খেলা

মুশফিকুর রহীম বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী ক্রিকেটারের নাম

ক্রীড়া প্রতিবেদক
নিদাহাস ট্রফিতে মুশফিকুর রহীম ১৪ মার্চের টি-টুয়েন্টি ম্যাচেও খেলেছেন অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস। কিন্তু আগের ম্যাচের মতো পাশে পাননি তামিম ইকবাল-লিটন দাসদের। শ্রীলংকার বিপক্ষে আগের ম্যাচেও ১১ মার্চ মুশফিক করেছিলেন ঠিক ৭২ রান। বাংলাদেশ অধিনায়ক মাহমুদও মানলেন, এমন উইকেটে ১৭৭ রান তাড়া করার সামর্থ্য থাকলেও আগের ম্যাচের মতো মুশফিককে কেউ সহায়তা করেনি। সাব্বির, সৌম্য এমনকি তিনি নিজেও যদি মুশফিককে সঙ্গ দিতে পারতেন তাহলে শ্রীলংকার বিপক্ষে ২১৪ রান তাড়া করে যে জয় এনে দিয়েছিলেন মুশফিক, ভারতের বিপক্ষেও তেমন একটি জয় এনে দিতে পারতেন তিনি। তবে ১৬ মার্চ শ্রীলংকার বিপক্ষে জয়ের কৃতিত্ব দেখান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ১৮ বলে অপরাজিত ৪৩ রান করে বাংলাদেশকে নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে নিয়ে যান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। মাহমুদুল্লাহকে যোগ্য সঙ্গ দেন মুশফিকুর রহীম।
দুই ম্যাচে জোড়া অপরাজিত ৭২ রানের পর প্রশংসায় ভাসছেন মুশফিকুর রহীম। রেকর্ড ২১৪ রান তাড়া করে ম্যাচ জেতায় বন্দনায় ভাসছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। নিদাহাস টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অসাধারণ জয়ের পর এখন ক্রিকেটপ্রেমীরা মনের অর্গল খুলে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন গোটা দলকে। এরই মধ্যে আবার তারা ঝড় তুলছেন আড্ডার টেবিলে বসে, কাটাছেঁড়া করছেন মুশফিকের ইনিংসটি বাংলাদেশের সেরা ব্যক্তিগত কিংবা রেকর্ড গড়ে জয়টি কি নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা জয় কি না?
১৯৮৬ সাল থেকে নিয়মিত ওয়ানডে খেলছে বাংলাদেশ। টেস্ট খেলছে ২০০০ সাল এবং টি-টুয়েন্টি খেলছে ২০০৬ সাল থেকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দীর্ঘ পথ চলায় বহু ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়, গত বছর কলম্বোয় শ্রীলংকায় নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে ১০০ নম্বর টেস্টে জয়-বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা অর্জনগুলোরও অন্যতম। আবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়গুলোও কিন্তু ইতিহাসের সেরা অর্জন। তবে ২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে নটিংহামশ্যায়ারে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫ উইকেটের জয়টি এখন পর্যন্ত ক্রিকেটপ্রেমীদের বিচারে সেরা জয়। রিকি পন্টিং, ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, গিলক্রিস্টদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার ২৪৯ রান টপকে গিয়েছিল বাংলাদেশ মোহাম্মদ আশরাফুলের অবিশ্বাস্য ইনিংসে। ১০০ রানের অতিমানবীয় ইনিংস খেলেছিলেন বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ওই ইনিংসটিকে বলা হয় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরাদের সেরা ইনিংস। ১১ মার্চ মুশফিকের ৩৫ বলে ৭২ রানের ইনিংসটি এখন আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আশরাফুলের সেঞ্চুরিকে। টাইগারদের বছর শুরু হয়েছিল দারুণ জয়ে। কিন্তু শুরুর সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি। হয়ে পড়ে ছন্নছাড়া। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া টাইগাররা মরণ কামড় দেয় স্বাগতিক শ্রীলংকাকে। গত বছর প্রেমাদাসায় দুই দলের সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি ম্যাচে জিতেছিল বাংলাদেশ। ওই আত্মবিশ্বাস নিয়ে ১১ মার্চ খেলতে নামেন টাইগাররা। স্বাগতিকদের ২১৪ রানের পর্বতসমান স্কোর টপকে যায় ২ বল হাতে রেখে। অবিশ্বাস্য কাজটি করেন সাবেক অধিনায়ক মুশফিক। বল প্রতি ২ রানের স্ট্রাইকের চাপ কাঁধে নিয়ে ব্যাটিং করেন সবার প্রিয় মুশফিক। তার ৩৫ বলে ৭২ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংসটিকে ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন, দেশের সেরা ইনিংস। ম্যাচ শেষে তামিম ইকবালও স্বীকৃতি দিয়েছেন ম্যাচ সেরা বলে। সত্যিই কি তাই?
