কলাম

নির্বাচনের বছরে গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
আগামী ডিসেম্বর মাসে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেই হিসাবে ২০১৮ সালটিকে সবাই নির্বাচনের বছর বলেই দাবি করছে। যদিও আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দেশের সমস্যা বা উন্নয়ন করণীয় নিয়ে ততটা সিরিয়াসনেস দেখা যায় না যতটা তারা দেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে, ব্যস্তও থাকে। একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরপরই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের কথা বলতে দেখা যায়। উন্নত কোনো দেশে জাতীয় সংসদ বা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কখন আসে যায় তা সেসব দেশের মানুষ শোনে বা জানে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে-পরেই কেবল। উন্নত দেশগুলোতে ক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও কাজকর্ম ফেলে রেখে কেউ দেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে তত মাথা ঘামায় না, ঘামানোর প্রয়োজন খুব বেশি পড়েও না। যেসব দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গণতন্ত্র সুরক্ষিত, বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই- সে সব দেশে নির্বাচনে কোন দল জিতেছে, কোন দল হেরেছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বা হতাশা নেই, হেরে যাওয়া দল বরং পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করে, নতুন নেতৃত্বের হাতে দলের দায়িত্ব দিয়ে পুরাতন নেতারা বিদায় গ্রহণ করেন। আমরা তেমন স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে সেই স্বর্গ আমরা কবে দেখতে পাব- পৌঁছাতে পারব কি পারব না সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ- তবে তা এখনো কত দূরে তা আমরা জানি না।
কারণ অবশ্য মোটা দাগে বলা যায়, গণতন্ত্রের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা-দীক্ষার অপরিহার্যতা রয়েছে তার অনেক কিছুই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে অনুপস্থিত। যারা রাত-দিন গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছেন- তারাও গণতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তি ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে খুব একটা কথাবার্তা বলেন না। ফলে আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রের ধারণা, বাস্তবতা, রাজনৈতিক শিক্ষা-দীক্ষার সংস্কৃতি যেখানে প্রবৃদ্ধি ঘটানোর কথা, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র চাপা পড়ে যাচ্ছে অগণতান্ত্রিক শক্তির টকটকানির কাছে, নির্বাচনের দৌড়েও পিছিয়ে পড়ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আমাদের সমাজে যে মানুষটি গণতন্ত্র মানে না, গণতন্ত্র যার কাছে নিরাপদ নয় সে সর্বত্র তার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বেশি চেঁচামেচি করছে, সেটিই তার গণতান্ত্রিক অধিকার বলে ধারণা নিয়ে থাকছে। অথচ গণতন্ত্র হচ্ছে যুক্তি, আইন ও সভ্যতার শাসন। অসভ্যতা, অযৌক্তিকতা, অপশক্তির অধিকার রক্ষা করা গণতন্ত্রের সংস্কৃতিতে পড়ে না। গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির অবারিত অধিকার দিয়ে আমাদের মতো অনুন্নত সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশে গণতন্ত্র কখনো বিকশিত হবে না, বরং পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। নিকট অতীতের কয়েক দশকের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির বিষয়গুলো গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখলে, কিংবা বিচার-বিশ্লেষণ করলে গণতন্ত্রের উল্টোপথে দেশ হাঁটার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমাদের গণতান্ত্রিক শক্তি বলে দাবিদার রাজনৈতিক, সুশীলসহ বিভিন্ন শক্তি বা মাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য প্রকৃত গণতন্ত্রের উপস্থাপনা যথাযথভাবে খুব একটা করছেন বলে মনে হয় না। সবাই গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চেঁচামেচি করছে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি কারা- তাদের চিনিয়ে দেয়া, গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে