প্রতিবেদন

প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকারের গৃহীত নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে বদলে ফেলা হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার বর্তমান পদ্ধতি। আগামীতে ছাপানো প্রশ্নপত্রে আর পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুদ্রিত প্রশ্নপত্রের বদলে প্রতিটি স্তরের প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষার জন্য প্রশ্নব্যাংক তৈরি করা হবে। বিশেষ একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে র্যানডম সিলেকশনের মাধ্যমে পরীক্ষার দিন সকালে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র তৈরি করা হবে। এরপর পরীক্ষা শুরুর আধঘণ্টা আগে সকাল সাড়ে ৯টার আগে ওই ডিভাইস ব্যবহার করে কেন্দ্র সচিবদের প্রশ্ন জানিয়ে দেয়া হবে। তিনি পরীক্ষা কক্ষের বোর্ডে তা লিখে জানিয়ে দেবেন। এরপর পরীক্ষা নেয়া হবে। এ ছাড়া আগামী এসএসসি থেকে তুলে দেয়া হবে এমসিকিউ প্রশ্নপত্র। ২০ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে শিগগির শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবকসহ সবার সমন্বয়ে বড় একটি সেমিনার আয়োজন করে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হবে। এ সভায় সরকারের তিনজন মন্ত্রী, ছয়জন সচিবসহ ১৮টি সরকারি দপ্তরের প্রধানরা অংশ নেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে সভায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।
জানা গেছে, আগামী পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতিই আমূল বদলে ফেলা হবে। পরীক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িত লোকজনের সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে পুরো পদ্ধতিকে ডিজিটালাইজড করা হবে। পাবলিক পরীক্ষায় আর আগামীতে প্রশ্নপত্র ছাপানো হবে না। ডিজিটাল প্রশ্নব্যাংকের মাধ্যমে যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষার দিন সকালে অটোমেটিক প্রশ্নপত্র তৈরি করা হবে। পরীক্ষা শুরুর আগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্ন সেট ও পাসওয়ার্ড জানিয়ে দেয়া হবে। পরীক্ষার হলে কেন্দ্র সচিবদের একটি করে ডিজিটাল ডিভাইস দেয়া হবে। সকাল সাড়ে ৯টার পর তাতে পাসওয়ার্ড প্রবেশ করানো হলে প্রশ্নপত্র ভেসে উঠবে। তা দেখেই পরীক্ষার হলে দায়িত্বরত শিক্ষকরা বোর্ডে প্রশ্ন লিখে দেবেন। পরীক্ষার কক্ষ বড় হলে প্রয়োজনে কক্ষজুড়ে একাধিক বোর্ড ব্যবহার করা হবে, যেন পেছনের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন দেখতে কোনো সমস্যা না হয়। এভাবে পরীক্ষা নেয়া হবে। প্রশ্নব্যাংকে সারাবছর শিক্ষকরা প্রশ্ন পাঠাতে পারবেন। হাজার হাজার প্রশ্ন এ ব্যাংকে জমা করা হবে। পরীক্ষার দিন তা থেকে নির্ধারিত ১০টি প্রশ্ন যন্ত্রের সাহায্যে বাছাই করে চূড়ান্ত করা হবে। কোন প্রশ্নটি চূড়ান্ত করা হলো তা সকাল সাড়ে ৯টার আগে কেউ দেখতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট ডিভাইসে নির্ধারিত সময়ের পরে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই কেবল কেন্দ্র সচিবরা প্রশ্ন জানতে পারবেন। এখনকার মতোই পরীক্ষার্থীদের আধঘণ্টা আগে কেন্দ্রে গিয়ে আসন গ্রহণ করতে হবে। এমসিকিউ প্রশ্নপত্র তুলে দেয়া হবে। তবে নতুন পদ্ধতি কার্যকর করার আগে পরীক্ষামূলকভাবে ডামি পরীক্ষা নেয়া হবে।
সূত্র জানায়, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায় সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী জড়িত থাকেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততায় পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। সভায় আরও আলোচনা হয়, এইচএসসি পরীক্ষা আগামী ২ এপ্রিল দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়ে গেছে। তাই নতুন পদ্ধতি এ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যকর করা সম্ভব নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এই নতুন পদ্ধতি ২০১৯ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সভার শুরুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেকের হাতে একটি কার্যপত্র তুলে দেয়া হয়। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে কয়েক দফা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ছিল, সনাতনী পদ্ধতির প্রশ্নপত্র প্রণয়ন বাদ দিয়ে প্রশ্নব্যাংক তৈরি করা। সেখানে বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় থেকে প্রশ্ন করা হবে। ২০-৩০টি বা এর চেয়ে বেশি মানসম্মত প্রশ্ন সেট তৈরি করা হবে।
চলমান এসএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে ৬টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তুলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয় মনে করে আইসিটি বিভাগ, মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাসময়ে তৎপর হলে এ পরিস্থিতি অনেক আগেই সামাল দেয়া যেত।
১. বিজি প্রেসে প্রশ্নপত্র কম্পোজ, সম্পাদনা, ছাপা ও প্যাকেজিং পর্যায়ে প্রায় ২৫০ ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারা প্রশ্নপত্র কপি করতে না পারলেও স্মৃতিতে ধারণ করতে পারে। এভাবেও প্রশ্ন ফাঁস করা সম্ভব।
২. নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে ট্রেজারি বা নিরাপত্তা হেফাজত থেকে প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানোর নির্দেশ রয়েছে। তবে অনেক কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩. শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকে অতিরিক্ত কেন্দ্রের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অথচ সেখানে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া নতুন ভেন্যুগুলো থেকে মূল কেন্দ্রগুলোর দূরত্বও অনেক বেশি। ফলে ৩০ মিনিটের আগে কেন্দ্র সচিব প্রশ্নপত্র খুলতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখান থেকেও প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে।
৪. পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে মূল প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
৫. গোয়েন্দা সংস্থার লোকবল এবং অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত স্বল্পতার কারণে কাক্সিক্ষত মাত্রায় নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। দুষ্কৃতকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনতে না পারায় অন্যরাও অপরাধ করতে ভয় পাচ্ছে না।
৬. বিটিআরসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নপত্র আপলোডকারীদের শনাক্ত এবং সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলোও শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সমন্বয় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, বিটিআরসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. শাহজাহান মাহমুদ ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা।