সাহিত্য

ফক্রে জামাই

অরুণ কুমার বিশ^াস
আপনারা যে যাই বলুন না কেন, জাতি হিসেবে বাঙালি কিন্তু বেশ পরিপুষ্ট, সাংঘাতিক বুদ্ধিদীপ্ত ও সৃজনশীল। এরা শব্দ ও পদবাচ্য নিয়ে জবরদস্ত খেলতে জানে। নইলে একজন বঙ্গললনার জামাই মানে বিয়ে করা বর কী করে ফক্রে হয়, ভাবুন একবার! বলতে নেই, ফেসবুকের কল্যাণে আমার মতো নাদান পাবলিক যারা, তাদের বেজায় ও ব্যাপক জ্ঞানলাভ হচ্ছে। উপর্যুক্ত পদবাচ্য আমি কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে চাক্ষুষ করেছি। বলা ভালো যে, ফেসবুক আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছে। ফলে নিজেকে ইদানীং বেশ খানিকটা জানেমানে লোক বলেও মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ, বলছিলাম ফক্রে জামাইকে নিয়ে। জনৈক সুশ্রী বিদুষী নারী সহসাই তার ফেসবুক টাইমলাইনে হাসি হাসি মুখের একখানা ছবি পোস্ট করে নিচে লিখলেনÑ ফক্রে জামাই। প্রথমে ভেবেছি ঠিকঠাক ‘পেটিকোট মানি’ পায়নি বিধায় ওই পোস্টের মাধ্যমে রমণী বুঝি তার জামাইয়ের গোষ্ঠী উদ্ধার করেছে। ফোরটুয়েন্টি বোঝাতে হয়ত ফক্রে লিখেছে। নাম হয়ত তার ফখরুল বা ফকরুল, ওটাকেই কিঞ্চিৎ ঘষামাজা করে শেষে ফক্রে বানিয়েছে। এই জামানায় প্রয়োজন মতো নামখানা টুকটাক না বদলালে বুঝি আর চলছে না। নাম যার হারান, ইংরেজি কায়দায় সে হয়ে যাচ্ছে হ্যারি, মদনা হচ্ছে ম্যাডোনা আর সখিনার ডাকনাম এখন সাক্সেনা হিসেবে বেশ করে খাচ্ছে। ভাবখানা এই, ফেসবুকের ওয়াল আমার। তাই আমার বুকে যা কিছু তাই সাঁটবো তাতে কার বাপের কী!
ফক্রের পেছনে দারুণ একখানা কাহিনি আছে। বুঝতেই পারছেন, মানুষ এখন নিজে নিজেই ঢোলক বাজাতে বিশেষ ওস্তাদ। কিছু একটা করে ফেললেই তা অমনি ফেসবুকে লটকাতে হবে। নইলে পাবলিক জানবে কী করে! লাইক-কমেন্ট তো খুব দরকার এখন, তাই না! যার যত লাইক, সে তত ‘ছেলেব্রেটি’। পশ্চাদ্দেশে ফোঁড়া, বা নাকের মধ্যে পলিপ- তাও নাকি ফেসবুকে খবর হয়! ঘরে চোর ঢুকে মাল হাতানো বাদ দিয়ে কারো বউয়ের সাথে সেই চোর রোম্যান্টিকতার ফাঁদে পড়েছে, তাও ফেসবুকে দিতে হবে। সোনাদানা নিয়ে কাজের মেয়ে পালিয়েছে, তাও ফেসবুকের আইটেম।
ভদ্রমহিলা ছবি পোস্ট করেছেন ভালো কথা। কিন্তু ফক্রে! এটা আবার কী! অবোধ বাঙালি প্রশ্ন তুলতেই পারেন। সত্যি বলতে, আমি নিজেই ধন্ধে ছিলাম কিছুক্ষণ। পরে মনে হলো আরে তাই তো! ছবি তোলা বলে কথা। ছবি মানে ফুডো, মানে ফটো। আর যে বা যিনি এই রাজকার্যটি করেছেন, তার তো একটা কৃতিত্ব আছে, নাকি! ছবি তোলার কৃতিত্ব মানে ফটো ক্রেডিট। সংক্ষেপে ফক্রে। শর্টকাট মারার টাইম এখন। ঘুরপথে কে যাবে বলুন! তাই তো আজকালকার মা-বাবারা কষ্ট করে পোলাপান না পড়িয়ে স্রেফ কোয়েশ্চেনের খোঁজ করে। যাকে বলে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। অকশনে প্রশ্ন পেলেও তারা কিনবে। রাতের অন্ধকারে হায়েনার মতোন হন্যে হয়ে ওরা খোঁজেÑ কোথায় পাওয়া যাবে সেই দুর্লভ প্রশ্নপত্র! চুপিচুপি একাই পেতে হবে। সবাই পেয়ে গেলে তো আর তা দুর্লভ থাকলো না। দিব্যি সুলভ হয়ে গেল। তখন প্রশ্নপত্র পেলেই কি, আর না পেলেই কি! তবে সেই ভদ্রমহিলার একটা কাজ কিন্তু আমার বেশ লেগেছে। তিনি আর যাই হোক, অকৃতজ্ঞ নন। ছবি পোস্ট দিয়ে জামাইকেও খানিক প্রশংসার ভাগ দিয়েছেন। মানে তাকে ‘ফক্রে’ বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই আক্রার বাজারে ‘ফক্রে’টুকুই বা কম কিসের!
