প্রতিবেদন

রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে মাসের মাঝামাঝিতে পালিত হবে পবিত্র মাহে রমজান। সে হিসেবে রমজান আসতে এখনো টানা ২ মাস বাকি। রমজানে কিছু ভোগ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক কারণে বেড়ে যায়। এসব ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। আমদানিকৃত দেশ থেকে ভোগ্যপণ্যটি ভোক্তার হাতে পৌঁছতে কমপক্ষে ২ মাস সময় লাগে। ফলে মে’তে পালিত হওয়া রমজানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে মার্চ থেকেই। এরই অংশ হিসেবে চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, ভোজ্যতেল এবং খেজুরের মতো ৫টি ভোগ্যপণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটরিং, টিসিবির ভোগ্যপণ্য বিক্রি, খোলা বাজারে (ওএমএস) বিক্রি কার্যক্রম শুরুসহ আরও বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, রমজানে যাতে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হবে। এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ভেজালমুক্ত খাবার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাদের তৎপরতা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। চাল, পিঁয়াজসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম যাতে আর না বাড়ে সেজন্য নতুন বাজেটে এসব পণ্য আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের ঘোষণাসহ উৎপাদনে প্রণোদনার ঘোষণাও দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো রকম বিতর্কে জড়াতে চাচ্ছে না সরকার। ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া রমজান সামনে রেখে পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী যাতে গড়ে না উঠতে পারে সেজন্য এখন থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তৎপর হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক, মজুদকারী, সরবরাহকারী, পাইকার এবং খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দিকেও এবার নজর রাখা হবে। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে দ্রব্যমূল্য আমদানি, দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সকল পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন বলে জানা গেছে। জানা গেছে, রমজান সামনে রেখে এবার দেশে ছোলা, মসুর, মটর ডাল এবং চিনি ও ভোজ্যতেলের আমদানি ও সরবরাহ বেড়েছে। রাজধানী ঢাকার প্রধান পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজার এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম দামে। কিন্তু খুচরা বাজারে এসব পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরা বাজারের দায়ভার তাদের নয়। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে মিলমালিক এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের দিকে নজর বাড়াতে হবে। বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে কোনো পণ্যের দাম বাড়বে না। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম কম, তাই দেশেও বাড়ার আশঙ্কা নেই। এ জন্য মিলমালিকরা যাতে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখেন সেদিকটায় খেয়াল রাখা জরুরি।
এ দিকে, ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে গত কয়েক বছর আগে ১৭ পণ্যকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পণ্যগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও গত এক বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারণ ছাড়াই খুচরা বাজারে ইতোমধ্যে কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রসুন, চিনি, ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদ, রসুন, তেজপাতা ও লবণ। যদিও আমদানি পরিস্থিতি গতবারের চেয়ে বেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যমূল্য নিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করা গেলে ভোগ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে আসন্ন রমজানে।
তাছাড়া রমজান মাসকে সামনে রেখে সারাদেশে ১৭৪-১৮০ পয়েন্টে টিসিবি ট্রাক বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেখানে চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, সয়াবিন তেল ও খেজুর সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে। রাজধানী ঢাকার ২৫-৩০ পয়েন্টে, চট্টগ্রামের ১০টি, অন্য বিভাগীয় শহরে ৫টি করে ট্রাক বসবে। এ ছাড়া জেলা শহরে ২টি করে মোট ১৭৪-১৮০ স্থানে অস্থায়ীভাবে ট্রাক বসিয়ে স্থানীয় বাজারের তুলনায় কিছুটা কম দামে ৫টি পণ্য বিক্রি করা হবে। রমজান উপলক্ষে ৫০০ মেট্রিক টন সয়াবিন তেল, ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ছোলা খোলা বাজারে ছাড়া হবে বলে টিসিবির পক্ষ থেকে জানা গেছে।
প্রতি বছর রমজানের মাস চারেক আগে থেকে ছোলা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল ইত্যাদির আমদানি শুরু হয় বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য। কাস্টম হাউজের পরিসংখ্যান শাখার এক তথ্যে দেখা যায়, রমজান মাস সামনে রেখে গত জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আবশ্যকীয় সব পণ্যের আমদানি বেড়েছে। এ ছাড়া ছোলা খেজুরসহ রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এমন প্রয়োজনীয় সব পণ্য আমদানি হয়েছে প্রচুর। ভোজ্যতেলও আমদানি হয়েছে। গত বছর রমজানের পূর্বে যেমন আমদানি হয়েছিল এবারও হচ্ছে। এস আলম গ্র“প, টিকে গ্র“প, বিএসএম গ্র“প, সিটি গ্র“প, আবুল খায়ের গ্র“প, আবদুল মোনেমসহ বিভিন্ন গ্র“প রমজানের বাজার ধরতে অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রমজানে কোনো পণ্যের সংকট হবে না, পণ্যভেদে এবার আমদানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। দেশে রোজার মাসে ৭০ হাজার টন ছোলার চাহিদা থাকে বলে মনে করা হয়। রোজার মাসে শুধু শরবতে ব্যবহারের জন্য চিনির চাহিদা বাড়ে ১ লাখ টন। এ ছাড়া ওই সময়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে চিনির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পণ্যটির দাম বাড়ে। সরকারি পর্যায়ে দাম কমলে বেসরকারি চিনিরও দাম কমবে।
এ দিকে, বিদেশ থেকে আমদানি করা মসুর ডালের দাম এখন সবচেয়ে কম। এত কম দামে মসুর ডাল এর আগে বেচাকেনা হয়নি। পাইকারি বাজারে দাম কমায় এখন খুচরা বাজারেও কেজিপ্রতি ৬০-৬৫ টাকা দামে মোটা মসুর ডাল পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে যখন প্রায় সব পণ্যের চড়া দাম, সেখানে মসুর ডাল ভোক্তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।