১৯৯৮ সালে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি করেন মেহরাব হোসেন অপি। যদিও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ওই এক সেঞ্চুরিতেই ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়েছেন অপি। বুলাওয়েতে তামিম ইকবালের ১৫৪ রানের অতিমানবীয় ইনিংসটি কি স্মৃতি হয়ে যাবে? বাঁ হাতি ওপেনারের ওই বিধ্বংসী ইনিংসেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো তিনশোর্ধ্ব রান টপকে ছিল ওয়ানডেতে। জিম্বাবুয়ের ৩১২ রান টপকাতে তামিম খেলেছিলেন ১৩৮ বলে ৬ ছক্কা ও ৭ চারে সাজানো ১৫৪ রানের ইনিংস। ওই ম্যাচেই জিম্বাবুয়ের ক্রিস কভেন্ট্রি খেলেছিলেন ১৯৪ রানের বিধ্বংসী ইনিংস।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অনেকগুলো সেরা ইনিংস রয়েছে। অভিষেক টেস্টে ১৪৫ রানের ইনিংস খেলে ইতিহাস হয়ে গেছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। মুরালিধরন, চামিন্দা ভাসদের বিপক্ষে আশরাফুলের ১১৬ রানের ইনিংসটি আবার চিরস্থায়ী ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেছে। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরির রেকর্ড আশরাফুলের। বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মুশফিক। কলম্বোয় ২০০ রানের ইনিংস খেলে ইতিহাস হয়ে গেছেন মুশফিক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাকিব আল হাসানের ২১৭ রানের ইনিংসটিও গুণে, মানে ও বিচারে অতুলনীয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বহু ইনিংস আছে, যেগুলো নিয়ে হাজার বছর আলোচনায় ব্যস্ত থাকবেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে মুশফিকের ৩৫ বলে ৭২ রানের ইনিংসটি অতুলনীয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের সেরাগুলোর অন্যতম। টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে আশরাফুলের ২৭ বলে ৬১ রানের ইনিংসটিও কিন্তু অসাধারণ। ২০০৭ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৬৪ রান টপকে যায় আশরাফুলের টর্নেডো ইনিংসে। ২৭ বলের বিধ্বংসী ইনিংসে ছিল ৩টি ছক্কা ও ৭টি চার। ওই ম্যাচে আফতাবও খেলেছিলেন ৪৯ বলে ৬২ রানের ইনিংস।
৩২ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ। এই সময়ে বহু ম্যাচ জিতেছে এবং বহু ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছেন ক্রিকেটাররা। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে মুশফিকের ইনিংসটিকেই ক্রিকেটাররা মেনে নিয়েছেন সেরা বলে। এই ইনিংসটি যখন মুশফিক খেলেন, তখন তিনি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ছিলেন প্রচ- চাপের মুখে। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি অধিনায়কত্ব থেকে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। হারিয়েছেন উইকেট কিপিংয়ের দায়িত্বও। দলে যখন টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়ছিল, তখনই মুশফিক খেললেন এই অতি দানবীয় ইনিংস। একের পর এক এসব দুর্দান্ত ইনিংসের কারণে ক্রমেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী ক্রিকেটার হয়ে উঠছেন মুশফিকুর রহীম।