আন্তর্জাতিক

রক্তে ভাসছে সিরিয়া : পরিস্থিতিকে কল্পনাতীত বলল জাতিসংঘ

স্বদেশ খবর ডেস্ক
চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ, লাশ আর লাশ, ক্ষেপণাস্ত্র-গোলার আঘাতে ধসে পড়া ভবনের ইট-বালুর ধুলায় বিধ্বস্ত মুখ। চোখ কচলাতে কচলাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে সবাই। মাঝে মধ্যে পা পিছলে যাচ্ছে। কেউ বাবা-মা হারিয়েছেন, কেউ খুঁজে বেড়াচ্ছেন আদরের মানিককে। মা হারানো দুধের শিশুকে নিয়ে দিগি¦দিক ছুটছেন বাবাÑ এমন নির্মম চিত্র এখন সিরিয়ার অলি-গলিতে। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েনি দেশটি। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ বাহিনীর চালানো বিমান হামলায় পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ২৬০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে জায়গা নেই, ওষুধ সংকট। সিঁড়ির নিচে, করিডরে, বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে আহতদের। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে নিহত হয়েছে আরও ৪৫ জন। সব মিলিয়ে দুই দিনে মৃতের সংখ্যা ৩০৫। আহত ১ হাজার ২০০। হতাহতের সংখ্যা ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে।
সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ঘৌটায় সরকারি বাহিনীর কয়েক দিনের টানা বোমাবর্ষণের পর সেখানকার পরিস্থিতিকে কল্পনাতীত হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির আঞ্চলিক মানবিক সমন্বয়ক পানোস মৌমজিস বলেন, রাজধানী দামেস্কের কাছের এ এলাকায় আসাদ বাহিনীর গোলাবর্ষণ চরম যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ঘৌটার অন্তত ১০টি শহরে বোমা হামলা হয়েছে। পূর্ব ঘৌটার প্রায় সব জায়গা রক্তে ভাসছে। টানা ৩ দিন চলা সরকারি বাহিনীর এ হামলায় এত বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে যে হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে আহত নারী-শিশুদের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। একদিকে সিরিয়ায় চলছে যুদ্ধবিরতির কারণে অবরোধ, অন্যদিকে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ।
সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী এ হামলাকে এ যাবৎকালের ভয়াবহ দিন, ভয়ংকর মাস, অশুভ বছর বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। প্রাচীনকালের স্বর্গভূমির ধ্বংসাত্মক এ ঘটনাকে ভাষায় বর্ণনা করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব। দেশটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের বধ্যভূমি ও পৃথিবীর নরকে পরিণত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সিরিয়া বিষয়ক গবেষক দিয়ানা সিমান বলেন, সিরিয়া যুদ্ধে ৬ বছরে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ করেছে আসাদ সরকার। আরেক গবেষক ড. ফরেস কুরাইবা বলেন, পরিস্থিতি বেশ বিপর্যয়কর। বোমা-ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে ৪টি হাসপাতাল। এ কারণে ঘৌটায় আহতদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারছি না। রক্তের দাগে লেখা সিরিয়াবাসীর ইতিহাস। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কারণে বোমা হামলা থামতে না থামতেই এবার শুরু হয়েছে বিদ্রোহীদের ওপর আসাদ বাহিনীর হামলা। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, গত কয়েক বছরে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। দামেস্কের নিকটবর্তী ঘৌটা এলাকাটিতে এখন সরকারি বাহিনীর যে অভিযান চলছে, এত তীব্র আক্রমণ গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। আসাদ বাহিনীর সমর্থক রাশিয়া ও ইরানের পাশাপাশি তুরস্কের আখ্যা দেয়া এ ডি-এস্কেলেশন জোনে ২০১৩ সালে রাসায়নিক হামলার পর এবারের বোমা বর্ষণকেই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বলছেন বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা। ঘৌটা হাসপাতালের শিশু বিভাগের ডাক্তার আমানি বলৌর বলেন, ঘৌটায় আমার দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা এটি। শুধু যে বেসামরিক লোকদের ওপর বোমা হামলা হচ্ছে তা নয়, খাবারের গুদাম বা যেখানেই কোনো রকম খাবার মজুদ করে রাখা যায়, সেখানেই হামলা হচ্ছে।
