কলাম

সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ

শাহাবউদ্দিন মাহমুদ
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া বাংলাদেশ, জন্মের পর ৪৭ বছরে পদার্পণ করা রাষ্ট্রটি অনেকটা অপরিপূর্ণ। এ বয়সেই নানামুখী সমস্যা-সংকটে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রকে। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে জাতির অনেক আশা এখনও পূর্ণ হয়নি। তবে অর্জনও কম নয়। নানা রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে হতোদ্যম না হয়ে জাতি তার অন্তর্নিহিত সাহস ও শক্তিতে এগিয়ে গেছে বহুদূর। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উক্তি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বাংলাদেশ আজ তার স্বমহিমায় এতটাই এগিয়ে গেছে যে, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বিনিয়োগ সম্পর্ক স্থাপনের নিরন্তর প্রস্তাব আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার খাতায় বাংলাদেশের নাম এখন অনেক ওপরে।

মধ্যম আয়ের দেশের
শর্ত পূরণ
বিশ্বব্যাংকের মাপকাঠিতে এরই মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি এটি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন ও মাইলফলক। সরকারের ১০ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টার কথা বলা আছে। এর আগেই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য খাতে সাফল্য
সরকারের ৯ বছরে একগুচ্ছ সাফল্য স্বাস্থ্য খাতকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সাড়ে ৯ হাজার নার্স নিয়োগ, মন্ত্রিসভায় নতুন ওষুধনীতির খসড়া অনুমোদন, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপন, হেলথ কার্ড বিতরণ, ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, মডেল ফার্মেসির যাত্রা, ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল, শিশুমৃত্যু হ্রাস, জিকা ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। জাতীয় ওষুধনীতি অনুমোদন ও জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন, খাদ্যে ভেজাল নিরূপণের জন্য ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি স্থাপন, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন্স অ্যান্ড ইম্যুনাইজেশন (এঅঠও) শ্রেষ্ঠ অ্যাওয়ার্ড লাভ ইত্যাদি স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার বিষয়ে সরকারের যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে অনেকাংশে।

বিদ্যুৎ খাতে সাফল্য
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বিদ্যুৎ খাতে ৯ বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ এ খাতের সার্বিক ও সুষম উন্নয়নে তাৎক্ষণিক, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল, কয়লা, ডুয়েল ফুয়েল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিউক্লিয়ার এনার্জিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার হতে বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ গ্রহণের ফলে বর্তমানে সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ৯০ শতাংশ এবং সর্বমোট গ্রাহক ৩ কোটির ওপরে।

সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার অর্থনৈতিক অঞ্চল
সরকারি ও বেসরকারি খাতে দেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৭৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। নতুন করে ৯টি যোগ হলে স্থান নির্বাচন হওয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮৮ টিতে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০-এর ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা করে সরকার। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সম্প্রতি ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এগুলো প্রতিষ্ঠা হলে এর মধ্যে শিল্প স্থাপন হবে। এতে ১ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৃদ্ধি পাবে আয়। এতে বাড়বে জীবনযাত্রার মান। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকেরও উন্নয়ন হবে, যা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

যোগাযোগ খাতে সাফল্য
গত নয় বছরে দেশের যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রতিবন্ধকতাহীন ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকা-ের ফলে বর্তমান সরকারের ৯ বছরে দেশের রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্প। পদ্মাসেতু আজ স্বপ্ন নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে টানেল, যা চট্টগ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ, উত্তরা থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফেনীতে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প গ্রহণ, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ, মেট্রোরেলের কাজ শুরু করাসহ অনেকগুলো উন্নয়ন কাজ এ যাবৎকালে সরকারের বড় সাফল্য।

