প্রতিবেদন

পরপারে চলে গেলেন পদার্থবিদ্যার অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং মারা গেছেন। ১৪ মার্চ ক্যামব্রিজে নিজ বাড়িতে তার জীবনাবসান হয়। তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার এই দিকপালকে আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের ‘উজ্জ্বলতম নক্ষত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্টিফেন হকিংয়ের সন্তান লাকি, রবার্ট ও টিম তাদের পিতার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে সর্বসাধারণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় বাবা মারা গেছেন। তিনি একজন মহৎ বিজ্ঞানী ও অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তার কাজের মাধ্যমে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন।’ সন্তানরা স্টিফেন হকিংয়ের ‘সাহস ও অধ্যবসায়’-এর প্রশংসা করেন। তার ‘প্রতিভা ও রসবোধ’ গোটা বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মাত্র ২০ বছর বয়সে বিরল প্রকৃতির মোটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হন স্টিফেন হকিং। সে সময় চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেনÑ মাত্র দুই বছরের বেশি বাঁচা সম্ভব নয় হকিংয়ের। কিন্তু চিকিৎসকদের সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন আরো ৫৬ বছর। তবে ওই অসুস্থতার কারণেই বাকি জীবন তাকে হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়। তার বাকশক্তি প্রায় লোপ পায়। বিশেষভাবে নির্মিত ভয়েস সিন্থেসাইজার দিয়ে কথা বলতে পারতেন তিনি। তবে এতসব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও থেমে থাকেনি তার গবেষণা কার্যক্রম।
এই বিজ্ঞানীর মৃত্যুতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানসহ অন্যান্য বিশ্বনেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খোলা হয়েছে শোক বই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্টিফেন হকিংয়ের ভক্তরা এতে শোকবাণী লিখছেন। টুইটারে এক শোকবার্তায় টেরেসা মে বলেন, স্টিফেন হকিংকে বিশ্ববাসী কোনো দিন ভুলবে না। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এক শোকবার্তায় বলেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ‘বিগ ব্যাং থিউরির’ প্রবক্তা স্টিফেন হকিং ছিলেন বর্তমান সময়ের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর অধ্যবসায়, প্রতিভা এবং জীবনসংগ্রাম ছিল অতুলনীয়। তিনি বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে, তা অপেক্ষবাদ ও কোয়ান্টাম মেকানিকসের সমন্বয়ে নিজের তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন স্টিফেন হকিং। কৃষ্ণগহ্বর থেকে শক্তি চুইয়ে বেরিয়ে যায় এবং এর ফলে কৃষ্ণগহ্বর এক সময় হারিয়ে যায় বলে তিনি যে ধারণা দেন, তাই এক সময় হকিং রেডিয়েশন নামে পরিচিতি পায়। স্যার রজার পেনরোজের সঙ্গে করা যৌথ গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, আইনস্টাইনের দেয়া আপেক্ষিকতার সাধারণ সূত্রানুসারে স্থান-কালের শুরু বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে এবং এর সমাপ্তি হয় কৃষ্ণগহ্বরে।
বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক ৩০০ বছর পর জন্ম হয়েছিল স্টিফেন হকিংয়ের। আর তিনি মারা গেলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকীর দিনে। মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে নানা কথা চালু থাকলেও হকিং মনে করতেন, এ শুধুই রূপকথা। সেই রূপকথার জগতেই অবশেষে ঠাঁই নিলেন এই বিজ্ঞানী। পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্টিফেন হকিংকে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুরারোগ্য মোটর নিউরন ব্যাধি ছিল হকিংয়ের। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা তাকে রুখতে পারেনি। আইনস্টাইনের পর হকিংকে বিখ্যাত পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হতো। তিনি ছিলেন রসবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। বিজ্ঞানের একজন জনপ্রিয় দূত এবং তিনি সব সময় নিশ্চিত করতেন যেন তাঁর কাজ সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারেন। তাঁর লেখা বই এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম অনেকটা ধারণার বাইরে বেস্ট সেলার বা সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ে পরিণত হয়। জীবদ্দশায় তিনি বেশকিছু টেলিভিশন প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে কৃত্রিম কণ্ঠস্বরের সাহায্যে কথা বলেন। তার বাবা ছিলেন একজন জীববিজ্ঞানের গবেষক। জার্মানি থেকে লন্ডনে পালিয়ে যান তিনি। স্টিফেন হকিং লন্ডন এবং সেন্ট অ্যালবানসে বেড়ে ওঠেন। অক্সফোর্ডে পদার্থবিদ্যার ওপর প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি অর্জন করে ক্যামব্রিজে কসমোলজির ওপর স্নাতকোত্তর গবেষণা করেন তিনি।
১৯৮৮ সালের মধ্যে হকিংয়ের অবস্থা এমন হলো যে শুধু কৃত্রিম উপায়ে কথা বলতে পারতেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার অসুস্থতা তার জন্য কিছু উপকারও এনে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, অসুস্থ হবার আগে তিনি জীবন নিয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। অবশ্য তার শারীরিক অবস্থা অবধারিতভাবেই তাকে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। তিনি প্রায় সময়ই তার প্রথম স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা বলতেন। যিনি ২০ বছরেরও বেশি তার দেখাশোনা করেছেন। যদিও তিনি যখন তার একজন নার্সের জন্য প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন তখন তার বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনরা বেশ অবাক হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে তিনি তার সাবেক নার্সকে বিয়ে করেন। ২০০০ সালে তিনি বেশ কয়েকবার ক্যামব্রিজের একটি হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। ওই সময় একটি অভিযোগ আসে যে তিনি কয়েক বছর যাবৎ নানাভাবে মৌখিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে। তবে তিনি ছিলেন বেশ খেয়ালি। তার হুইলচেয়ারটিই তিনি প্রায় সময় বেপরোয়াভাবে চালাতেন এবং হকিং বারবার বলেন যে, তার এসব আঘাত কোনো নির্যাতনের কারণে হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশও আর এগোয়নি। ২০০৭ সালে তিনি প্রথম চলৎশক্তিহীন ব্যক্তি হিসেবে একটি বিশেষ বিমানে ওজনশূন্যতার অভিজ্ঞতা নেন। মানুষকে মহাকাশ ভ্রমণে উৎসাহ দেয়ার জন্যই তিনি এটি করেছেন বলে জানান। তখন হকিং বলেন, আমার বিশ্বাস পারমাণবিক যুদ্ধ, জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে তৈরি ভাইরাস অথবা অন্য কোনো কারণে পৃথিবীতে প্রাণের অবসান হতে পারে। মানুষ যদি মহাকাশে না যায় তাহলে আমার মনে হয় মানব জাতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। যে কারণে আমি মানুষকে মহাকাশে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চাই। ২০১৪ সালে স্টিফেন হকিংয়ের জীবন নিয়ে তৈরি হয় ‘থিওরি অব এভরিথিং’ চলচ্চিত্র। জেন হকিংয়ের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় চলচ্চিত্রটি। ডিসকভারি চ্যানেলের সঙ্গে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পৃথিবীর বাইরে কোনো বুদ্ধিমান জীবনের উপস্থিতি আছে এমন ধারণা করাটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং এলিয়েন বা ভিনগ্রহবাসীরা প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে পৃথিবীতে অভিযান চালাতে পারে।
প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ান্স পুরস্কার, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদক অর্জন করেছিলেন স্টিফেন হকিং।