এদিকে সিরিয়ার পূর্ব ঘৌটা অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে প্রতিবেদনের বদলে সাদা কাগজ জমা দিলেন ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক। কোনো শব্দ ব্যবহার করেই খুন হয়ে যাওয়া শিশু, তাদের মা, তাদের বাবা ও প্রিয়জনদের প্রতি সুবিচার করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউনিসেফের দাপ্তরিক প্যাডে লেখা রিপোর্টে এভাবেই শুরু করেছেন সংস্থাটির উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক গির্ট কাপালায়েরে। তার নিচে কোটেশন মার্কের ভেতর একদম ফাঁকা ১০টি লাইন দিয়ে বুঝানো হয়েছে, সেখানে কিছু বাক্য থাকার কথা ছিল, কিন্তু লেখা সম্ভব হয়নি। নিচে এন্ডস লিখে সিরিয়া যুদ্ধে শিশুদের হতাহতের বর্ণনা দেয়া নিয়ে নিজের প্রতিবেদন লেখার দায়িত্ব শেষ করেছেন গির্ট কাপালায়েরে। সবশেষে লেখা হয়েছে, ইউনিসেফ একটি ব্ল্যাংক স্টেটমেন্ট বা শূন্য বক্তব্য প্রদান করল। শিশুদের যন্ত্রণা আর আমাদের ক্রোধ বোঝানোর মতো আর কোনো শব্দই নেই। যারা এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন তাদের কি নিজের নিষ্ঠুর কর্মকা- সমর্থনের কোনো ভাষা আছে? এই প্রশ্ন রেখেই শেষ করা হয়েছে প্রতিবেদনটি।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত সেনাদল সিরিয়ার পূর্ব ঘৌটা অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে প্রায় ৪ লাখ মানুষকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু এ বছর তারা ওই অঞ্চলে অবরোধকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং ওই বিচ্ছিন্ন অঞ্চলটিতে আক্রমণ ব্যাপক আকারে বাড়িয়ে দিয়েছে। অবরোধের কৌশল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর আক্রমণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুদ্ধের নিয়ম মেনে চলছে না বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকাকে স্থানীয়দের পাঠানো ছবিতে বোমার বিস্ফোরণে আতঙ্কিত শিশুদের দেখা যায়।
পূর্ব ঘৌটায় সরকারি বাহিনীর কয়েকদিনের টানা বোমা হামলা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র নয়, যেন বৃষ্টি পড়ছে। পূর্ব ঘৌটার প্রায় সব জায়গা রক্তের ওপর ভাসছে। ফিরাস আবদুল্লাহ নামে এক বাসিন্দা বলেন, নারী ও শিশুদের চিৎকার-কান্নার শব্দ তাদের বাড়ির জানালা দিয়ে শুনতে পাচ্ছি আমরা। ক্ষেপণাস্ত্র ও মর্টার পড়ছে যেন বৃষ্টির মতো। এ দুঃস্বপ্ন থেকে পালানোর জায়গা নেই, এটি শেষও হয়নি। সিরিয়ার পূর্ব ঘৌটায় সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুটেরেস। সিরীয় বাহিনীর দাবি, তারা পূর্ব ঘৌটাকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্ত করতে লড়ছে। বিবিসি বলছে, রুশ সমর্থিত সিরিয়ার সরকারপন্থি বাহিনী বিদ্রোহীদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি পূর্ব ঘৌটা পুনরুদ্ধারে তৎপরতা বাড়ায়। দামেস্কের কাছে পূর্ব ঘৌটা হলো বিদ্রোহীদের সর্বশেষ বড় ঘাঁটি। এখানকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইসলামপন্থি দল জঈশ-ই-ইসলাম। আল কায়দা সংশ্লিষ্ট সাবেক জিহাদি জোট হায়াত তাহির আল-শামও এলাকাটিতে বেশ সক্রিয়। ২০১৩ সালে রাসায়নিক হামলার পর এবারের বোমা বর্ষণকেই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বলছেন এলাকাটিতে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা। তারা জানান, সরকারি বাহিনীর হামলায় নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা শতাধিক।
২৫ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী এ হামলায় হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলছে। এমনকি এ হামলা বন্ধে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী কোনো রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।