শিক্ষা খাতে সরকারের অর্জন
প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ শিক্ষাখাতে বিরাজমান অস্থিরতা সত্ত্বেও শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্যে অন্যতম হলোÑ ১. জানুয়ারি শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তির ব্যবস্থা। সারাদেশের ৩১ হাজার বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১ শতাংশ। বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা ৯৭ ভাগে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অর্জন
ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা নিয়ে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু ২০০৯ সাল থেকে। বিগত ৯ বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২৫ হাজার ওয়েবসাইট নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েবপোর্টাল চালু করা হয়েছে। এভাবেই প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য ও সেবা পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। বিশেষজ্ঞরা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এই অবিস্মরণীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে আখ্যায়িত করছেন ডিজিটাল রেনেসাঁ বা ডিজিটাল নবজাগরণ হিসেবে। সেই রকম আরও উল্লেখযোগ্য সেবা কার্যক্রম হলো মোবাইল ব্যাংকিং বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন এবং অনলাইন ব্যাংকিং। বিশ্বায়নের সব সুবিধা গ্রহণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে। এতে করে ২০২১ সালের অনেক আগেই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তি
শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনয়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ছবিযুক্ত পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করে ওই ডাটাবেজের বহুমাত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনয়ন, অনলাইনে ভর্তি আবেদন, শিক্ষার্থীদের স্বয়ংক্রিয় প্রবেশপত্র, প্রশংসাপত্র, ডিজিটাল আইডি কার্ড, ছাড়পত্র প্রিন্ট, প্রতিষ্ঠানের সব অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল তৈরি ও অনলাইনে ডাউনলোড, পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, গ্রেডিং সিস্টেমে ফলাফল প্রকাশ, পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের স্বয়ংক্রিয় প্রশংসাপত্র, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বায়োমেট্টিক অনলাইন হাজিরা ব্যবস্থাপনা, উপস্থিত-অনুপস্থিতির এসএমএস, শিক্ষার্থীদের পেমেন্ট নিশ্চিত করার জন্য এসএমএস, শিক্ষক-কর্মচারীদের ছুটি ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের স্বয়ংক্রিয় হিসাব ব্যবস্থাপনা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি প্রদান ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরার সাহায্যে অনলাইন নজরদারি, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এসএমএস নোটিফিকেশন প্রেরণ। সরকারের আইসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান (২০১২-২০২১) ও ই-লার্নিং কার্যক্রমের আওতায় ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কার্যক্রম এগুচ্ছে দ্রুত গতিতে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি
মেক্সিকোর কানকুনে ‘গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন-২০১৭’ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। সম্মেলনে দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতিরও প্রশংসা করেছেন বিশ্ব নেতারা। দুর্যোগে উপকূলবাসীর আশ্রয়ের জন্য অসংখ্য সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডর, রোয়ানুর বিষয়ে সতর্ক করে দেয়ার পরও শুধু অসচেতনতায় কিছু প্রাণহানি ঘটেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বড় মাপের ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা এখন আগের চেয়ে বেশি। আর এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী ধনী রাষ্ট্রগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ। ধনী রাষ্ট্রগুলোকে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ
দিন বদলের ৯ বছরে নতুন নতুন কূপ খননসহ গ্যাস সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান সরকারের আমলে ভোলা, সুন্দলপুর, শ্রীকাইল ও রূপগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড সম্প্রসারণ এবং বিবিয়ানা-ধনুয়া গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। হবিগঞ্জের মুচাই এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে কম্প্রেসার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। গ্যাস নেটওয়ার্ক রাজশাহীতে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্র এলাকায় গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান এবং উৎপাদন কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পে সাফল্য
বাংলাদেশ মূলত কৃষিপ্রধান দেশ হলেও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। আর এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। এ শিল্পের হাত ধরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে পেয়েছে নতুন পরিচিতি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এই খাত। ১৯৮১-৮২ সালে মোট রপ্তানি আয়ে এই খাতের অবদান ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ১ হাজার ১৯৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ে চেয়ে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছর ৩ হাজার ১৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এদিকে মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশ পোশাক খাত থেকে এসেছে। সত্তর দশকে রোপিত তৈরি পোশাক শিল্প নামের ছোট্ট চারাগাছটি আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মহীরুহ। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮২ থেকে ৮৫ শতাংশ এই খাত থেকে আসে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত ইউরোপ, আমেরিকার বাজার জয় করে এখন রাশিয়ার দিকে ধাবমান। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো উদ্যোক্তা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তার অবস্থান অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে এই খাতের অগ্রযাত্রা আমাদের মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত বাংলাদেশে পরিণত করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।

পর্যটন খাতে সাফল্য
সরকারের ৯ বছরে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের পর পর্যটন খাত রাজস্ব আদায়ের বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১৬-২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে দেশি-বিদেশি সব ধরনের পর্যটক রয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। তিন পার্বত্য জেলা ও সিলেট অঞ্চলজুড়ে রয়েছে প্রকৃতির লীলাভূমি। পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত সমৃদ্ধ কক্সবাজার। এছাড়া বেশকিছু ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনও আছে, যা পর্যটকদের মনে আগ্রহ জাগাতে পারে। দিনে দিনে বাংলাদেশে পর্যটনে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে ৮টি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে । ২০১৬-২০১৮ পর্যন্ত ৩ বছরকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করে নানা উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে গত ৯ বছরে ৬ হাজার ৬৯৯ দশমিক ১৬ কোটি টাকা পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাত জিডিপিতে ২ দশমিক ১ শতাংশ অবদান রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পর্যটকদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করায় এ খাতে প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এ খাতে বর্তমান সময়ে উড়াল দেয়ার জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ। আর বর্তমান সরকারের শাসনামলে এটি একটি অন্যতম সাফল্য। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের চেহারাই অনেকটা বদলে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ
প্রভাব মোকাবিলায় সাফল্য
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার পরও নিজস্ব অর্থায়নে ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে গোটা বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের কোনো দেশের নিজস্ব তহবিলে এ ধরনের ফান্ড গঠনের কোনো নজির নেই। এ পর্যন্ত এই ট্রাস্ট ফান্ডকে সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেয়া ৩ হাজার কোটি টাকায় গ্রহণ করা হয়েছে ৩৬৮টি প্রকল্প। পাশাপাশি বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটিও বিশ্বে প্রথম। প্রণয়ন করা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইনসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা। আর এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া হয়েছে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে জলমগ্নতা ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, অনিয়মিত ও অতি বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদীতীরের ভাঙন, খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূমিধস এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশ থেকে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের এই সাফল্য উন্নত বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয় ও
ছিটমহল বিনিময়
কোনো রকম বৈরিতা ছাড়াই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মহীসোপান নিয়ে জাতিসংঘে চলমান মামলায়ও ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে জয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সাল নাগাদ এ মামলার রায় হতে পারে। ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশ যাতে শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতায় না ভোগে, সে জন্য দেশটির সঙ্গে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই এবং এর নবায়ন বাংলাদেশের বড় সফলতা। এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে স্থলসীমান্ত চুক্তি হয়েছিল সম্প্রতি তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা শেখ হাসিনার সরকারের বড় অর্জন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা
অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও বড় জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত সশস্ত্র পাহাড়িদের সঙ্গে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমছে। সেখানে শিক্ষার বিস্তার এবং জীবনমানের পরিবর্তন ঘটছে।
শেখ হাসিনার সরকার বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘুরে দাঁড়ানো খেটে খাওয়া মানুষের লড়াকু নেত্রী-মমতাময়ী শেখ হাসিনা। নিজভূমে আশ্রয় প্রত্যাশী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তায় বিশ্বজনমত গঠনের মতো মহান কিন্তু কঠিন সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
লেখক : গবেষক
ংঁসধযসঁফ৭৮@মসধরষ.পড়স