প্রতিবেদন

দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ধীরে ধীরে মাথা তুলতে শুরু করেছে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বিমানবন্দর সড়কে গেলেই চোখে পড়বে ব্রিজের অর্ধশতাধিক ক্রস কলাম। এর ওপর ক্রস বিম স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে। আবার কোথাও চলছে টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৬ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এগিয়ে চলছে জোরেশোরেই। বহু আকাক্সিক্ষত এ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
রাজধানীর ওপর চাপ সৃষ্টি না করেই শত শত পণ্য ও যাত্রীবাহী হালকা-ভারী যানবাহন সহজেই এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলাচল করতে পারবে। এতে সময়ের সাশ্রয় হবে বহুগুণ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ১০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের মতো এ প্রকল্পটিকে ঘিরেও স্বপ্ন দেখছেন ঢাকাবাসী। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ দৃশ্যমান হওয়ায় এ স্বপ্ন যেন পাখা মেলতে শুরু করেছে। সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় ব্যাপক কর্মতৎপরতার চিত্র দেখা গেছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী এলাকায় গিয়ে শেষ হবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি। এটি নির্মিত হলে বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের কুতুবখালী পৌঁছতে মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় লাগবে (গাড়ি যদি কোথাও না থামানো হয়)। বর্তমানে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে যানজট থাকলে ২-৩ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে। তাছাড়া এক্সপ্রেসওয়ের কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী পয়েন্টে যানবাহন নামার ব্যবস্থা থাকবে। অন্যদিকে ফেরার পথেও ঠিক একইভাবে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, মগবাজার, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী ও কুড়িলে যানবাহন নামতে পারবে। এ প্রকল্প এলাকাকে ৩ অংশে ভাগ করে বাস্তবায়ন কাজ চলছে। প্রথম অংশে থাকছে বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় অংশে বনানী থেকে মগবাজার ৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার এবং তৃতীয় অংশে মগবাজার থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মূল প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পের পরিচালক কাজী মুহম্মদ ফেরদৌস স্বদেশ খবরকে বলেন, সাপোর্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজের ৪টি কম্পোনেন্টে সরকার সহায়তা দিচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য বিদ্যমান ইউটিলিটি ফ্যাসিলিটি স্থানান্তর, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ ও সামাজিক সমীক্ষা, আর্থিক মডেলিং, ট্রানজেকশনসহ আইনগত কাজে পরামর্শক সেবা প্রদান এবং পিপিপি প্রকল্পের নির্মাণ কাজে তদারকি করা। আমরা এরই মধ্যে মূল প্রকল্পের ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছি এবং যেভাবে কাজ এগিয়ে চলছে তাতে আশা করা যায়, লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
সূত্র জানায়, সাপোর্ট প্রকল্পটি ২০১১ সালে শুরু হলেও মূল প্রকল্পটি শুরু হয় ২ বছর পরে। যদিও আগামী ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। মূল প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪৪৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড বিনিয়োগ করছে। এছাড়া ২ হাজার ৪১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড (ভিজিএফ) হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতিমালা অনুযায়ী মূল পিপিপি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন, ইউটিলিটি স্থানান্তর ইত্যাদি কাজ অন্তর্ভুক্ত করে পিপিপির লিংক প্রকল্প হিসেবে সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। ওই সময় ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ২১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। পরবর্তী সময় কিছু নতুন অনুষঙ্গ সংযুক্ত করে এবং মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। ফলে সাপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে বিমানবন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টিন দিয়ে ঘেরা প্রি-কংক্রিট ইয়ার্ডে চলছে গার্ডার তৈরির কাজ। এগুলো পরবর্তী সময় এক্সপ্রেসওয়েতে সংযোজন করা হবে। বেসিন প্ল্যান্টে বসানো হয়েছে কলাম (খুঁটি)। এর কোনোটির ওপর লাগানো হয়েছে ক্রস বিম। এখানে কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ চলছে। কাজ চলছে ওয়ার্কশপের ভেতরেও। বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত পর্যন্ত কলামের কাজ প্রায় শেষের পথে। তবে গলফ ক্লাব এলাকা থেকে রেডিসন হোটেল পর্যন্ত ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা থাকায় এখনও কাজ শুরু করা যায়নি। রেডিসনের পর থেকে বনানী পর্যন্ত পাইল টেস্ট ও পাইলিংয়ের কাজ চলছে। বনানীতে আর্মি স্টেডিয়ামের কাছে ভারী যন্ত্র দিয়ে পাইলিং ও টেস্ট পাইলের কাজ চলছে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাটির নিচের অনেক কাজই শেষ হয়েছে। ওপরের কাজ করতে বেশি সময় লাগবে না। এছাড়া প্রকল্পের দ্বিতীয় ভাগে বনানী থেকে তেজগাঁও অংশের অধিগ্রহণ করা জমি থেকে বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। প্রকল্পের তৃতীয় অংশের জমি অধিগ্রহণও শেষ হয়েছে। সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি ইতাল-থাইয়ের সঙ্গে প্রথম চুক্তি করে সেতু বিভাগ। সে বছর ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় কাজ আটকে থাকে দু’বছর।