প্রতিবেদন

জাতীয় পাট দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী পাটকলগুলোকে লাভজনক করার আহ্বান শেখ হাসিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঘুরে দাঁড়িয়েছে ‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট। কৃষি এ পণ্যটির চাহিদা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, গত ৯ বছরে রপ্তানি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। পাটশিল্পে পুনর্জাগরণে দেশে পাটচাষের ধুম পড়েছে। কয়েক বছরে চাষিরা পাট চাষ করে লাভবান হওয়ায় পাট চাষের জমির পরিমাণও বাড়ছে। গড়ে উঠছে পাটজাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এ শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে পাটের জিন আবিষ্কারের পর থেকেই পাট নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। পাটের পাতা থেকে তৈরি চা বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে উন্নত মানের তন্তু। নানা কাজে পাটের তৈরি উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে। পাটের ব্যবহার বাড়ায় পাটচাষিদের যেমন আর্থিক উন্নয়ন ঘটছে, তেমনিভাবে দেশের অর্থনীতিকেও উল্লেখযোগ্য ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাটশিল্পের পুনর্জাগরণের এ ধারা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।
৬ মার্চ ছিল জাতীয় পাট দিবস। পাট মন্ত্রণালয় এ উপলক্ষে ৩ দিনব্যাপী পাটপণ্য মেলার আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেলার উদ্বোধন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরো পাটখাতের যান্ত্রিকীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে দেশের সরকারি খাতের পাটকলগুলোকে লাভজনক করে তুলতে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বড় সমস্যা রয়েছে যন্ত্রপাতিগুলো অত্যন্ত পুরনো, কাজেই এই মেশিনারিজগুলো সব বদলাতে হবে। নতুন মেশিনারিজের ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও এ ব্যাপারে আমরা সবরকম চেষ্টা করছি। আমরা পাটকে আরো আধুনিকীকরণের মাধ্যমে পাট উৎপাদন, পাট সংগ্রহ, পাট সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছি।
তাঁর সরকার বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কেবল সরকারি খাতে প্রতিষ্ঠান থাকলে ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের মাঝে ঢিলেঢালা ভাব চলে আসতে পারে, পণ্য উৎপাদনে যার প্রভাব পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের মানসিকতা পরিত্যাগ করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে শিল্প আপনাদের জীবন-জীবিকার সবরকম উপকরণ দিচ্ছে সেই শিল্পকে বাঁচাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে তাঁর সরকার বন্ধ পাটকলগুলো চালু করেছে। ৫টি পাটকল চালু করা হয়েছে। খুলনায় ৪টি এবং সিরাজগঞ্জে ১টি। এই পাটকলগুলোর ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ ছিল যেটি সরকার মওকুফ করে সরকারই তা পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে কেবল যে কৃপণতা করে তাও নয়, বরং পাটকলগুলোর দায়-দেনা মুক্ত করে তাকে নতুনভাবে চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন এগুলোকে সচল রাখার দায়িত্ব, যারা পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের, সংশ্লিষ্ট শ্রমিক এবং কর্মচারী প্রত্যেকের। প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, আর যেখানেই যেটুকু সমস্যা দেখা দেয় তা সমাধান করবে তাঁর সরকার। তিনি বলেন, যেহেতু পাটের বাজার এখন খুলে গেছেÑ আমরা রপ্তানি করতে পারছি, আমরা যতই উন্নতমানের পণ্য তৈরি করতে পারবো ততই আমাদের বাজার বৃদ্ধি পাবে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশে পাটের বাজার সৃষ্টিতে তাঁর সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ এর কথা উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, এ আইন প্রণয়নের ফলে দেশে পাটের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে কারণ এই পাট আমাদের জাতীয় সম্পদ। একদিকে এটি কৃষি সম্পদ অন্যদিকে আমাদের শিল্পপণ্য কাজেই এর অনেক সম্ভাবনা রয়েছে এবং অনেক উন্নতমানের পাটও পাটজাত পণ্য আমরা তৈরি করতে পারি। সে সম্ভাবনাও আমাদের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী পাটের ওপর দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে অনুষ্ঠিত রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদেরও দেশের পণ্য সম্পর্কে জানা একান্তভাবে প্রয়োজন। দেশকে আগে জানতে হবে উল্লেখ শেখ হাসিনা বলেন, পাট উৎপাদন, পাট রপ্তানি, পাট প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে যারা পুরস্কার পেয়েছেন তাদেরকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আমি বলবো এই পরিবেশবান্ধব পণ্যটাকে আমাদের আরো উন্নত করতে হবে। তিনি সোনালি আঁশ হিসেবে পরিচিত পাট দেশের সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকল আদমজীসহ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে একের পর এক পাটকল বন্ধ করে দেয়ায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০২ সালে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ করে দিয়ে পাট শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। এতে মিলের প্রায় ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
১৯৯৬ সালে সরকারে আসার পর তিনি আবার পাটকলগুলো চালুর উদ্যোগ নিলেন এবং পাটের ওপর গবেষণার গুরুত্ব দেয়ায় ১১টি পাটপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশ অর্জন করল।
পাটের উন্নত চাষাবাদ ও বহুমুখী ব্যবহারের জন্য গবেষকরা কাজ করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এ সময় পাটের জিন গবেষক প্রয়াত মাকসুদুল আলমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাট নিয়ে গবেষণার ফলে অনেক নতুন নতুন আকর্ষণীয় পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। এ অনুষ্ঠানে তিনি যে শাড়িটা পরে এসেছেন সেটা পাটের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান তার পায়ের জুতাও পাটের তৈরি। নিজের ভ্যানিটি ব্যাগও সকলের সামনে প্রদর্শন করে বলেন, এটিও পাটের তৈরি।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মো. ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজম। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে আয়োজিত পাট বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ী এবং পাট উৎপাদন, পাট রপ্তানি, পাট প্রক্রিয়াজাতকরণসহ পাট খাতের সমৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত ১১টি ক্যাটাগরিতে ১২ জনকে পুরস্কৃত করেন। অনুষ্ঠানে পাট পণ্যের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্রও প্রদর্শিত হয়।