অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংকের সম্পৃক্ততায় আশার আলো দেখছে পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
চীন ও ভারতের পর এবার দেশের পুঁজিবাজারে নজর পড়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ দুটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ার কেনার প্রতিযোগিতায় নামলেও বিশ্বব্যাংক সে পথে হাঁটছে না। সংস্থাটি পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সহায়তা করতে আগ্রহী। সম্প্রতি পুঁজিবাজার সম্পর্কে নিজেদের পর্যালোচনাসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংস্থাটি। মূলত তিনটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে বিশ্বব্যাংক মিশন কাজ করতে চায়। প্রথমত, সমমূলধন ও ঋণভিত্তিক সম্পদের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা প্রদান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা পর্যালোচনা করা। দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করা। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ উপকরণ, স্পেশাল পারপাস বন্ড, নন-সভেরিন বন্ড, বিভিন্ন সিকিউরিটাইজেশনসহ পুঁজিবাজারের অবকাঠামোগত প্রকল্পে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম ও সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকায় একটি সম্মেলন করার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে আইএফসি-বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরী স্বদেশ খবরকে বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় আইএফসি-বিশ্বব্যাংক গ্রুপও বলছে, এডিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তারা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে তারা কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আমাদের কাছে একটি ‘এইড মেমোয়ার’ পাঠিয়েছে। তবে তারা কী ধরনের কাজ করতে চায় সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এখনও আমাদের কাছে আসেনি। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ প্রস্তাব পাঠালে তখন আমরা বিবেচনা করে দেখব তাদের সহায়তা কিভাবে নেয়া যায়।
দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মূল্যায়ন হচ্ছে এই দুটি পুঁজিবাজারের আকার অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ব্যাপকভাবে সমমূলধনভিত্তিক। এই দুই পুঁজিবাজারের মোট মূলধনের পরিমাণ দেশের জিডিপির মাত্র ২২ শতাংশ, যেখানে ভারতের পুঁজিবাজারের মূলধনের পরিমাণ দেশটির জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ। এছাড়া থাইল্যান্ডের পুঁজিবাজার দেশটির জিডিপির ৯৬ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৫৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঋণ বাজার দেশটির জিডিপির প্রায় ১৫৯ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ডিএসই-তে সবমিলিয়ে ৫৬৭টি তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের মধ্যে ৩০০টি স্টক ২২১টি সরকারি ট্রেজারি বন্ড (যেগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে সক্রিয় নয়) এবং দুটি করপোরেট বন্ড রয়েছে। সবগুলো সিকিউরিটিজের বাজার মূলধনের পরিমাণ ৫১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সব ঋণ সিকিউরিটিজ হিসাবে ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং দুটি করপোরেট বন্ডের মূলধন বাজারের ০ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হচ্ছে এখানে বাজার পরিচালনার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় ক্লিয়ারিং কাউন্টারপার্টি (সিসিপি) নেই। সিসিপির অনুপস্থিতিতে স্বচ্ছতার মান নির্ধারণকারী কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বিধিমালা নেই। ফলে সীমান্ত লেনদেনের উন্নয়নে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আস্থার অভাব রয়েছে। তাছাড়া আঞ্চলিক বিনিময় সহযোগিতার অনুপস্থিতি বাজারে গতিশীলতা ও বৃদ্ধির সম্ভাব্য পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিনা দ্বিধায় এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্লিয়ারিং পদ্ধতিতে লেনদেন ছাড়া সীমান্ত লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়বে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে খুব সহজে স্বল্প সুদে দ্রুত ঋণ পাওয়া গেলেও পুঁজিবাজার থেকে ঋণ গ্রহণের বিষয়টি খুব জটিল, ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাটির দাবি যেকোনো ঋণগ্রহণের উদ্যোগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনেক বেশি সময় নেয়। দীর্ঘমেয়াদি ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে সুশাসনের অভাবের পাশাপাশি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোর মানও দুর্বল। বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থা মূলত ব্যাংক নির্ভরশীল এমনটি জানিয়ে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ বলছে শতকরা ৮০ ভাগ ঋণ আসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। তবে ব্যাংকিং খাতের এ ঋণ নির্ভরতাও খুব একটা কাজে আসছে না। কারণ দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে নির্দিষ্ট সুদে ঋণ দেয়ার সক্ষমতা নেই। ব্যাংকগুলো মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণ দিতে পছন্দ করে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শামসুল আলম স্বদেশ খবরকে বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে সহায়তা দেবে, এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অনেক বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করলেও দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে এর আগে কোনো অর্থায়ন করেনি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো বিশ্বব্যাংক পুঁজিবাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়নে (যেমন স্টক এক্সচেঞ্জ ভবন নির্মাণ) অর্থায়নের জন্য আসেনি, এসেছে দেশের পুঁজিবাজারের ভিত তৈরি করে দেয়ার জন্য। বিশ্বব্যাংক সরাসরি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবে না। তারা সহায়তা প্রদান করবে পুঁজিবাজারে থাকা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিকে। পুঁজিবাজারে থাকা সরকারি অনেক কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ না পেয়ে তাদের আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। আমি মনে করি, সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি বড় অংকের ঋণ সরবরাহ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা গেলে সেখানে কর্মসংস্থানের আরো সুযোগ তৈরি হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে; যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়ক হবে। বিশ্বব্যাংক এই কাজটি করলে অর্থাৎ সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানে বড় অংকের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সরবরাহ করলে এসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারবে। এতে দেশের পুঁজিবাজারের মতো আশার আলো দেখবে দেশের সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও। আরো আশার কথা হলো বিশ্বব্যাংক পুঁজিবাজারে অর্থায়ন করছে শুনে দেশের দুই শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।