প্রতিবেদন

ঢাকা সফরকালে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াংয়ের অঙ্গীকার রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভিয়েতনাম

তারেক জোয়ারদার
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, যন্ত্র প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে ভিয়েতনামের সঙ্গে ৩টি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ। ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই নেতার উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এবং বৈঠক-পরবর্তী যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কার্যক্রমে ভিয়েতনাম সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে ২০১২ সালের ২ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, এবার তা নবায়ন করা হয়েছে। মেশিনারিজ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ভিয়েতনামের শিল্প ও ব্যবসা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ভিয়েতনামের সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং ভিয়েতনামের কৃষি ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী নুয়েন জুয়ান সেউয়ং দুই দেশের মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে নবায়নকৃত সমঝোতা স্মারকে সই করেন। মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং ভিয়েতনামের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভাইস মিনিস্টার কাও চুয়ক হুয়াং একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। আর সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান ও ভিয়েতনামের সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মিনিস্টার ড্যাং থাই বিচ লিয়েন তৃতীয় সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ বিবৃতিতে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রতি তাঁর দেশের সহযোগিতা সবসময়ই থাকবে।
যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। আমরা এই অঞ্চলের দেশগুলোর শান্তি ও স্থিতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমি ভিয়েতনামের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছি। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। পরে দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠক শেষে শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা, ভিয়েতনামের পক্ষে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান ত্রান দাই কুয়াং। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে দুই নেতার উপস্থিতিতে তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় বাংলাদেশ। রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া নির্যাতিত রোহিঙ্গারা যাতে সসম্মানে নিজ দেশে ফিরে যায়, সেটাই সরকারের লক্ষ্য। সেভাবেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, ব্যবসাবাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সৃষ্টির আগ্রহ প্রকাশ করে মেকং-গঙ্গা সহযোগিতা ফোরামে যোগদানে আগ্রহের কথাও জানান।
এ সময় প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াংকে বাংলাদেশ সফরে আসার সময় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল সঙ্গে নিয়ে আসায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারাই দুই দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের অগ্রগতির উপায় ও পদ্ধতি খুঁজে বের করতে সমর্থ হবেন। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম উভয়ের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছি দুই দেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনা খুঁজে বের করার। বাংলাদেশকে ভিয়েতনামের নিকট প্রতিবেশী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম একইরকম শান্তি ও প্রগতির প্রত্যাশী। যৌথ বিবৃতিতে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং বলেন, তিনি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে খোলামেলা এবং অন্তরঙ্গ পরিবেশে আলোচনা করেছেন। উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উভয় দেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরাধ ও সন্ত্রাসের তথ্যাদি বিনিময় করতে সম্মত হয়েছে। আলোচনায় আমরা দুই দেশের বিদ্যমান ঐতিহ্যগত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করি এবং দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করি।
প্রেসিডেন্ট কুয়াং বলেন, তারা ৪৬ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরো জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন এবং ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, যুব জনসংখ্যা এবং বিশাল বাজারের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন। উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে যে, তারা দেশের জনগণ এবং নেতৃবৃন্দের আকাক্সক্ষা ও স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সাফল্য অর্জনের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ে তিনি বলেন, উভয় দেশ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময়ের পাশাপাশি বহুজাতিক সম্মেলনের সাইড লাইনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে।
গত ১৪ বছরে এটি ভিয়েতনামের কোনো প্রেসিডেন্টর প্রথম বাংলাদেশ সফর। ২০০৪ সালে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ত্রান দাক লুয়ং সর্বশেষ বাংলাদেশ সফর করেন। ভিয়েতনাম ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রথমদিকে স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর অন্যতম।
৪ মার্চ বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট কুয়াংয়ের বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ৫ মার্চ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সেখানে তিনি একটি গাছের চারা রোপণ করে দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরে তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন।