প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সিঙ্গাপুর সফরকালে লি সেইন লুং-শেখ হাসিনা ঐকমত্য উন্নয়ন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর একযোগে কাজ করবে

এম নিজাম উদ্দিন
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরকে যুক্ত করার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ দিনের সরকারি সফরে ১১ মার্চ সিঙ্গাপুর পৌঁছান। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুংয়ের আমন্ত্রণে শেখ হাসিনা দেশটি সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গাপুর সফরের মাঝপথে ১২ মার্চ নেপালে অবতরণের সময় বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানির মালিকানাধীন ইউএস-বাংলার একটি বিমান বিধ্বস্ত হলে ২৬ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৫১ জন নিহত হন। আহত হন ২০ জন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিঙ্গাপুরে থেকেই বিষয়টি নিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং হতাহতদের বিষয়ে বাংলাদেশ নেপালকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবে বলে আশ্বাস দেন। সিঙ্গাপুর সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর ১৫ মে দেশে ফেরার কথা থাকলেও মর্মন্তুদ এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফর সংক্ষিপ্ত করে ১৪ মার্চ দেশে ফিরে আসেন।
সিঙ্গাপুর সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ মার্চ সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে উন্নয়ন অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর একযোগে কাজ করবে বলে দুই নেতা ঐকমত্যে পৌঁছান। বৈঠকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদারের লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়াদি আলোচনা হয়। দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে ৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো হলোÑ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজের (আইই) মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়িক সংগঠন সিঙ্গাপুর ম্যান্যুফ্যাকচারিং ফেডারেশনের মধ্যে পৃথক দু’টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক, পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব বিষয়ক সমঝোতা স্মারক, এয়ার সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত কনফিডেন্সিয়াল সমঝোতা স্মারক, ডিজিটাল লিডারশিপ, ডিজিটাল ইনোভেশন ও ডিজিটাল সরকারে রূপান্তর সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক।

শেখ হাসিনার সফরকে
সম্পর্ক জোরদারের চমৎকার
সুযোগ বললেন লি সেইন লুং
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিঙ্গাপুর সফর দুই দেশের মধ্যে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক জোরদার করার একটি চমৎকার সুযোগ। ইস্তানায় অবস্থিত সিঙ্গাপুর প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে দেয়া এক মধ্যাহ্নভোজে লি সেইন লুং একথা বলেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের বিকাশমান বাজারে জ্বালানি এবং বন্দর খাতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ব্যাপারে আগ্রহ রয়েছে। এ সময় লি আরো জানান, সিঙ্গাপুরের অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সেম্বকর্প, যার সিঙ্গাপুরের পাওয়ার প্ল্যান্ট খাতে প্রায় ১১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ রয়েছে এবং সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটিস (পিএসএ) বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং আশিয়ান ও অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য খুবই ভালো অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত এবং শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যুক্ত। লি সেইন আশা প্রকাশ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল চুক্তি নবায়ন সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের মানুষকে আরো কাছে আনবে, ব্যবসাবাণিজ্যের পথ সুগম করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব ও বিকাশমান অংশীদারিত্ব সামনের দিনগুলোতে আরো জোরদার হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সিঙ্গাপুরের প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের কথা স্মরণ করে লি সেইন বলেন, তখন থেকেই দুই দেশের নেতা, জনগণ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্রমশ সম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি ২০০৫ সালে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান-আফ্রিকান সামিটে পার্শ্ববৈঠকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বৈঠকের কথাও স্মরণ করেন।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বন্ধনের কারণে আমাদের দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২০ সালে সিঙ্গাপুর সফর করেন এবং ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘যাত্রী’ গ্রন্থে তার প্রতিফলন ও ভ্রমণকাহিনি ফুটে ওঠে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তার সংসদীয় এলাকা ইয়ো চু কং রোডে প্রখ্যাত বাঙালি কবির সম্মানে ‘টেগোর এভিনিউ’ নামকরণ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করা অব্যাহত রেখেছে।
‘আমরা আজ দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাহিত্য বিনিময় করতে দেখি’ উল্লেখ করে লি সেইন বলেন, ২০১৫ সালে সিঙ্গাপুরের ‘ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বাংলার কণ্ঠ-এর সঙ্গে যৌথভাবে ৬টি কবিতা সমন্বয়ে’ এন ইভেনিং অব মাইগ্রেন্ট পয়েট্রি অ্যান্ড মিউজিক-পয়েমস অব মাইগ্রেশন : জয়স অ্যান্ড সরোস’ শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করে। লি সেইন মনে করেন, ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ স্থাপন বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের বহুমুখী সম্পর্ককে আরো জোরদার করতে পারে।’

বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার
হতে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের
প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শরিক হতে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিজস্ব শিল্প পার্ক গড়ে তোলার জন্য সরকার তাদের ৫০০ একর বা তারো বেশি জমি বরাদ্দে প্রস্তুত রয়েছে। সারাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে। আর এই সুবিধা গ্রহণ করে সেখানে শিল্প স্থাপনের জন্য সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসতে পারে।’ সিঙ্গাপুরের হোটেল সাংগ্রিলাতে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ব্যবসায়ী ফোরামের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুর, সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর যৌথভাবে ‘নতুন অধ্যায়ের পথে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী লিম হং কিয়াং অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত সিইও ক্যাথি লাই এবং সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এসএস তেও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
বাংলাদেশকে বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের ব্যবসায়ীদের জন্য আইন দ্বারা বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষা প্রদান, কর অবকাশ, যন্ত্রাংশ আমদানি করে শিল্প স্থাপনে স্বল্প শুল্ক ধার্য, যেকোনো সময় লভ্যাংশসহ শতভাগ মূলধন প্রত্যাহারের সুবিধা, রেমিট্যান্স রয়্যালিটি প্রদান, তরুণ ও কর্মদক্ষ জনশক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতার সুবিধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, জাপান এবং নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি পণ্যের কোটামুক্ত এবং শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা জাতিকে আমাদের ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১-এর মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছি। যেখানে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শেখ হাসিনা বলেন, ভর্তুকি দেয়া কৃষি খাত থেকে বাংলাদেশকে আমরা একটি আধুনিক, সহনীয় এবং বহুমুখী অর্থনীতির পথে নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জিডিপি’র চার-পঞ্চমাংশ আসে উৎপাদনশীল খাত থেকে। ২০১৭ সালে প্রাইস ওয়াটার হাউজ কুপারস এর তথ্যানুয়ায়ী, আগামী তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের তৃতীয় ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি হিসেবে উঠে আসবে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গেল অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০০৫ সালে এই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, দারিদ্র্যের হার যেখানে ২০০৫ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, তা বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর ৬ মাস হয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের খ্যাতি বিশ্বজোড়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে তৈরি পোশাক খাতে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেক্ষেত্রে পোশাক রপ্তানির শীর্ষ দেশ চীনের পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
একইসঙ্গে ওষুধ শিল্পের সমৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, স্থানীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমাদের তৈরি ওষুধ বিশ্বের ১২০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের হালকা ও মাঝারি ধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক আইটি পার্ক। ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের আইটি খাত।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে দুই দেশের ব্যবসাবাণিজ্য জোরদারের অংশ হিসেবে দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে ৪টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনে
নিজের নামে অর্কিড উন্মোচন
করলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো বিশ্ব হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেনে তাঁর নামের একটি অর্কিড উন্মোচন করেছেন। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সফরটি স্মরণীয় করে রাখতে অর্কিডটির নাম ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ রাখা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় ফুল অর্কিডের যে প্রজাতির নাম ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ রাখা হয়েছে। বোটানিক বাগানের কর্মকর্তারা ‘সানপ্লাজা পার্ক’ ও ‘সেলেটার চকোলেট’ প্রজাতির শংকরায়নের মাধ্যমে সেটি উদ্ভাবন করেন।
সিঙ্গাপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ড. নাইজেল টেইলর সি হর্ট একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা অর্কিডটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, তার স্ত্রী পেপী সিদ্দিক ও তাদের দুই সন্তান এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
নতুন অর্কিডটির শংকরায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বাগানের ব্যবস্থাপক ডেভিড লিম বলেন, ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা অর্কিডটির শংকরায়ন এবং পত্র-পল্লবে বিকশিত হতে সাড়ে ৪ বছর সময় লেগেছে। এই হাইব্রিড অর্কিড ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রতিটি গাছেই ১৫টি ফুলের থোকা ধরে। প্রতিটি প্রস্থে ৫ সেন্টিমিটার হয়। প্যাঁচানো প্রতিটি ফুলের গোড়া গাঢ় পিঙ্গল রঙের এবং ফুলের মাঝখানে হালকা বাদামি ও ধবধবে সাদা প্রান্ত থাকে।
সিঙ্গাপুরের রীতি অনুসারে ১৯৫৭ সাল থেকে দেশটিতে সফরকারী বিভিন্ন দেশের প্রায় আড়াইশো রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের নামে স্থানীয় অর্কিডের নামকরণ করা হয়েছে বলেও ডেভিড লিম জানান। তাদের সফরকে স্মরণীয় করে রাখতেই এটা করা হয়। ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ অর্কিডটি এখন থেকে গার্ডেনের ভিআইপি গ্যালারির শোকেসে শোভা পাবে। প্রধানমন্ত্রী পুরো অর্কিড বাগানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বাগানটিতে ১ হাজার প্রজাতি ও ২ হাজার শংকরায়নকৃত উদ্ভিদ রয়েছে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য
সিঙ্গাপুরে সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের
আহ্বান শেখ হাসিনার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ প্রদানে সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যাতে তাদের কাছে এই দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম পছন্দনীয় কর্মস্থল হিসেবে অব্যাহত থাকে। সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ইস্তানায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুংয়ের দেয়া এক মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করে তিনি এই আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে শ্রমিকদের জন্য সিঙ্গাপুর ক্রমশই একটি অন্যতম পছন্দীয় গন্তব্যস্থল হয়ে উঠছে। আমি আশা করি সিঙ্গাপুর এই শ্রমিকদের জন্য বরাবরের মতোই সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা অব্যাহত রাখবে।’
বাংলাদেশ এবং সিঙ্গাপুর তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্বেষায় একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে। সিঙ্গাপুরের পুঁজি, উন্নত প্রযুক্তি এবং তা ব্যবহারের দক্ষতা রয়েছে। আর আমাদের রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তি। যাদের একটি বড় অংশই বয়সে নবীন এবং শিক্ষিত, যেই দক্ষতাকে উভয়ের পারস্পরিক সুবিধার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূত্রপাতের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক একই ধরনের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর বিদ্যমান। শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্মারকগুলো দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে
মিয়ানমারকে বোঝাতে সিঙ্গাপুরের
প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী মিয়ানমারের নাগরিকদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সেদেশকে বোঝাতে সিঙ্গাপুরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোয় মিয়ানমারকে বোঝানোর জন্য তিনি আশিয়ানের সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের প্রতি এই আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেহেতু আশিয়ানের সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুর যেন মিয়ানমার সরকারকে বোঝায় যে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার মধ্যেই ওই এলাকার স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন নির্ভর করছে।’ শেখ হাসিনা সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এ কথা বলেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গারা আমাদের ওপর বোঝা হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলাপ-আলোচনা করে এদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কিন্তু নানাবিধ কারণে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে সিঙ্গাপুরের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।