কলাম

ভাষা আন্দোলন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকেই চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর প্রথম আক্রমণ আসে ভাষার মাধ্যমে। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের মূলত ৩টি দাবি ছিল। এই ৩ দাবিতে আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন থেকে মিছিল বের হয়েছিল। সেই মিছিলেই দাবি ৩টি ছিল। ১. রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ২. সকল রাজবন্দির মুক্তি চাই। ৩. সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু চাই। ভাষা আন্দোলনের ব্যানার প্ল্যাকার্ডে মূলত এই ৩টি স্লোগানই ছিল।
ভাষা আন্দোলনের ৩ দাবির মধ্যে ২টি দাবি সম্পূর্ণরূপে পূরণ হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় দাবিটি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু বা ব্যবহার বাস্তবায়ন হয়নি। ভাষার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র পাওয়ার পর বাংলা ভাষাকে যেভাবে সর্বস্তরে চালু হওয়ার কথা ছিল তা এখনও হয়নি। ভাষা নিয়ে আমাদের জাতীয় প্রত্যাশা ততটা পূরণও করতে পারিনি। আমাদের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র, যেখানে বাংলা ভাষা চালু করার কথা ছিল তা হয়নি। আইন-আদালত, বিশেষ করে উচ্চতর আদালতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ হচ্ছে না। অবশ্য দুই-একজন সম্মানিত বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মামলার রায়গুলো যাদের ওপর বর্তায়, অর্থাৎ বাদি এবং বিবাদি উভয়েই বাঙালি। কিন্তু তারপরও সেখানে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নেই। আদালতে বাংলা ভাষা প্রয়োগ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় দেশে উচ্চ শিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহারও সীমিত। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখনও অনেক বেশি বাংলা ভাষা ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখন বাংলা ভাষার ব্যবহার কমে আসছে। উচ্চশিক্ষায় ব্যবসাবাণিজ্য বিষয়ে বাংলার ব্যবহার একেবারেই নেই। সেখানে বাংলা ভাষার ব্যবহার একেবারেই উঠে গেছে। এর মূল কারণ পাঠ্যপুস্তকের বড় ধরনের সংকট। উচ্চশিক্ষায় বেশিরভাগই পাঠ্যপুস্তক ইংরেজিতে সেজন্য এই সমস্যা আরো প্রকট। ব্যবসাবাণিজ্যের যেসব পাঠ্যপুস্তক রয়েছে সেগুলো এক সময় অনেকে বাংলা করার চেষ্টা করেছিলেন। যেমন ব্যবস্থাপনা এবং হিসাব বিজ্ঞানের কিছু বই বাংলায় বের হয়েছিল। ‘বাজারজাতকরণ’ বিষয়ে বাংলা কোনো বই ছিল না। সত্যিকার অর্থে ২০ বছর আগে ‘বাজারজাতকরণ’ বিষয়ে আমি বাংলায় একটি বই লিখি। কিন্তু এই ধারাটা পরবর্তী পর্যায়ে একেবারেই থেমে যায়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরস্পর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন ব্যবসাবাণিজ্য শিক্ষা ইংরেজি মাধ্যমে শুরু করে, তখন এটাকে অনুসরণ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে বাংলা আর ব্যবহার না হওয়ায় যারা বাংলায় ব্যবসাবাণিজ্য বিষয়ক বই লিখতেন তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। এতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসাবাণিজ্য শিক্ষার ভাষা হয়ে যায় ইংরেজি। ব্যবসা যেহেতু এখন আন্তর্জাতিক বিষয়, কাজেই কেউ কেউ আবার ইংরেজির পক্ষে কথা বলেন। আমাদের ব্যবসার সাথে আমদানি-রপ্তানি জড়িত, কাজেই ইংরেজি লাগবে। কিন্তু এর বিপরীত ভাষ্যও কিন্তু আছে। যারা ইংরেজিতে পড়াশুনা করে তাদের মাত্র কয়েকজন আমদানি-রপ্তানির সাথে জড়িত। বিদেশে এই আমদানি-রপ্তানির জন্য কেবল মাত্র চিঠিপত্র লিখতে হয়। এ কারণে পুরো কোম্পানিতে ইংরেজিতে চিঠিপত্র লিখতে পারেন এমন একজন লোক থাকলেই তো চলে। বাকিরা যারা অন্যান্য পণ্য বিক্রি করবেন তাদের জন্য ইংরেজি জানার প্রয়োজন নেই। পরিকল্পনা এবং সৃজনশীল কাজের জন্য তো ইংরেজি জানার প্রয়োজন নেই। যেমন গার্মেন্টস সেক্টরে আমদানি-রপ্তানি যোগাযোগ করার জন্য ইংরেজি জানা একজন লোক থাকলেই তো চলে। চাইনিজরা এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। সারা পৃথিবীর বাজার এখন তাদের দখলে। কিন্তু চীনে ইংরেজি জানে ক’জন। আসলে ইংরেজির ব্যবহার আমাদের অনেকটাই দাসত্ব মনোবৃত্তি। ইংরেজির সাথে আন্তর্জাতিক ব্যবসাবাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। ইন্টারনেটে ইংরেজিতে যোগাযোগের জন্য এক ধরনের সহজ পদ্ধতি আছে তা অনুসরণ করলেই হয়। সবার উচ্চমাত্রার ইংরেজি জানার দরকার নেই। কিন্তু আমরা সবাই ইংরেজির ওপর অতিমাত্রায় জোর দিচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে আমরা কেউ ভালোভাবে ইংরেজি শিখতেই পারছি না। কারণ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বাংলায় পড়াশুনা করে। উচ্চশিক্ষায় এসে হঠাৎ করেই ইংরেজিতে পড়তে হয়। এতে ভাষার কারণে এক ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এতে করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর নজর না দিয়ে ভাষার পেছনে সময় নষ্ট হয়। যদি বাংলায় পড়া সম্ভব হতো তাহলে তারা আরো বেশি সৃজনশীল হতে পারতো। আমি ক্লাসে দেখি তারা বিষয়টি বোঝে; কিন্তু যখন তাদেরকে বলতে বলা হয়, দেখা যায় তারা বিষয়টি ইংরেজিতে বলতে পারে না। অর্থাৎ কোনো পরিকল্পনা বা বিষয় মাতৃভাষা প্রকাশের যে স্বস্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ অনুভব করা যায়, ইংরেজিতে কিন্তু ততটা হয় না।
আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে ইংরেজি ভাষার তেমন প্রচলন নেই। ইংল্যান্ডের টেমস নদীর ওই পাড়ে ফ্রান্স। কিন্তু সেখানে কেউ ইংরেজিতে কথা বলে না। জার্মানি-ইতালিতেও কেউ ইংরেজিতে কথা বলে না। ইউরোপে প্রায় সব দেশ একে অপরের সাথে জড়িত। কিন্তু সেখানেও তারা সব কিছুতেই নিজেদের ভাষা ব্যবহার করে। তবে তারা ভালো ভালো ইংরেজি বইগুলো নিজেদের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে নিয়েছে। আর এই কাজ করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বাংলা একাডেমিতে এক সময় পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর জন্য আলাদা বিশেষ কার্যক্রম ছিল। সে সময় বাংলা একাডেমির লোকজন ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মতো লেখকদের পেছনে ঘুরে ঘুরে পান্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন। আজ থেকে ২০ বছর আগে বাংলা একাডেমির তাগিদে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ বই আমি যখন লিখি, তখন তাদের লোক প্রতিদিন আমার অফিসে পান্ডুলিপির জন্য বসে থাকত। তখন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদেরকে বই ছাপানোর জন্য টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হতো। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম অর্জন হলো এই বাংলা একাডেমি। কিন্তু তারা অন্যান্য বিষয়ে যেভাবে জোর দিয়েছে, সে তুলনায় একাডেমিক পাঠ্যপুস্তকের বিষয়ে তারা আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারত। এতে প্রত্যেক বছর আমরা একটি বিষয়ে একটি করে বই বের করতে পারতাম। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ১০০ বা ১২০-এর মতো বিষয় পড়ানো হয়। এই সব বিষয়ে বছরে একটি করে বই বের হলে ১০ বছরে ১২০০ পাঠ্যপুস্তক বাজারে পাওয়া যেত। ১ জন একটি করে বই লিখতে সক্ষম এমন লোক বাংলাদেশে আছে। এই কাজটি অত্যন্ত মনোযোগসহকারে রুটিন মোতাবেক করতে হবে। আমরা পদ্মাসেতু নিজেদের অর্থায়নে করতে পারি, কিন্তু পাঠ্যবই তৈরি করতে পারবো নাÑ এটা হয় না। বিদেশে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনেক ভালো শিক্ষক আছেন। তাদেরকে যদি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ মহল থেকে চিঠি দেয়া, সম্মানসূচক প্রণোদনা এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করা যায়, তা হলে তাদের কাছ থেকে পাঠ্যবই বের করে আনা কঠিন কোনা কাজ হবে না। বাংলা একাডেমি প্রত্যেক বছর বই মেলায় অনেক বই বের করে। কিন্তু এই সব বইয়ের অনেকগুলোই আছে, যার কোনো আলো নেই। অনেকগুলোই অপাঠ্য। অধ্যাপক হুমায়ূন আযাদ বলেছিলেন, ‘এ ধরনের বই পড়লে আলোকিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এগুলো আগুনে পোড়ালে হয়ত কিছু আলো জ্বলবে। এগুলো কাগজ এবং কালির অপচয়।’
আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। এখন ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্য এবং তথ্যসেবা পৌঁছে গেছে। এই স্বাস্থ্যসেবা এবং ইন্টারনেট সুবিধা যারা পাচ্ছেন, তাদের ভাষা তো বাংলা। রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন, চিকিৎসক তাদের ব্যবস্থাপত্র লিখেন ইংরেজিতে। এগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। চিকিৎসক নিজে বাঙালি, তার রোগী দরিদ্র বাঙালি। কাজেই এখানে ইংরেজি ব্যবহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। চিকিৎসক বাংলায় ‘প্যারাসিটামল’ লিখতে পারতেন, সকালে একটি এবং বিকেলে একটি এমনটি না লিখে চিকিৎসক লিখেন ইংরেজিতে। এমনকি তারা লিখেন সাংকেতিক ভাষায় ওয়ান প্লাস জিরো প্লাস ওয়ান এবং এমনভাবে প্যাঁচানো, যা সাধারণ রোগীতো দূরের কথা সংশ্লিষ্ট ওষুধ বিক্রেতারও বোঝার কোনো উপায় থাকে না। ডায়ানস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট ইংরেজিতে লেখার কোনো প্রয়োজন নেই। দেশের যারা ইন্টারনেটই ব্যবহার করে তারা বাঙালি, যাদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে তারাও বাঙালি। কাজেই এক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত, আমাদের কতকগুলো বিষয় আইনগত বাধ্যবাধকতার ভেতর নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। মাঝে মাঝে ইংরেজি বলতে এবং লিখতে পারা মানে বড় কিছু হয়ে হয়ে যাওয়াÑ এই মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা খুবই জরুরি। আর একটি বিষয় হলো বিশ্বায়নের যুগে আমাদের শিল্প-সাহিত্য চর্চা। এই বিষয় এখন সারা বিশ্বে আদান-প্রদান হচ্ছে। এক দেশের সাহিত্য অন্য দেশে অনূদিত হচ্ছে এবং প্রভাব পড়ছে। বিশ্ব শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য জানতে হলেও আমাদের বাংলা ভাষার দুয়ার খুলতে হবে। পৃথিবীর সেরা সাহিত্যগুলো কিন্তু ইংরেজি ভাষায় নয়। আমাদেরকে অনুবাদ সাহিত্য আরো বাড়াতে হবে। কালজয়ী বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। আমাদের মনোজগতে ইংরেজি নিয়ে একটি ঔপনিবেশিকতা তৈরি হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন নেই; কিন্তু তাদের চিহ্ন থেকে আমরা বের হতে পারিনি। আমরা চাচ্ছি সর্বস্তরে বাংলা চালু হোক, বাংলা ভাষা যথাযথ মর্যাদা পাক কিন্তু এই ঔপনিবেশিক মনোভাব থেকে বের হতে না পারলে তা সম্ভব হবে না। আমরা খাদ্য দূষণ, ফরমালিন, ভেজাল তেল, দুধে পানি মেশানোসহ ভোগ্যপণ্যের বিষয়ে খুবই সচেতন। কিন্তু আমাদের ভাষা দূষণ হচ্ছে সে বিষয়ে আমরা কথা বলি না। বর্তমানে এফএম রেডিওতে ভাষার কি পরিমাণ দূষণ হয়েছে তা বর্ণনাতীত। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য হারিয়ে আমরা জগাখিচুড়ির মতো অবস্থায় উপনীত হয়েছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে শব্দ নিয়ে আমরা যে ভাষা তৈরি করছি তা আমাদের আত্মমর্যাদার জন্য অসম্মানজনক। বাংলা ভাষায় কিছু বিদেশি শব্দ রয়েছে যেগুলো আমরা বাংলা হিসেবেই গ্রহণ করেছি।