গণতন্ত্রবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চেহারাটা তারা উন্মোচন করে দেয়ার দায়িত্ব পালন করছেন না। ফলে গণতন্ত্রের পথে আমাদের যাত্রা কেবলই পিচ্ছিল, দুর্গম, বাধাগ্রস্ত, কণ্টকাকীর্ণ হচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে অগণতান্ত্রিক শক্তির দাপট যত বেশি, প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তির অবস্থান ততটা সংহত নয়। দেশে গণতন্ত্রের মাঠ যে কতটা জটিল, ভয়ঙ্কর অপশক্তির থাবার নিচে পড়ে আছে তা আমরা খুব একটা বিবেচনায় নিচ্ছি না। গণতান্ত্রিক শক্তির দুর্বলতা যত বেশি, অগণতান্ত্রিক শক্তির অর্থশক্তি প্রচার-প্রচারণার রসদ তার চেয়ে অনেক বেশি।
এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়, অতীতেও কমবেশি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে যে, আমাদের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ তাদের প্রতিপক্ষ সম্পর্কে ততটা সচেতন ছিল না, ঐক্যবদ্ধ ছিল না। এর পরিণতিতে অনেকবারই গণতান্ত্রিক শক্তিকে নির্বাচনে পরাজিত হতে হয়েছে, অগণতান্ত্রিক শক্তি জয়ী হয়ে দেশকে সাম্প্রদায়িক ধারায় অনেক দূর পিছিয়ে নিয়েছে, গণতান্ত্রিক শক্তিকে নির্মূল করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে, বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনা ও ধারা থেকে যোজন যোজন দূরে নিয়ে গেছে, নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গতিময়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, সংশয়ে ফেলে দিয়েছে, বিভ্রান্ত করেছে, নানা অপপ্রচারের রসদ তৈরি করে তা মানুষের মনোজগতের খোরাক হিসেবে ছেড়ে দিয়েছে। জাতীয় শৌর্যবীর্য নিয়ে বিকৃত তথ্য-উপাত্ত প্রচারণায় ছেড়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এগোতে গিয়ে বারবারই হোঁচট খেয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে।
অথচ আমাদের দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির মুখ দেখতে শুরু করেছে, মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে, দেশের গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক এমন তাক লাগানো সমৃদ্ধি মানেই কিন্তু গণতন্ত্রের তরতর করে উঠে যাওয়া নয়। অর্থবিত্তশালী হলেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে পরিচালিত হবেন- তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমাদের এখানে অর্থবিত্তের বিস্তারের সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম, নানা ধরনের বিষয়-আশয় জড়িত রয়েছে- যা এক কথায় গণতন্ত্রের সঙ্গে ততটা যায় না। এটি বুঝতে হবে। অনেক শিক্ষিত মানুষও মতাদর্শের শ্রেণিকরণ সম্পর্কে ততটা সচেতন নন, সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের গ-ি থেকে তারা বের হতে পারছে না। রাজনৈতিক দলগুলোতেও নেই বাংলাদেশের বাস্তবতার প্রতিবিম্বিত জ্ঞানবোধ- যা তার বিচার-বিশ্লেষণ-ক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এখানে দুর্নীতি, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদিতা, দ্বিচারিতা, কূপম-ূকতা ইত্যাদি নানা পশ্চাৎপদ বিশ্বাসের বৃত্ত থেকে সমাজের বড় গোষ্ঠী বের হতে পারছেন না; তারা যুক্তি, তথ্য-উপাত্তের ধার ধারেন না, প্রচার-প্রচারণায় অনেক বেশি বিভ্রান্ত হন।
এখন দেশে নানা ধরনের গণমাধ্যম রয়েছে। দেশে শত শত পত্রপত্রিকায় নানা খবর ও লেখালেখিতে পাঠকদের ধরে রাখার প্রতিযোগিতা চলছে। সংবাদপত্র সাধারণ পাঠকদের কাছে দেশের রাজনীতির বিষয়কে এ মুহূর্তে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপনা করছে। কিন্তু সব সংবাদপত্রই সংবাদপত্রের শিক্ষা, আদর্শ অনুসরণ করে একভাবে চলে না। অনেক পত্রপত্রিকাই সাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক শক্তির অর্থ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে থাকে। সে সব পত্রিকা তাদের মুরব্বিদের পছন্দের খবরকে গুরুত্ব দিতে মোটেও কসুর করে না। এ ধরনের বেশ কিছু পত্রিকা মানুষকে বিভ্রান্ত করার মিশন নিয়েই মাঠে এসেছে, এখনো আছে। গণতন্ত্রের সংস্কৃতিকে ধারণ, বহন ও এগিয়ে নেয়ার লক্ষণ ততটা দেখা যায় না। এ ধরনের সংবাদপত্রকে কতটা গণমাধ্যম, কতটা অগণতান্ত্রিক শক্তির পত্রপত্রিকা বলা সঙ্গত হবে- তা ভেবে দেখার বিষয়। অনেক প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাও