির সিনিয়র নেতারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। দৃশ্যতই বোঝা যায়, বিএনপি বর্তমানে মোটা দাগে দুইটি সংকটের মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করছে। এর একটি হলো চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং আরেকটি হলো বিএনপির ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা। মূলত দুইটি ভিন্নধর্মী সংকট মোকাবিলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দলটির ঐক্য ধরে রাখতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা নিদারুণ হিমশিম খাচ্ছেন। খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে দলটি অহিংস আন্দোলন করবে না সহিংস আন্দোলন করবেÑ সে বিষয়েও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আছেন দোটানায়। দলটির একটি পক্ষ চাচ্ছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে। আরেকটি পক্ষের ভাষ্য হলো খালেদা জিয়া স্বাভাবিক নিয়মেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাবেন। তার জামিনের জন্য দুর্বার আন্দোলন করে শক্তিক্ষয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। এর জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনই যথেষ্ট। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিএনপি স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বিষয়ে সহিংস ও অহিংস আন্দোলন প্রশ্নে। বিএনপিকে ভেঙে যে গ্রুপটি নতুন বিএনপি গঠনে উন্মুখ, তারা চাচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলুক। অর্থাৎ এই গ্রুপটি আন্দোলনকে এখনই রাজপথে নিয়ে আসতে চাইছে। এই গ্রুপের ধারণা বিএনপি রাজপথে কঠিন আন্দোলন চালালে জননিরাপত্তার স্বার্থে স্বাভাবিকভাবে সরকারি অ্যাকশন বেড়ে যাবে। এতে আন্দোলনকারী বিএনপির সিনিয়র নেতারা থাকবে দৌড়ের ওপরে। আর এই সুযোগে একটি ভিন্ন বিএনপি গঠন করা যাবে।
বিএনপির যে গ্রুপটি দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য উন্মুখ, তারা চাচ্ছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ঘিরেই যেন দলটি সব শক্তি ক্ষয় করে না ফেলে। সে মতেই তারা এগোচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে তারা মানববন্ধন করেছেন, অনশন করেছেন, কালো পতাকা মিছিল করেছেন। কিন্তু হরতাল-অবরোধের মতো কোনো সহিংস আন্দোলনে তারা যায়নি। বিদেশি কূটনীতিকসহ অনেকেই বিষয়টি পছন্দ করলেও বিএনপির তৃণমূলই আছে এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে। তৃণমূলের কথা হলো খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে এভাবে নি®প্রাণ আন্দোলন করলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে কিছুতেই মুক্ত করা যাবে না। সে হিসাবে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে অথবা নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
আরেকটি বিষয়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আছে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। সেটি হলো দলটি এখন সহায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করবে না খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করবে। বিএনপির সিনিয়র নেতারা ভালো করেই বুঝতে পেরেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বেগবান করলে সহায়ক সরকারের আন্দোলন হালে পানি পাবে না। আবার সহায়ক সরকারের আন্দোলন করলে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি হয়ে পড়বে বিলম্বিত। আর খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত হলে বিএনপির যে গ্রুপটি নতুন বিএনপি গঠনে উন্মুখ, তাদের পথ হয়ে যাবে পরিষ্কার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য স্বদেশ খবরকে জানান, খালেদা জিয়া আইনজীবীদের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের যেকোনো উসকানির ফাঁদে পা না দিতে সতর্ক থাকতে বলেছেন। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকতে বলেছেন; কিন্তু বিএনপির তৃণমূল নেতাদের মতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকলে সরকার পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে খালেদা জিয়াকে কিছুতেই মুক্তি দেবে না। খালেদা জিয়ার মুক্তি যত বিলম্বিত হবে, বিএনপির ভাঙন ততই ত্বরান্বিত হবে। সরকার যদি বিএনপিকে ভাঙতে চায়, তাহলে তারা কিছুতেই খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবে না। অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনকে স্থায়ীভাবে জেলে রাখারই চেষ্টা করবে।
স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে যাবে না। একইভাবে সরকারি দলও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে না গেলে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবে না। ফলে বিএনপির এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়িয়েছে। আগামী কয়েক দিনে বিএনপিকে সুনির্দিষ্ট যেসব সিদ্ধান্তে আসতে হবে, সে নিয়েও দলটি আছে নানামুখী চাপে। দলটিকে যেসব সিদ্ধান্তে আসতে হবে সেগুলো হলোÑ খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবে না সহিংস আন্দোলন করবে? বিএনপি খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য আন্দোলন করবে, না সহায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করবে? বিএনপি খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচনে যাবে, না যাবে না? খালেদা জিয়া নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না?
মূলত এসব নিয়েই এখন বিএনপির দিন-রাত কাটছে। কেউ নির্বাচনে যেতে চাচ্ছে, কেউ চাচ্ছে না। কেউ খালেদা জিয়াকে জেলে রাখতে চাইছে, কেউ চাইছে না। কেউ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চাইছে, কেউ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে চাইছে। কেউ তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মানছেন, কেউ মানছেন না। এই চাওয়া ও না চাওয়া এবং মানা ও না মানার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি। চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতেও দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য মরিয়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এখন সময়ই বলে দেবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দলের ঐক্য ধরে রাখতে কতটা মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন।