প্রতিবেদন

বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসায় মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত একুশের চেতনায় উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয়

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
একুশের চেতনা থেকেই জন্ম নিয়েছে আজকের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে অমর একুশে পালিত হয় ১৯৫২ সালের পর থেকেই। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের যে এক অনন্য নজির ১৯৫২ সালে স্থাপিত হয়েছিল, তার বলে বলীয়ান এখন শুধু বাংলাদেশই নয়, পুরো বিশ্বেই একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ভাষার জন্য আত্মত্যাগ নজিরবিহীন। শুধু বাংলার দামাল ছেলেদের এ অর্জন। রক্তে অর্জিত মাতৃভাষা। জাতির জীবনে ২১ ফেব্রুয়ারি এক গৌরবময় দিন। যেমন গৌরবোজ্জ্বল দিন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। ফেব্রুয়ারি-ডিসেম্বর এ ২ মাসের ২টি দিন বাঙালি জাতি কোনো দিন ভুলতে পারবে না। একটিতে এ জাতির সূচনা আর অন্যটিতে জাতির পূর্ণতা। জাতির কাক্সিক্ষত এ সূচনালগ্ন ও পূর্ণতালগ্ন এসেছে একজন মানুষের হাত ধরে। তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির এই মহানায়কের হাত ধরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবাদের কৃষ্ণচূড়ার যে চারাটি রোপিত হয়েছিল, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে তা পূর্ণতা লাভ করে; রক্তরঞ্জিত লাল জাতীয় পতাকায়। একই চেতনায় এরপর জাতির পিতার নেতৃত্বে শুরু হয় সোনার বাংলা গড়ার কাজ। পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনায় সোনার বাংলা গড়ার কাজ স্তিমিত হয়ে যায়। দীর্ঘ ২১ বছর সোনার বাংলার উন্নয়ন মুখ থুবড়ে থাকে অপশাসনের নাগপাশে। জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে ১৯৯৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা রূপায়ণের কাজ শুরু হয়। মাঝখানে ৫ বছর বাদ দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে আবারো উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ। বায়ান্নতে বঙ্গবন্ধু যে চেতনার বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন জাতির মধ্যে, ১৬ ডিসেম্বরে তা পূর্ণতা পেয়ে সেই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও বিস্তৃতি লাভ করেছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের কারণে। ফলে এখন জাতিসংঘ সদরদপ্তর ক্যাম্পাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় প্রতিবারের মতো এবারও সর্বস্তরের জনতা একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগ
বায়ান্নর একুশে ছিল সচেতন জনতার সরব প্রতিবাদ; যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অদম্য এক প্রাণশক্তিতে একুশের চেতনাকে রূপান্তরিত করেন মুক্তিযুদ্ধের মহাপ্লাবনে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর তারই সার্থক রূপ। এ জাতি জানে বঙ্গবন্ধু, একুশের শহীদ ও মহান মুক্তিযোদ্ধারা এ অগ্রযাত্রার প্রথম অগ্রপথিক। জাতীয়তাবাদী চেতনার বীর সেনানী। বঙ্গবন্ধু এ জাতির তরেই শহীদ হয়েছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধুর সেনা হিসেবে একুশের শহীদ আর মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধারাও এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধু, একুশের শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগ এ জাতি কোনোদিনই ভুলবে না। অমর একুশের প্রত্যুষে জাতি তাই তাঁদের প্রতি জানিয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এখন সারা বিশ্বের
মহান একুশে আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন এক অর্জন, তেমনি ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নও। পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষা ও সাহিত্য, মনন ও প্রতিভা এবং জীবনবোধে যে পার্থক্য তার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে এ একুশে ফেব্রুয়ারির মর্মভেদী আহ্বানে। উন্নত সাহিত্যসম্ভার নিয়েও যেখানে পশ্চিমবঙ্গ বিলীন হলো ইনডিয়ান সভ্যতার স্রোতধারায়; সেখানে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ছিন্ন করে সে ক্ষেত্রে পূর্ববাংলা রূপ নেয় বাংলাদেশে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি এখন সারা বিশ্বের। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান-সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা-ইউনেস্কো তার প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র বিশ্বে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আর সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারির মহানায়কদের কথা। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ভাষা শহীদ বরকত, সালাম, জব্বার, রফিকসহ মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদকে। তাদের আত্মদানের অমর কাহিনি সমগ্র বিশ্বে নতুনরূপে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানকেও ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। যে পাকিস্তান আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, বুলেট চালিয়ে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল একুশের চেতনাকে; নিয়তির নির্মম পরিহাস সেই পাকিস্তানকেই এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করতে হয় ২১ ফেব্রুয়ারি।
জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত
সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মাথা নত না করার চেতনাস্নাত মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এবারের দিবসটিতে সকাল থেকে রাত অবধি একুশের মর্মবাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে বাঙালির হৃদয়ের গহিনে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়েছে বর্ণমালার জন্য প্রাণ সঁপে দেয়া সেই অমর শহীদদের। ভাষার স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়েছিল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে আসা জনস্রোত। রাজধানীর সব পথ এসে মিশে গিয়েছিল এই স্মৃতির মিনারে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি চেতনার বিচ্ছুরণে উচ্চারিত হয়েছে জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। উন্নয়নের রোল মডেল ধরে রাখার দৃপ্ত শপথ। ব্যক্ত হয়েছে অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে হারিয়ে কল্যাণময় ও মানবহিতৈষী উন্নত দেশ গড়ার অঙ্গীকার। একুশের নানা আনুষ্ঠানিকতায় প্রকাশিত হয়েছে অপশক্তিকে রুখে দিয়ে সম্প্রীতির বন্ধনে দারিদ্র্যমুক্ত স্বনির্ভর স্বদেশ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার দিনটিতে উচ্চারিত হয়েছে বিশ্বদরবারে মর্যাদাসম্পন্ন জাতির পরিচয় গড়ে নেয়ার কথা। পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সুসম্পন্নভাবে এগিয়ে যাওয়ায় স্বস্তির কথা বলেছেন একুশ উদযাপনে আসা সারাদেশের অসংখ্য মানুষ। সব মিলিয়ে শহীদদের প্রতি ভালোবাসা ও আগামীর সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভাবনায় সারাদেশে দিবসটি পালিত হয়েছে। এদিন শহীদদের স্মরণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। সবখানে উড়েছে শোকের কালো পতাকা। একুশকে স্মরণ করা মানুষেরা ধারণ করেছেন কালো ব্যাজ। দৈনিক পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন ও নিবন্ধ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দিনভর প্রচার করেছে একুশের নানা অনুষ্ঠানমালা। সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো পালন করেছে বিশেষ কর্মসূচি। পাড়া-মহল্লায় উদযাপিত হয়েছে একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান। রাজধানীর অজস্র স্কুলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ গান ও কবিতায় সাজানো বর্ণিল নানা অনুষ্ঠান। আর শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের পাশাপাশি অফিস-আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবিটিও উচ্চারিত হয়েছে। একুশকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষ পথে নামলেও ঘটেনি নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা কিংবা অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা। বিঘœ ঘটেনি শোককে ছাপিয়ে উদযাপনে পরিণত হওয়া উচ্ছ্বাসের আবাহনে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি
ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
প্রতিবারের মতো এবারও একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এছাড়াও ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীপ্রধান, আইজিপি, অ্যাটর্নি জেনারেল, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও ভাষাসৈনিকেরা।
শহীদ মিনার ছুঁয়ে জনতার স্রোত বইমেলায়
একুশের সকাল থেকেই প্রভাতফেরিতে আসা মানুষের স্রোত এসে মিশেছিল বইমেলা প্রাঙ্গণে। মহান ভাষা শহীদদের শুধু স্মরণ করা নয়, তাদের আত্মদানকে সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের শক্তিতে পরিণত করার কথাও বললেন বইমেলায় আসা অনেকে। অমর একুশে স্মরণে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই বইমেলা বাঙালির কাছে হয়ে উঠেছে একুশের সমার্থক। শহীদ বেদিতে ফুল অর্পণ আর বইমেলায় এসে বই কেনা যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে সপরিবারে, ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে মা-বাবা, ছোট ভাই-বোনকে নিয়ে বড় ভাই-বোন বইমেলা প্রাঙ্গণকে ভরিয়ে তুলেছিলেন। শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে মানুষের গন্তব্য ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা। শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বইমেলা প্রাঙ্গণে মানুষের যে মিছিল শুরু হয়েছিল তা সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরো বেড়েছে। বিকেলে মেলায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। বইমেলায় মানুষের ঢল নামে মূলত সকাল ১০টার পরে। সাদা-কালো শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে এসেছিল ছেলে-মেয়েরা। গালে, কপালে, পোশাকে ছিল বর্ণমালা। বেলা যত বেড়েছে মানুষের স্রোত তত বেড়েছে। বইপ্রেমীদের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল জনারণ্য। বইমেলা উপচে মানুষের সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল টিএসসি, শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
সীমান্তে দুই বাংলার মিলনমেলা
বেনাপোল আর পেট্রাপোলের মাঝে অবস্থিত সীমান্তের ‘শূন্য আঙিনা’ একুশের সকাল থেকেই মুখরিত ছিল দুই বাংলার মানুষের পদচারণায়। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অমর হোক বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চালু হোক’ এই স্লোগান নিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে বাংলাদেশিদের সঙ্গে সমবেত হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কড়া। তার মধ্যেই আড্ডা আর স্মৃতিচারণে মেতে ওঠেন সবাই। হিলি ও ছাগলনাইয়া-শ্রীনগর সীমান্ত হাট এলাকাতেও একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে নোম্যান্স ল্যান্ডকে সাজানো হয় দুই দেশের পতাকা, নানা রঙয়ের ফেস্টুন, ব্যানার ও ফুল দিয়ে। ভাষা দিবসের এই অনুষ্ঠানে বিজিবি বিএসএফকে শুভেচ্ছা জানায় ফুল দিয়ে।
বিদেশিদের চোখে অমর একুশে
এদেশের মানুষের পাশাপাশি ভাষাকে ভালোবাসা ভিনদেশী নাগরিকরাও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের আনন্দে শামিল হয়েছিলেন রাজধানীতে। দোয়েল চত্বরের সামনে মাতৃভাষা দিবসের আয়োজন দেখতে আসা কয়েকজন বিদেশি জানান, ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার মতো দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। এই বিরল ঘটনাটিই ঘটিয়েছেন এ দেশের ভাষার যোদ্ধারা। তাদের কল্যাণেই আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলা ভাষা। পৃথিবীজুড়ে এখন বাংলা ভাষার অহংকার প্রতিধ্বনিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদেরও ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে।
ভাষার বিকৃতি রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার তাগিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষার বিকৃতি রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও উচ্চারণে দেশের নতুন প্রজন্মকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। জ্ঞানার্জন ও প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য অন্য ভাষাও শিখতে হবে, তবে তা কোনোভাবেই মাতৃভাষাকে ভুলে নয়। মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেয়া বা জীবন উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কম দেশই দিতে পেরেছে। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা আমাদের রক্ষা করতে হবে। আর নিজের মাতৃভাষায় কথা ও শিক্ষা গ্রহণ হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি প্রোথিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।
অন্য ভাষা শিখতে হবে তবে
নিজের স্বকীয়তা বাদ দিয়ে নয়
বাঙালি জাতির স্বকীয়তা শুধু নিজেদের মধ্যে ধারণ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অমর একুশের আগের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বাংলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অন্য ভাষা শিখতে হবে তবে নিজের স্বকীয়তা বাদ দিয়ে নয়। অনুষ্ঠানে ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে
২০১৮ সালের একুশে পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
ওই পদক প্রদান অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, গত ৮ বছরে দেশকে একটি মর্যাদার আসনে এনে দিতে পেরেছি, দেশের মানুষের ভেতর মর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে, যা আমাদের বড় অর্জন। মানুষের আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। আমরা এখন মাথা উঁচু করে চলতে পারি। একুশ আমাদের এসব শিখিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি আজকে শুধু একটি দিবস নয়; একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের চেতনার উন্মেষ ঘটায়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে শেখায়। আমরা বাঙালি, আমাদের স্বকীয়তা, আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ শিক্ষা দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি। আর সেই পথ বেয়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি। আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। আমরা কেবল নিম্ন-মধ্যম আয়ে থাকতে চাই না, ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চাই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।