রাজনীতি

খালেদা জিয়ার মুক্তিকেন্দ্রিক আন্দোলনেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপির রাজনীতি : জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতার বাইরে থেকে জনকল্যাণ ও জনস্বার্থ ইস্যুতে বিএনপি এ যাবৎ যত না আন্দোলন করেছে তার চেয়ে বেশি কর্মসূচি পালন করেছে খালেদা জিয়ার বাড়ি উদ্ধার, তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার মামলাকেন্দ্রিক আন্দোলন ইস্যুতে। অর্থাৎ বিএনপিতে দলের চেয়ে ব্যক্তি ও পরিবারই বড় হয়ে সামনে এসেছে বরাবরই। এবারও ব্যক্তি ইস্যুটি বড় হয়ে উঠেছে। বিএনপির আন্দোলন এখন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জেলমুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে বিএনপির কাছে বড় হয়ে উঠেছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি।
খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে, না খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেÑ বিএনপি এখন এই কঠিন সমীকরণটির সামনে দাঁড়িয়ে। বিএনপির একটি পক্ষ বলছেÑ খালেদা জিয়া জেলেই থাকুক, এতে তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের বৈতরণী বেশ ভালোভাবেই পার হওয়া যাবে। বিএনপির আরেকটি পক্ষ বলছেÑ খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপি ফ্লপ। জেলে থাকার কারণে খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে না পারেন, তাহলে ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার আসবে না। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচনে অংশ নিলে ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ৩০টির বেশি আসন পাবে না। সে হিসাবে বিএনপির উচিত, খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘসূত্রতার আবর্তে পড়েছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। কবে মুক্তি মিলবে তা অনেকটা অনিশ্চিত। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে আছেন ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। এই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভের পর তা ১৮ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেছে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্টের দেয়া জামিন যদি আপিল বিভাগ বহালও রাখে তারপরও সহসা মুক্তি না-ও পেতে পারেন খালেদা জিয়া। কারণ তাকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে ৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় কুমিল্লার একটি আদালতের নির্দেশে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২৮ মার্চ কুমিল্লার আদালতে ওই মামলার জামিনের শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। তার আগে ওই তারিখে তাঁকে হাজির করার জন্য কারাগারে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট পাঠানো হয়েছে। এখন ওই মামলায় জামিন হওয়ার আগে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন না। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা আরো ৩টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও তিনি জামিন নেননি।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা মামলাগুলো হলোÑ মানহানির অভিযোগে নড়াইলে দায়ের করা একটি; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মানচিত্র ও জাতীয় পতাকাকে অবমাননার অভিযোগে ঢাকার আদালতে একটি এবং ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগে ঢাকার আদালতের একটি মামলা। কারামুক্তি পেতে হলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টসহ মোট ৫টি মামলায় জামিন নিতে হবে খালেদা জিয়াকে। প্রত্যেক মামলায় আলাদাভাবে জামিন নিতে সময় লাগবে। জামিন না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে কারাগারেই থাকতে হবে।
বিএনপির আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, এক মামলায় জামিন হলে আরেকটিতে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। তিনি যাতে দ্রুত কারাগার থেকে মুক্ত হতে না পারেন সেজন্য এসব করা হচ্ছে। আইনজীবীরা ধারণা করছেন, এ অবস্থায় যদি পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাহলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দিনক্ষণ অনিশ্চিত।
এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, উচ্চ আদালতে যদি জামিন বহাল থাকে তারপরও সহসা মুক্তি পাবেন না খালেদা জিয়া। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা মামলাগুলোতে জামিন না পেলে কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন না খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমরা কৌশলগত কারণে পরোয়ানা জারি হওয়া মামলাগুলোতে আগে জামিন নিইনি। খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে আমরা এক ধরনের কৌশল নিয়েছিলাম, কিন্তু সরকার তাঁকে আটকে রাখতে আলাদা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এই কৌশলকে হাতিয়ার করতে আদালতকে ব্যবহার করছে সরকার। আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব এবং সফল হব। সানাউল্লাহ মিয়া আরো বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট জামিন দেয়ার পরপরই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তার মানে সবই সাজানো। খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, ঢাকার দুটি, কুমিল্লার একটি এবং নড়াইলের একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। এসব মামলায় জামিনের আবেদন করা হবে। এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ করে রাখতে চায় সরকার। সরকার খালেদা জিয়াকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায় বলেই ক্ষমতাসীনরা সুপরিকল্পিতভাবে মামলাগুলো সাজাচ্ছে।
এসব প্রেক্ষিতে বোঝা যাচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হয়ত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত জেলেই থাকতে হতে পারে। খালেদা জিয়া জেলে থাকলে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কি নাÑ বিএনপির সামনে এটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মী সমর্থকই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য উদগ্রীব। অথচ দলটির চেয়ারপারসন আছেন জেলে। এখন বিএনপি সহায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন আয়োজনের জন্য আন্দোলন করবে, না খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন করবে তা নিয়ে আছে দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
বিএনপির একটি পক্ষ চাইছে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি এখনই জ্বালাও-পোড়াও শুরু করুক। এই পক্ষটিকে কোণঠাসা করে রাখছে মহাসচিব গ্রুপ। ফখরুলপন্থিদের কথা হলো খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করবে এবং আইনের ওপরই বিষয়টি ছেড়ে দেবে।
বিএনপির অপর একটি গ্রুপ সরকারের সঙ্গে সমানতালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই গ্রুপটি খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে জিয়া বা তারেকপন্থি একটি বিকল্প বিএনপি গঠন করতে চায়। বিএনপির অভ্যন্তরে এ নিয়ে চলছে ঠা-া লড়াই। দলের কোনো নেতাই কোনো নেতাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এমতাবস্থায় হতাশ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা।