প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবার ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন ইউএন রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর এবং ইউএন রিপ্রেজেন্টেটিভ ইন বাংলাদেশ মিয়া সেপো। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে নারীর উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী ৫ জন জয়িতার হাতে সম্মাননা পদক তুলে দেন। পদক প্রাপ্তরা হচ্ছেন- অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে ঢাকা বিভাগের ‘দৃষ্টি’, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করায় খুলনা বিভাগের ‘মোসাম্মাৎ নাছিমা খাতুন’, সফল জননী ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির ‘হলা ক্রা প্র“ মারমা’, নির্যাতনের বিভীষিকা পেছনে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করায় ঢাকা বিভাগের ‘ফিরোজা খাতুন’ এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় রাজশাহী বিভাগের ‘আমেনা বেগম’।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, নারীরা অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবার ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। মেয়েদের যে মেধা আছে সেটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে এবং একটা সমাজকে যদি গড়তে হয় যে সমাজে প্রায় অর্ধেকই নারী সেই অর্ধেক বাদ রেখে একটা সমাজ উন্নত হতে পারে না। সমাজকে উন্নত করতে হলে নারী পুরুষ সবাইকেই সমানভাবে সুযোগ করে দিতে হবে। নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রেই তাদের যে শক্তি ও মেধা সেটা যেন কাজে লাগে তার ব্যবস্থাও করতে হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বলতেনÑ একটা মেয়ে যদি নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারে এবং তার হাতে যদি কিছু টাকা থাকে বা আঁচলে যদি কামাই করে ১০ টাকা বেঁধে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে সমাজ-সংসারে এমনিতেই তার অবস্থানটা অনেকটা দৃঢ় হবে। কেউ তাকে আর অবহেলা করতে পারবে না।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙক্তি- ‘বিশ্বে যা কিছু সুন্দর চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’Ñ উল্লেখ করে বলেন, নারীদের যদি আমরা সুযোগ করে না দেই তাহলে সেটা হবে না। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, এজন্য তাঁর সরকার ৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ইউনিয়ন পরিষদে নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ করেন যাতে তৃণমূল থেকেই নেতৃত্ব উঠে আসে।
শেখ হাসিনা বলেন, একটা সমাজে নারী-পুরুষ সকলে মিলে কাজ করতে পারলেই একটা দেশ এগিয়ে যাবে। আর যে লক্ষ্য আমরা স্থির করেছি, জাতির পিতা আমাদের যে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন তার সুফল প্রত্যেক ঘরে পৌঁছাতে হবে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে বড় হবে এবং বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে চলবে তারা যেন সমানভাবে চলতে পারে সেভাবেই তাদেরকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। সমাজে যদি নারী পড়ে থাকে তাহলে সেই সমাজ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সেজন্যই নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করে তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া, কর্মক্ষেত্রসহ সর্বক্ষেত্রেই তাদের বিচরণ যাতে নিশ্চিত হয় সেটাই আমাদের লক্ষ্য আর সে কাজটাই আমরা করে অনেক দূর এগিয়ে গেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেক উন্নত দেশে যা পারে না, বাংলাদেশের মেয়েরা তা পারে সেটাও আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি। কাজেই এটাই চাই আপনারা আমাদের বোনেরা একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে চলবেন। পাশাপাশি পরিবারের প্রতি যে দায়িত্ব সেটাও যথাযথভাবে পালন করবেন। কারণ কথাইতো আছে সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, একথাটাও যেন আমরা ভুলে না যাই। প্রধানমন্ত্রী এ সময় মেয়ের বিয়ের জন্য বাবা-মাকে তাড়াহুড়ো না করে তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো শিক্ষা প্রদানে মনোনিবেশ করার জন্যও তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর সরকার দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে প্রয়োজন, যেটা তাঁর সরকার করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের নারীদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক লেখাপড়া করার ব্যবস্থা, বৃত্তি-উপবৃত্তির শতকরা ৭৫ ভাগ নারীদের জন্য প্রদান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের পদক্ষেপ তুলে ধরে অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, নারীদের বিয়ে দিয়ে দিলেই তাদের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং দায়িত্ব আরো বাড়ে। কিন্তু মেয়েকে যদি লেখাপড়া শিখিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে তাহলে সেটাই আমার মনে হয় সমাজ ও পরিবারের জন্য সব থেকে ভালো হয় এবং একটি সুরক্ষা সৃষ্টি করতে পারে।
নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা সংবিধানের ১৯ ও ২৮ অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে অন্তঃপুরবাসিনী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বাংলার মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং বীরাঙ্গনা নারীদের পুনর্বাসনে তাঁর গৌরবদীপ্ত ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।