জনতুষ্টিমূলক সংবাদকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করে থাকে, নিজেদের কাটতি বাড়িয়ে এক ধরনের জনমত তৈরি করার চেষ্টাও করে থাকে। লেখালেখিতেও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ব্যক্তিদের মতামত নেয়া, দেয়া, জনমত যেন প্রকৃত সত্য থেকে ছিটকে না পড়ে সে দিকগুলো লক্ষ্য রেখে লেখালেখি করা কতটা প্রয়োজন তা বলাই বাহুল্য। যেমন এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর খবরাখবর ও লেখালেখি প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ খবরই যতটা না আবেগতাড়িত, তার চাইতে বেশি বাস্তব ধারণা না দেয়ার দুর্বলতায়পুষ্ট। আইন, আদালত, বিচারের বিধি, নিয়ম-কানুন এত সহজ নয়। আমরা ক’জনই এগুলোর খুঁটিনাটি জানি। না জানা বা কম জানা মানুষ যখন এসব খবরাখবর পরিবেশন করবেন, লেখালেখি করবেন- তখন বেশির ভাগই ভুল ধারণা জন্ম দিতে সাহায্য করতে পারে।
গত ৮ ফেব্র“য়ারির আগে পরে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাগুলো যত খবর ও লেখালেখি প্রকাশ করেছিল- তার কত শতাংশ আইন, বিচার বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ার বিষয়াদির তথ্য ও ব্যাখ্যা সংবলিত হয়েছে- তা নিয়ে বিশ্লেষণ করলে আমার মনে হয় আমাদের হতাশই হতে হবে, বিভ্রান্তিকর জনমত তৈরিতেই তা বিশেষভাবে অবদান রেখেছে। একইভাবে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও বেতার থেকে যেসব আলোচনামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে বা হচ্ছে তাও আইন, বিচারালয়, মামলা ইত্যাদির ধারণা লাভে সাহায্য করার চেয়ে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির পক্ষ-বিপক্ষে-তর্কযুদ্ধের দৃশ্য দেখতেই বেশি সাহায্য করেছে। এতে জনমত বিভ্রান্ত হয় রাজনৈতিকভাবে বেশি, শিক্ষিত ব্যক্তি হয় কম। সামাজিক মাধ্যম বলে খ্যাত মাধ্যমটিতে যার যা খুশি লেখা এবং মতামত দেয়ার প্রবণতা প্রবল। অথচ আমরা ক’জন আইন সম্পর্কে ভালো লেখাপড়া জানি, খোঁজ খবর রাখি, বিচারালয় সম্পর্কে খোদ আইনজীবীদের অনেকেরই ধারণা প্রত্যাশিত মানের ধারেকাছেও নেই- সেটিই স্পষ্ট হচ্ছে। আমাদের অনেক বড় বড় আইনজীবী জিয়া এতিমখানা মামলা সম্পর্কে এমন সব বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বলেছেন যা আইন ও বিচার সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরো পিছিয়ে দিয়েছে। ওই যে বলেছি, যার যা খুশি তা বলাই গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্র হচ্ছে আমি কী বলছি, কেন বলছি, সেটি মানুষকে তথ্য-উপাত্ত ও বুঝতে, শিখতে কতটা উদ্বুদ্ধ করবে, আমাদের গণতন্ত্রকে অগ্রসর করতে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে- সেই সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের এই বছরটিতে আমরা সব গণমাধ্যমেই নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে জনমত গঠন করার নামে কথা বলছি, শুনছি। ভালো কথা, গণমাধ্যমগুলোর বোধ হয় ভেবে দেখা উচিত বিশেষজ্ঞ জ্ঞানে সমৃদ্ধ মানুষের মতামত, লেখালেখিকে গুরুত্ব বা প্রাধান্য দেয়া। যারা স্রেফ গলাবাজি করেন তাদের পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় না করাই মঙ্গলজনক। আমাদের রাজনীতির, সমস্যাগুলো গভীর বাস্তবতায় তুলে ধরা প্রয়োজন, মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন ভুল বা বিকৃত তথ্য ও কথাবার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া জরুরি। সুস্থ বিতর্ক হবে, গণতন্ত্রের সমস্যা ও করণীয় নিয়ে সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা থাকবে- এমন গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের মানুষজন গণমাধ্যম থেকে দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন-আদালত বিচার ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবে, তাদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি হবে- সেটিই প্রত্যাশিত। তাহলেই দেশের গণতন্ত্র বিকশিত হবে, নতুবা বিভ্রান্ত জনমত গঠিত হয়ে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ক্ষতি বই লাভ হবে না। এখনই সেই সচেতনতা থেকে দেশের গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখার অবস্থানেই দেখতে চাই, পেতে চাই। তাহলেই গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়