প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে একুশে পদক গ্রহণ করলেন যারা

বিশেষ প্রতিবেদক
অমর একুশের আগের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের একুশে পদক বিজয়ী ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে একুশে পদক তুলে দেন। ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা (সংগীত, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, নাটক ও নৃত্য), সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজসেবা, ভাষা ও সাহিত্যে এ সম্মাননা দেয়া হয়। পদক বিজয়ী প্রত্যেকের হাতে প্রধানমন্ত্রী ১৮ ক্যারেট মানের ৩৫ গ্রাম সোনার একটি পদক, দুই লাখ টাকার চেক ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন। সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম পদক বিতরণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করেন। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেইন খান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, বিচারপতিগণ, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধ্যাপকবৃন্দ, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সাংবাদিকসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের সহযোগিতায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ পরিবেশিত হয়।
একুশে পদকপ্রাপ্তদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার যে আন্দোলন-সংগ্রাম তা ছিল জাতি হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য। রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের মধ্য দিয়েই আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারি। আর আমাদের সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হতে পারে। কাজেই আমরা জাতির পিতার আদর্শ নিয়েই সবসময় এগিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই বিশ্ব দরবারে একটা মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিল্প, সাহিত্য, কলাকুশলী থেকে শুরু করে অনেক রতœ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলাদেশে। শুধু খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসা এবং তাদের মর্যাদা দেয়া। এই মর্যাদা দেয়া এই কারণে যে আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে। আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যকে ধরে রাখতে পারে এবং তারা যেন উৎসাহিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী পদক বিজয়ীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আজকে যারা একুশে পদক পেলেন আমি তাদের আমার শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আগামীতে আমরা এভাবে আরও অনেককে মর্যাদা দিতে চাই। ঢাকাই জামদানি, নকশি কাঁথা ও সিলেটের শীতল পাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের অনেক ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের ঐতিহ্য আর শিল্প-সাহিত্য তুলে ধরার সুযোগ আমাদের আছে। তিনি বলেন, আমাদের গৌরবের অনেক কিছু রয়েছে। সেই গৌরবগাথা আমাদের সংগ্রহ করতে হবে। সেগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ ও প্রচার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের প্রচেষ্টায় ইউনেস্কো কতৃর্ক একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের ঘটনারও বৃত্তান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রায় কুড়ি বছর আগে প্রয়াত রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামসহ কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির উদ্যোগে এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আমাদের একুশ এভাবে পরিণত হয় পৃথিবীজোড়া মানুষের মাতৃভাষা দিবসে।
এ বছর একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হলেনÑ ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক গুরু ভাষাবিদ ড. মো. শহীদুল্লাহর ছেলে ভাষাসৈনিক আ জ ম তকীয়ুল্লাহ (মরণোত্তর) ও শৈল্য চিকিৎসক ভাষাসৈনিক মির্জা মাজহারুল ইসলাম, সংগীতে উপমহাদেশের দিকপাল সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আয়াত আলী খানের ছেলে শিল্পী ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান, শুদ্ধ সংগীত সাধক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও সুরকার সুজেয় শ্যাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার গীতিকার ও শিল্পী ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী মো. খুরশীদ আলম ও বিশিষ্ট সেতারবাদক ওস্তাদ মতিউল হক খান, নৃত্যে মুক্তিযোদ্ধা বেগম মীনু হক (মীনু বিল্লাহ) অভিনয়ে হুমায়ুন ফরীদি (মরণোত্তর), নাটকে নাট্যকার ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিখিল সেন (নিখিল কুমার সেনগুপ্ত), চারুকলায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী কালিদাস কর্মকার, আলোকচিত্রে গোলাম মুস্তাফা, সাংবাদিকতায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও ভাষাসৈনিক রণেশ মৈত্র, গবেষণায় ভাষাসৈনিক অধ্যাপক জুলেখা হক (মরণোত্তর), অর্থনীতিতে মইনুল ইসলাম, সমাজসেবায় নিসচার (নিরাপদ সড়ক চাই) কর্ণধার চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, ভাষা ও সাহিত্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম খান (কবি হায়াৎ সাইফ), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুব্রত বড়–য়া, রবিউল হুসাইন এবং খালেকদাদ চৌধুরী (মরণোত্তর)।
ভাষাসৈনিক আ জ ম তকীয়ুল্লাহ (মরণোত্তর) এর পক্ষে মেয়ে সাংবাদিক ও কলামিস্ট শান্তা মারিয়া, প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদির পক্ষে মেয়ে সারারাত ইসলাম, মরহুমা অধ্যাপক জুলেখা হকের পক্ষে মেয়ে তৃষা হক, মরহুম খালেকদাদ চৌধুরীর পক্ষে ছেলে হায়দার জাহান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একুশে পদক গ্রহণ করেন। সাংবাদিক রণেশ মৈত্র বিদেশে থাকায় তার পক্ষে ছেলে প্রলয় কুমার মৈত্র পদক গ্রহণ করেছেন।