আন্তর্জাতিক

একনায়কতন্ত্রের পথে চীন : হুমকিতে বিশ্ব রাজনীতি!

স্বদেশ খবর ডেস্ক
চীনের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে দুই দশক আগে গভর্নর হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর এবার দেশটির নেতৃত্বের আসন পাকাপোক্ত করলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। অবাধ ক্ষমতার অধিকারী চীনের এ প্রেসিডেন্টকে সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুংয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট মেয়াদসংক্রান্ত সংবিধানের সংশোধনীতে অনুমোদন দিয়ে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা আজীবনের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে দেশটির রাবার স্ট্যাম্প সদৃশ পার্লামেন্ট।
পার্লামেন্টের এ অনুমোদনের ফলে ৬৪ বছর বয়সী শি জিনপিং যতদিন ইচ্ছা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। গত বছরের অক্টোবরে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসে শি জিনপিং পরবর্তী ৫ বছরের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে হিসেবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কথা ছিল শি জিনপিংয়ের। কিন্তু গত সপ্তাহে চীনের পার্লামেন্ট যে নিয়ম চালু করে তাতে আপাতদৃষ্টিতে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বনে যান শি জিনপিং।
শি জিনপিংয়ের পিতা শি ঝংজুন ছিলেন প্রখ্যাত বিপ্লবী নায়ক। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। তবে চীনে সংস্কার আনতে মাও সে তুং যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন তাতে বাগড়া দিয়েছিলেন ঝংজুন। এর ফলে ১৯৬২ সালে দেশটির সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কিছুদিন আগে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারণের পর কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। এ কারণে রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক জীবনও হয়ে পড়ে কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ। শি জিনপিংই প্রথম কোনো চীনা নেতা যার জন্ম ১৯৪৯ সালের পর; যখন দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের অবসানের পর মাও সে তুংয়ের কমিউনিস্ট বাহিনী দেশটির ক্ষমতায় আসে। তার পিতার ক্ষমতাচ্যুতির গ্লানি পরিবারকে পোহাতে হয় দীর্ঘদিন। ১৯৬৯ সালে কাউন্টি পর্যায়ের সেক্রেটারি হিসেবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় শি জিনপিংয়ের। ১৯৯৯ সালে উপকূলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের গভর্নর পদে অভিষিক্ত হন তিনি। ২০০২ ও ২০০৭ সালে ঝেজিয়াং ও সাংহাই প্রদেশের দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পান তিনি। ফুজিয়ান প্রদেশের দুর্নীতি ও অপরাধ নির্মূল করে দ্রুত সুনাম কুড়ান তিনি। ২০০৭ সালেই কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন শি জিনপিং। ২০০৭ সালে দুর্নীতির দায়ে সাংহাই নগরীর পার্টি প্রধান চেন লিয়াংগু বরখাস্ত হন। আর এতেই কপাল খুলে যায় শি জিনপিংয়ের। চেন লিয়াংগুর স্থলে নিয়োগ পান তিনি। ২০০৮ সালে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
মাও সে তুংয়ের বিপজ্জনক অর্থনৈতিক সংস্কার অভিযান ও ১৯৬৬-৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তা ও নীতি-নির্ধারকরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে একটি নতুন ব্যবস্থা চালুর পক্ষে একমত হন। এর লক্ষ্য ছিল একক কোনো নেতার হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে সহায়তা করা। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দূষণ, দুর্নীতি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা অত্যন্ত চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু কমিউনিস্ট প্রচারণায় ‘শি দাদা’ (বড় চাচা শি) হিসেবে খেতাব পাওয়া শি জিনপিং ২০১৩ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর গুঁড়িয়ে দিয়েছেন সব ঐতিহ্য। দুর্নীতিগ্রস্তদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করেন। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হওয়ার লক্ষ্যে দল পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও দলীয় নেতৃত্বই এখন তার কাছে প্রধান কাজ বলে ২০০০ সালে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছিলেন শি জিনপিং। ওই সময় ১ হাজার কোটি ডলারের একটি কেলেঙ্কারির ঘটনার পর তিনি দেশ থেকে দুর্নীতি সমূলে উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু সমস্যা মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংস্কার নাকচ করে দেন। সেই সময় চীনের এই প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি একটি দলীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক পরামর্শ ব্যবস্থা এবং গণমানুষের তত্ত্বাবধানে থেকে কাজ করবেন। শি জিনপিং বলেন, গণমানুষের সরকার কখনোই জনগণের কথা ভুলে যায় না। জনগণের সেবার জন্য যা করা দরকার তার সবকিছুই করা হবে। কিন্তু এ কাজে সব সরকারি কর্মকর্তাকে পাওয়া সহজ হবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি ভালো হবে না, আবার অন্যান্য ক্ষেত্রে এটি খুব বাজে কাজ করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় এখন ভরে গেছে শি জিনপিংয়ের মুখ। অনেক সময় চীনের এই প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ ও নির্দেশনা সংবাদের শিরোনামে আসে। প্রেসিডেন্ট থেকে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান শি জিনপিংকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশটিতে তিনি সর্ব বিষয়ের চেয়ারম্যান উপাধি পেয়েছেন।
ইতিহাসবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক ঝ্যাং লিফান বলেছেন, শি জিনপিংকে ক্ষমতায় রাখতে সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ আগেই অনুমান করা যাচ্ছিল। কিন্তু কত বছর তাকে ক্ষমতায় রাখার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। চাইলে তিনি জিম্বাবুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের চেয়েও বেশি সময় দেশ শাসন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভবিষ্যতে কী হবে তা কেউ বলতে পারে না। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার বিষয়টি অনেকে পছন্দ করবেন না এটা হলফ করেই বলা যায়।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্যই চীনারা শি জিনপিংয়ের হাতে আজীবন প্রেসিডেন্টের পদ তুলে দিয়েছে। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট’ বাস্তবায়নের জন্য চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা শি জিনপিংয়ের আজীবনের জন্য প্রয়োজন ছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তা-ই করেছে। চীনকে বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত করতে চীনারা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়েও বড় করে তুলেছে শি জিনপিংকে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এই সিদ্ধান্তের ফলে মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়বে বিশ্ব রাজনীতি। চীনকে সুপার পাওয়ারে পরিণত করতে শি জিনপিং একনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন শিগগিরই। চীনারা ভালো করেই জানে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট’ একমাত্র জিনপিংয়ের পক্ষেই সম্পন্ন করা সম্ভব। আর তাই বিশ্ব রাজনীতিকে হুমকির মধ্যে ফেলেও চীনারা চীনের সর্বময় ক্ষমতা তুলে দিয়েছে শি জিনপিংয়ের হাতে। এখন সময়ই বলে দেবে, আগামীতে কতটা একনায়ক হয়ে উঠবেন চীনের বর্তমান এবং আজীবনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।