সাহিত্য

নানারঙের বইয়ে রঙ্গময় বইমেলা

অরুণ কুমার বিশ^াস
মেলার মূল ফটক দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই খপ করে কেউ একজন ধরে ফেলল আমার বাঁ হাতের সুপুষ্ট মণিবন্ধ। মৃদু আলো-আঁধারি ছিল, ভিড়ও নেহাত কম নয় তাই ঠিক ঠাহর হলো না ব্যক্তিটি আসলে কে! যিনি আমাকে টাকিমাছ ধরার মতো করে ধরলেন; তার হাতের চাপ ও মাপ অনুভব করে বুঝলুম, বরাত আজ আমার বিশেষ মন্দ নয়। কোনো নারীই আমাকে পাকড়াও করেছে আজ। কিন্তু তার উদ্দেশ্য বা বিধেয় কী ঠিক ধরা গেল না। তিনি আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চললেন। ক্ষণিক আলোর ঝলকানিতে চেয়ে দেখি সুবেশা সুন্দরী (তবে তন্বী নয়) নারী, চোখে মাদকতা আছে, সেই সাথে নেত্রপাতে অঞ্জনের নিখুঁত প্রলেপ আর ঠোঁটে চওড়া অধর-রঞ্জনী। রেভলন বা এই জাতীয় বিদেশি কোনো ব্র্যান্ড না হয়ে যায় না। মনে মনে বলি, বাহ বাহ! বেশ তো! মর্নিং শোজ দ্য ডে। দিন আজ ভালোই যাবে। টানতে টানতে তিনি আমাকে একটি বিশেষ স্টলের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন। বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বললেন, নিন না একটা! বেরিয়েছে, আমার।
মুচকি হেসে বলি, বেরিয়েছে! আপনার? সত্যি বলতে কি, আমি কিন্তু তখনও তাকে ঠিক চিনে উঠতে পারিনি। চেহারায় চটক আছে মানছি। কিন্তু এই চোপা তো আমার চেনাজানা কারো নয়! প্রসঙ্গত বলি, আমার রেডি-উইট বা প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বরাবরই কম, তাই বুঝে উঠতে পারলুম না এহেন পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিত। আমি বুঝতে না পারলেও আমার লেখিকা এবং তার চালবাজ পুস্তক বিক্রেতা কিন্তু করণীয় ঠিক করে ফেললেন। আমাকে কঠিন জালে ফাঁসালেন। চৌকস লেখিকা চোখ ঠারা মাত্রই বিক্রেতা ছোকরা দুখানা বই প্যাক করে দিয়ে বললেন, স্যার পাঁচশত ষাট টাকা দিন। আপনি লেখকের নিজের লোক তাই কমিশন বেশি করে দিয়েছি।
নিমেষে আমি স্রেফ বুরবক বনে যাই এবং বুঝতে পারি বরাতদোষে আজ আমি বড়সড় একখানা হাঙরের পাল্লায় পড়েছি। পত্রপাঠ বিদায় না হলে আরো খসবে। চাই কি পাতলুন গুটিয়ে ছুটতে হতে পারে তাড়া-খাওয়া ছিঁচকে চোরের মতোন। রসজ্ঞ পাঠক, আমার এই ফিরিস্তি কিন্তু নেহাত কষ্টকল্পিত নয়। ইদানীং কোনো কোনো পাঠক লেখকের ভয়ে পুস্তকমেলায় আসাই ছেড়ে দিয়েছেন। তার বদলে উনারা রকমারি বা অন্যকোনোভাবে পুস্তক সংগ্রহ করছেন। তাতে সময় ও পয়সা দুটোই বাঁচে।
জোর করে কাউকে দিয়ে বই কেনালে লাভটা আসলে কারÑ লেখকের, নাকি যে প্রকাশক তার! জোরাজুরির দিন কি আর আছে ভাই! এখন পড়াশুনোর হাজারটা তরিকা আছে। অন-লাইনে ঢের বই পড়া যায়। তাছাড়া বই পড়তেই হবে, এমন দিব্যিটা কে দিয়েছে শুনি! আমরা বাঙালিরা বরাবরই খানিক বেশি বুঝি। মানে আর যাই হোক, জ্ঞানের বহর কারো কম লম্বা নয়! অন্যের বই পড়ে গাঁটের টাকা খরচ করার দরকারটা কী! তারচে বরং ছেলেপুলে নিয়ে গা-েপি-ে পিৎজা-পাস্তা গিললেই হয়! লেখকের পি-ি চটকালাম, এবার একটু বেরসিক পাঠকের কথা বলি। আমি আর কী বলবো বলুন, যা বলার তা তো বলে গেছেন নমস্য রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। বাঙালি কি আর পুস্তক পড়বে, তার যত আগ্রহ কামিনী আর কাঞ্চনে। অন্য ধান্ধা ধরেছেন কেউ কেউ। বই প্রকাশ করে সুন্দরী নারীবন্ধু নিয়ে পেখমতোলা ময়ূরের মতো ঘুরছেন। এ যেন অনেকটা মাকড়সার জালের মতো। যাকে বলে ঊর্ণনাভ। বন্ধুর টানে না হোক, তার লাস্যময়ী নারীসঙ্গীটির সামনে ইজ্জতের ফালুদা খেতে না চাইলে একটা বই অন্তত কিনতে হয়! পুস্তক বিক্রির এও এক অভিনব তরিকা, স্বীকার না করে উপায় আছে!