ছবির বহর যে খুব একটা দৃষ্টিনন্দন হয়েছিল, তা অবশ্যি নয়। ছবি ভালো হতে গেলে অবজেক্ট ভালো থাকা চাই। স্রেফ খড়িমাটি আর রঙচঙ মেখে কি আর ক্যামেরার চোখে ধুলো দেয়া যায়! আমি তো ছোটো ভাইলোগদের প্রায়শ বলি, ভাইসব, ভুলেও চীনে রেস্তোরাঁয় বসে বা সন্ধ্যের আবছায়ায় কনে দেখতে যাবে না। ওই যে বলে না ‘কনে দেখা আলো’। কবি-সাহিত্যিকরা বেশ ভালোই জানেন কখন মেয়েকে দেখালে টুকটাক ত্রুটি-বিচ্যুতি আঁধারের চাদরে ঢেকে দেয়া যায়! চারিচক্ষুতে মিলন হবে, সেই ফাঁকে হৃদয়ের জানালা দিয়ে টুক করে ঢুকে পড়বে রসঘন প্রেম। আর এ কথা কে না জানে, হৃদয়ের চোখ বড় সরেস। চট করে দোষ ধরে না। যেখানে মজে মন, কি’বা হাঁড়ি কি’বা ডোম! কবি জীবনানন্দ অবশ্য সেখানে ‘পাখির বাসা’ খুঁজে পেয়েছেন। ভদ্রলোকের চোখ আছে মাইরি! ফক্রে জামাইকে আমিও খানিক ক্রেডিট দিতে চাই এই কারণে যে, আজকের এই করপোরেট লাইফের ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়েও গৃহকোণে যিনি আছেন সেই রমণীটিকে তিনি ভুলে যাননি। হোক না, নারী দিবসের বিধিবদ্ধ ক্লিক, তাও তো কিছুটা সময় তিনি বের করেছেন! এখন তো পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ছেলেরা ক্রমশ সিঙ্গেল লাইফে বিশ^াসী হয়ে উঠেছে। বিয়ে করার তার টাইম নেই বা গ্রহের ফেরে একা থেকে দোকা হলেও বাচ্চা নিতে বড়ই অনাগ্রহী। বাবু এলে তাকে পুষবে কে! জামাই-বউ দুজনই চাকুরে। হাউজ-মেড বাচ্চা পুষলে সে তো সঠিক শিক্ষা পাবে না। তাই কানামামার চেয়ে বরং নাই-মামাই ভালো! দিবস-রজনী অফিসেই কেটে যায় দুরন্ত সময়। ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে দুজনে নিরিবিলি বসে একটুখানি নিভৃত আলাপনÑ না না, একদম সময় নাই। এসব আদিখ্যেতা দেখানোর ফুরসত কই! ঝাঁঝিয়ে ওঠেন গিন্নি আমার! করিডোরে রোগীরা অপেক্ষা করছে। তোমার ওই কুসুমগরম প্রেম বড়, নাকি লোকের রোগ সারানো! ব্যস, অমনি চুপসে যায় ফক্রে জামাই। যাপিতজীবনে সুখেরও কোনো নিশানা নেই। কিসে যে সুখ, তাই বা কে জানে! আদৌ ও বস্তু আছে কি!
সত্যি, বেচারা ফক্রে জামাইকে বাগে পেলে জানতে চাইতাম, বলো না ভাই, ফেসবুকে সুখ আছে কি! নাকি এও স্রেফ লোক দেখানো! একসাথে ব্ল্যাক সোয়ানের মতো যুথবদ্ধ ছবি না দিলে জাত যায় যে! পাড়া-পড়শি ভাববে, তোমরা বিচ্ছেদপার্টির এন্তেজাম করছো! দুটিতে মোটে ভাবভালোবাসা নাই। তাই তোমাদের একসাথে দেখা যায় না। বাস্তবে তো নয়ই, ফেবুতেও না। তাই তো ভাবি, ভাবী হঠাৎ ফক্রে জামাইকে দিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছেন কেন! এই তাহলে আসল রহস্য! মানুষজনের চোখে ধুলো দেয়া! ভাবী তুমি পারোও বটে। তোমাকে হাজার সালাম! ফক্রেকেও।
লেখক : কথাসাহিত্যিক