বাংলা অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। এর শব্দ ভা-ারও বেশ সমৃদ্ধ। রয়েছে নানা বৈচিত্র্য এবং মাধুর্য। শিক্ষিত সমাজ, শিক্ষকদের এবং গণমাধ্যমের জন্য একটি প্রমিত বাংলা ভাষা দরকার। শিক্ষকরা যদি নিজেই ভালো বাংলা না জানেন তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের গ্রামে এবং শহরে মাধ্যমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা পড়ানোর মতো ভালো কোনো শিক্ষক নেই। এটি একটি বড় সংকট। এক সময়ে স্কুলে প-িত মশাইরা ছিলেন, যারা বাংলা পড়াতেন। শব্দের উৎপত্তি, বাংলা ব্যাকরণে তাদের ভালো দখল ছিল। রাজনৈতিক নানা কারণে সেই প-িত মশাইরা এখন দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এই সব শিক্ষক অত্যন্ত অধ্যবসায়ী ছিলেন। আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছি, কিন্তু ভাষার দিকে খেয়াল নেই। এতে আমরা না পারছি ভালো বাংলা বা ইংরেজি শিখতে এবং বলতে। আমরা এখন দাবি করছি জাতিসংঘের ভাষা হবে বাংলা। সেজন্য যদি পরিভাষা তৈরি করতে না পারা যায়, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ব। এজন্য আইন, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের পরিভাষা তৈরি করতে হবে। কারণ জাতিসংঘ নানা আইন প্রণয়ন করে থাকে। বাংলাকে জাতিসংঘের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের উচিত হবে বাংলাকে আরো সমৃদ্ধ করা।
ব্যাংকের ভাষা ইংরেজি করার কোনো দরকার নেই। কারণ সেখানে সবাই বাঙালি গ্রাহকই লেনদেন করে থাকেন। যারা এলসি খুলবে তাদের জন্য কেবল ইংরেজি থাকলেই চলবে। আর্থিক লেনদেনসহ যাবতীয় বিষয় বাংলা ভাষায় সম্পন্ন হলে প্রতারণা এবং জালিয়াতির মাত্রা অনেক কমে আসবে এবং সকলে এর সুফল ভোগ করবে। অনেক কাজের সাথে ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংক থেকে নানা কাগজ দেয়া হয় কিন্তু ইংরেজি হওয়ার কারণ অনেকে বুঝতেই পারেন না কোনটা আসলে কী? শেয়ার বাজারের যাবতীয় কার্যক্রম ইংরেজিতে; কিন্তু সেখানে তো তেমন কোনো বিদেশি লোকজন জড়িত নয়। আর যদি থাকেও তাহলে তাদের নিজস্ব লোক থাকার দরকার। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকে বলে দেয়া উচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক প্রতিবেদন বাংলায় হবে। ইংরেজিতে হওয়ার কোনো কারণ নেই। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানকে বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রয়োগের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আদালতে বাংলার ব্যবহার করতেই হবে। উচ্চ শিক্ষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের জন্য বাংলা একাডেমির আলাদা একটি কার্যকরী সেল গঠন করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব-নিকাশ, বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরিসহ সব কার্যক্রম বাংলায় করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। কাজেই এখন জাতীয় দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতেই হবে। যে জাতি মাতৃভাষাকে গ্রহণ করে না, সে জাতি এগিয়ে গেছে এরকম কোনো নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। চীন, কোরিয়া, জাপানসহ অন্যান্য জাতি নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করেই উন্নত হয়েছে। অন্যের থেকে ধার করা ভাষা ব্যবহার করে তারা উন্নত হয়নি।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়