প্রশ্ন হলো আমরা যারা টুকটাক লিখিটিখি বা বলতে পারেন মনের আনন্দে ঘোড়ার ঘাস কাটি নয়ত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই, বই গছাতে আমাদের এত কষ্ট হয় কেন বলুন তো! আমরা কি বই জিনিসটি ভুলতে বসেছি! বছরে একবারই মেলা হয়। কিনুন না ভাই দুটো বই! অনেকেই মেলায় আসেন শুধু অন্যকে দেখতে বা নিজের ঠাটবাট দেখাতে! বইমেলা নয়, যেন বউমেলায় এসেছেন। ইনিয়ে বিনিয়ে ক্লাসমেটকে প্রেম নিবেদন করাটাই যেন মূল অভীপ্সা। পাঠক যেমন বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, আমরা লেখক-প্রকাশকরাও তেমনি তাদের বাঁধতে জানি না। হাজার চারেক বইয়ের বেশিরভাগ বই কিন্তু পাতে দেবার অযোগ্য। ভুল বানান শুধু নয়, গলদ বাক্যরীতি, শব্দের সাথে শব্দের আসত্তি বা মুদ্রণ-সৌকর্য কিছুই ঠিক থাকে না। প্রচলিত কথায় মুরগি ধরার মতো করে কিছু লেখক সংগ্রহ করে স্টল সাজিয়ে বসে থাকেন অনেকেই। ব্যতিক্রম আছে মানছি, কিন্তু অনিয়মটাই যেন এখন নিয়ম হয়ে উঠেছে। শুধু বই বের করাই তো নয়, পদক-পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রেও সংযোগের বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। যেন সাহিত্যপ্রসাদ নয় বরং যথোপযুক্ত সংযোগ থাকলেই এখন মিলে যায় নামিদামি সব পদক। তখন রবি ঠাকুরের সুরে বলতে হয়, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। তারে পরতে গেলে লাগে, ছিঁড়তে গেলে বাজে। এ মণিহার আমায় নাহি সাজে।’
বইয়ের নামকরণ ধরনধারণ সবখানেই কেমন যেন খাপছাড়া ভাব। বিলিতি লেখিকা জে কে রাউলিং স্রেফ হ্যারিপটার লিখে পাঁচশ মিলিয়ন কপি বিক্রি করেন, আর আমরা যেনতেন প্রকারে তিনশ বই বেচতে পারলেই যেন বর্তে যাই। বই, সে যেমনই হোক, না পড়ে তো আর মন্তব্য করা যায় না। তাই মোটাদাগে বলতে হয়, দৈন্য আমাদের মানে পাঠককুলের। আমরা মজাসে কুলফি বা কুল-বরই খাই, তাও বই পড়ি না। ভাবখানা এমন যেন পুঁজিবাদপুষ্ট করপোরেট জগতে বইয়ের কী দাম! বসে বসে বসকে তেলাও, তেলিয়ে খেলিয়ে তরতরিয়ে পদোন্নতি নামের মইখানার সবশেষ ধাপে পৌঁছে যাও। জীবন তো ওখানে বসেই তোমাকে হাত নাড়ছে। কাম অন বেবি, সি মি!
সবশেষে বলি, বইমেলা নিয়ে যতই রম্য করি না কেন, এটাই আমাদের একান্ত আশ্রয়। একটুকরো নির্ভেজাল সুখের দিশা সেখানে লুকিয়ে আছে। আসুন আমরা আরো বেশি বেশি করে বউমেলা থুক্কু বইমেলায় যাই, মানুষ দেখি, বই কিনে ও বই পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক