ফিচার

শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো কতটা জরুরি

মায়ের দুধ ছাড়া শিশুকে আর কিছু খাওয়াতে নিষেধ করেন চিকিৎসকেরা। সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর বিষয়ে এই দুটি প্রতিষ্ঠান যে নিয়ম-নীতি ঠিক করে দিয়েছে, তা প্রায় কোনো দেশই মেনে চলছে না। এ কারণে অধিকাংশ শিশুই তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে একাধিক রোগ ছোট বেলা থেকেই তাদের ঘিরে ধরছে। এতে বাড়ছে মৃত্যু। আমাদের দেশের অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর। এমন পরিস্থিতিতে যদি এখনই কিছু করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে যে কী হবে, তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।
শিশুর জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে তাকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হয়। এটাই নিয়ম। কারণ জন্মের পর এই শাল দুধই হলো শিশুর শরীর গঠনের প্রথম দাওয়াই। এর পর টানা ৬ মাস শিশু শুধু মায়ের দুধ খেয়েই বেঁচে থাকে। এই সময় মায়ের দুধ ছাড়া শিশুকে আর কিছু খাওয়াতে নিষেধ করেন চিকিৎসকেরা। কারণ মায়ের দুধে বিদ্যমান একাধিক পুষ্টিকর উপাদান শিশুর শরীরকে জীবনযুদ্ধের জন্য তৈরি করতে থাকে। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তুলতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক কথায় মায়ের দুধ হলো শিশুর জন্য ভ্যাকসিনের সমান। আর এই ওষুধ, শিশুর মুখে তুলে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না মায়েরা। বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের চাকরি জীবন। এই কারণে পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তা সম্প্রতি গ্লোবাল ব্রেস্টফিডিং স্কোরকার্ডের দিকে চোখ ফেরালেই বুঝা যায়।
ওই রিপোর্ট অনুসারে সারা বিশ্বে প্রায় ৪৪ শতাংশ মা তাদের শিশুকে জন্মের প্রথম ঘণ্টায় দুধ খাওয়ান না। এখানেই শেষ নয়, পৃথিবী নামের গ্রহে মাত্র ২৩টি দেশ আছে যেখানে শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আর দুর্ভাগ্যের বিষয় এই ২৩টি দেশের মধ্যে নেপাল এবং শ্রীলংকার নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই। এই অবস্থায় বিশ্বের মানচিত্রের যেখানে যেখানে বাংলাদেশিরা বসবাস করেন, তাদের সকলকেই এই প্রবন্ধে চোখ রাখতেই হবে। কারণ প্রত্যেকেরই জানা উচিত মায়ের দুধ শিশুর জন্য কতটা জরুরি। আর তা পেলে কী হতে পারে অথবা না পেলে কী ক্ষতি হতে পারে। স্বদেশ খবর চলতি সংখ্যা থেকে আসুন জেনে নিই জন্মের পর থেকে টানা ৬ মাস মায়ের দুধ শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে কী ধরনের উপকার হতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটে
ব্রেস্ট মিল্কে বিদ্যমান ভিটামিন, প্রোটিন, উপকারী ফ্যাট এবং প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক শিশুর শরীরে প্রবেশ করার কারণে ধীরে ধীরে নবজাতকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার আশানুরূপ উন্নতি ঘটে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষতিকর জীবাণু ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারে না। সেই সঙ্গে বারে বারে নিউমোনিয়া এবং ঠা-া লাগার মতো শারীরিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগের আশঙ্কা কমে
মায়ের দুধে উপস্থিত উপকারী উপাদান ছোট থেকেই শিশুর শরীরকে এতটাই মজবুত করে দেয় যে বড় হয়ে ডায়াবেটিস বা হার্টের রোগের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বে কম বয়সে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনা কেন ঘটছে। তাই মায়েরা, জন্মের পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত আপনার শিশু যাতে মায়ের দুধ পান করার সুযোগ পায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন দয়া করে।

হাড় শক্ত হয়
ব্রেস্ট ফিডিং করালে যে শুধু শিশুরই উপকার হয়, এমন কিন্তু নয়। শিশুর সঙ্গে সঙ্গে মায়েদেরও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে থাকে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে দুধ খাওয়ানোকালীন শিশুর যেমন হাড় শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে, তেমনি মায়েদের পোস্টমেনোপোজাল অস্টিওপোরোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

হঠাৎ মৃত্যুর আশঙ্কা কমে
গবেষণায় জানা গেছে, জন্মের পরপরই যদি নবজাতককে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করা যায়, তাহলে হঠাৎ করে শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক কমে যায়। বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট ডেথ বা নবজাতকের মৃত্যু এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এর জন্য শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানোকেই দায়ী করছেন চিকিৎসকেরা।

ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে না
ব্রেস্ট ফিডিং করালে মায়ের যেমন ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা হ্রাস পায়, তেমনি শিশুরও বড় হয়ে মোটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। প্রসঙ্গত, আজকাল যেখানে ওবিসিটির কারণে ইয়ং জেনারেশনের গড় আয়ু চোখে পড়ার মতো কমছে, সেখানে ব্রেস্ট ফিডিংয়ের গুরুত্ব আরো যে বেড়ে গেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ক্যান্সার দূরে থাকে
টানা ছয় মাস ব্রেস্ট ফিডিং করালে একদিকে শিশুর যেমন ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে, তেমনি মায়েরও ওভারিয়ান ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, সারা বিশ্বেই এখন যেভাবে ওভারিয়ান ক্যান্সারের প্রকোপ চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে এই পরিস্থিতিতে ব্রেস্ট ফিডিং করা কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে, তা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না।

মায়ের উপকার হয়
একাধিক কেস স্টাডি করে দেখা গেছে নিয়মিত ব্রেস্ট ফিডিং করালে মায়ের ইউটেরাস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। সেই সঙ্গে ইউটেরাইন ব্লিডিংও বন্ধ হয়ে যায়।