প্রতিবেদন

এই সাফল্য জনগণের বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি প্রদানকে জনগণের অর্জন উল্লেখ করে এই উন্নয়ন সাফল্যকে ধরে রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই অর্জন যারা বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন তাদের সকলেরই এবং বাংলাদেশের জনগণের অর্জন। কাজেই আমি মনে করি বাংলাদেশের জনগণই হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাই। আর এই জনগণই সকল অর্জন সাধনে সক্ষম। শেখ হাসিনা এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে সকলের সহযোগিতা চান।
শেখ হাসিনা বলেন, এই জনগণের উদ্দেশেই বঙ্গবন্ধু বলে গেছেনÑ বাংলাদেশের মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। দাবায়ে যে রাখতে পারবে না সেটাই আজকে প্রমাণ হয়েছে। শেখ হাসিনা ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে তাঁকে প্রদত্ত সংবর্ধনা এবং এই উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।
অ্যাডহক ভিত্তিতে পরিকল্পনা না নিয়ে ৫ বছর মেয়াদি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করাতেই বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সরকারে থেকে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু আসল কাজ করেছে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে আমাদের পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যারা কাজ করেন তারা কিন্তু সরকারের মনোভাবটা বুঝতে পারেন। আর সেটা বুঝেই তারা কাজ করেন। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। কাজেই সরকার যখন আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে তখন তারাও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে বলেই আজকে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনীতির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমরা আর পরমুখাপেক্ষী নেই। শতকরা ৯০ ভাগ নিজেদের অর্থায়নে আমরা বাজেট করতে পারি। আর এ বাজেটের কলেবর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এই কাজগুলো সফলভাবে করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে সকল উন্নয়ন সহযোগী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর প্রতিও ধন্যবাদ জানান।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে পৃথক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুটেরেজ, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, এডিবি প্রেসিডেন্ট তাকেহিকে নাকাও, ইউএসএআইডি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মার্ক গ্রিন এবং জাইকার প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিতাওকা।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনসিটিএডি) এক রিপোর্টে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ৩টি শর্ত পূর্ণ করায় চলতি মার্চ মাসে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করবে। এই ৩টি মানদ- হচ্ছেÑ মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক, হিউম্যান অ্যাসেটস ইনডেস্ক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেস্ক (ইভিআই)।
জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বে প্রথম দেশ যে ৩টি মানদ-ই সফলভাবে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য ২০২৪ সালে জাতিসংঘের ঘোষণা পর্যন্ত ৩টি সূচকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এই অর্জনের পেছনে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্জনের কথাগুলো যত সহজে তিনি বললেন সময় কিন্তু তত সহজে যায়নি। অনেক চড়াই উতরাই যেমন পার হতে হয়েছে তেমনি গ্রেনেড হামলাসহ তার ওপর বারংবার হত্যা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি রূপক অর্থে বলেন, অনেক পথের কাঁটা পায়ে বিঁধিয়েও এগিয়ে যেতে হয়েছে। বারবার আঘাত এসেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি সেই গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে বারবার মৃত্যুকে দেখেছি, কিন্তু ভয় পাইনি কখনো। যে দেশে তাঁর বাবা, মা-ভাইদের হত্যাকা-ের বিচারের পথকে রুদ্ধ করার জন্য খুনিদের ইনডেমনিটি দেয়া হয়, তারা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, ভোট চুরি করে এমপি হয়, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ারও সুযোগ পায় সেখানে তিনি ভয় কেন পাবেন, পাল্টা প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতির পিতা মাত্র সাড়ে ৩ বছরের শাসনে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলে তাকে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান। আজকে সেখান থেকে বাংলাদেশকে তাঁর সরকার উন্নয়শীল দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও জাতির পিতা বেঁচে থাকলে স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের পর্যায়ে চলে যেতে পারতো। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পূর্ণ হয়েছে, আমাদেরতো অনেক দিন লেগে গেল, বলেও আক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী এসময় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমি জানি না আমার বাবা আজ বাংলাদেশের মানুষের এই অর্জনগুলো তিনি পরপার থেকে দেখতে পাচ্ছেন কি না? নিশ্চয়ই বাংলাদেশের এই অর্জনে লাখো শহীদের আত্মার পাশাপাশি তাঁর বাবার আত্মাও শান্তি পাবে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অগ্রযাত্রাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। এই যাত্রাপথ যেন থেমে না যায়। আমরাতো যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো? অন্যের কাছে কেন হাত পেতে চলবো? আমরা যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি সেটাতো আজকে আমরা প্রমাণ করেছি।
বাবার কাছ থেকে তাঁর শেখা রাজনীতির মূল শিক্ষাই জনকল্যাণ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা, নিজের জন্য নয়, নিজের ভোগ বিলাস নয়, জনগণ যাতে একটু ভালো থাকে, সুখে থাকে, সেটাই লক্ষ্য। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নেই তাঁর নিরন্তর পথ চলা। কাজেই যতটুকু অর্জন এর সব কৃতিত্বই বাংলার জনগণের। জনগণের কাছ থেকে সাড়া না পেলে তাদের সহযোগিতা না পেলে, তারা যদি ভোট দিয়ে নির্বাচিত না করত তাহলে ক্ষমতায়ও আসতে পারতেন না বলে এসময় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজকের এই উন্নয়নের ধারাটা যেন অব্যাহত থাকে সেটা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ, দেশকে যেন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্তভাবে গড়ে তুলতে পারি। আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করবো। আর সেই সময়ে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় তা আমরা উদযাপন করতে পারব। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার মহাসংগ্রামে তিনি ততদিন বেঁচে থাকবেন কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও আজকের যারা নতুন প্রজন্ম, দেশকে তারাই এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা জানেন গত ১৭ মার্চ ছিল জাতির পিতার ৯৯তম জন্মদিন। ওই দিন আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই সুসংবাদটি পাই। জাতির পিতার জন্মদিনে আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে! ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক আমাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দেয়। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সনদ পেল।
এই পর্যায়ে আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এতদিন অনেকেই আমাদের গরিব বলে উপহাস করেছে। একসময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে কটাক্ষ করেছে। কিন্তু আজকে আমরা তাদের কাতারে উঠে এসেছি। এ অর্জন আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আমাদের অবস্থান শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বল্পোন্নত বা গরিব বলে কেউ আর আমাদের অবজ্ঞা করতে পারবে না।