প্রতিবেদন

যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতির পিতার ৯৯তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উদযাপিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিবসে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃপ্ত শপথ নিয়েছে পুরো জাতি। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীনতার মহান এ স্থপতি। তিনি বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়িয়ে বাঙালির কাছে পৌঁছে দেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার মন্ত্র। সে মন্ত্রে বলীয়ান হয়ে স্বাধীন দেশে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি আজ বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশে। তাই প্রতি বছর সমগ্র জাতি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনকে ‘শিশু দিবস’ হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ ও পালন করে।
১৭ মার্চ দিনভর জাতির পিতার প্রতিকৃতি ও মাজারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন, শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রন্থমেলা, কেক কাটা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিনামূল্যে চিকিৎসা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনসহ সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস।
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে ১৭ মার্চ ভোর থেকে রাত অবধি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন এবং টুঙ্গিপাড়ায় মাজারে নেমেছিল শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষের ঢল। দিবসটি উপলক্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের পাশাপাশি রাজধানীসহ সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শের ওপর আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধুর ওপর তৈরি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এবং মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ভোর সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সামরিক বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। সেখানে তিনি কিছু সময় অতিবাহিত করেন। সকাল ১০টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যান। সেখানে প্রথমে রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রয়াত বঙ্গবন্ধুকে সশস্ত্র সালাম জানায়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। পরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুরা ফাতেহা পাঠ শেষে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভার সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর মাজার প্রাঙ্গণে রাখা পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর সেখানে শিশু সমাবেশ, আলোচনা সভা, গ্রন্থমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা শিশু একাডেমির উদ্যোগে দেশব্যাপী সকল জেলা ও উপজেলা সদরে শিশু সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ সকল গণমাধ্যম বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর এবং গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের আয়োজনে জেলা ও উপজেলা সদরে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সপ্তাহব্যাপী পুস্তক ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে দিবসটি যথাযথভাবে উদযাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেক কেটে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নাধীন মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক, বয়স্ক ও সহজ কোরআন শিক্ষার মোট ৫৯ হাজার ৯৬৮টি কেন্দ্রে এবং ইসলামিক মিশনের আওতায় ১৯টি এবতেদায়ি মাদ্রাসা ও ৩৯৫টি মক্তবসহ সারাদেশে ৬০ হাজার ৩৮২ স্থানে সকাল ৯টায় কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এক বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়। প্রার্থনা সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
এদিকে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উদযাপিত হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিলÑ সকালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সংগীতানুষ্ঠান প্রভৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদসহ আবাসিক হল, হোস্টেল, মসজিদ ও উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীর পান্থপথে স্টার সিনেপ্লেক্সে বিনামূল্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ত্রিমাত্রিক ভিডিও চিত্র ‘পিতা’র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত দেড় হাজার শিশু-কিশোরসহ আগ্রহীরা বিনামূল্যে এ প্রদর্শনী উপভোগ করেন।
১৭ মার্চ সারাদিন ধরেই দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ড বাজানো হয়। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও কলাম।