প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

এক নজরে শেখ হাসিনা সরকারের ৯ বছর

বিশেষ প্রতিবেদক
এক নাগাড়ে ৯ বছর পার করল বর্তমান সরকার। সরকারের এই চলমানতার সুফল বাংলাদেশের মানুষ নানা ক্ষেত্রেই পাচ্ছেন। ক্রমান্বয়ে বাড়ন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফসল হিসেবে মানুষ পাচ্ছেন বাড়তি মাথাপিছু আয়, দ্রুত দারিদ্র্যের নিরসন, বস্তুগত ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক যোগাযোগ, বেশি বেশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা এবং দীর্ঘ জীবন। ডিজিটাল বাংলা প্রযুক্তির কল্যাণে তরুণ প্রজন্মের জীবনচলার সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে অসাধারণ গতিতে। বিগত ৯ বছরের ধারাবাহিক উন্নয়নের এই গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ঊনিশ শ বাহাত্তরের শুরুর দিনগুলোতে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কেউ কেউ আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে। আবার অন্যরা বলতেন বাংলাদেশে উন্নতি করতে পারলে পৃথিবীর যেকোনো দেশই উন্নতি করতে পারবে। ওই বাহাত্তরের জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে স্বদেশ ফিরে এমন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের মানুষের অজেয় প্রাণশক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু চেতনাকে সম্বল করে তিনি জোর কদমে এগিয়ে চলেন সামনের দিকে। অতি দ্রুত সংবিধান প্রণয়ন করেন। তাতে সাধারণ মানুষের কল্যাণে উন্নয়নের অঙ্গীকার দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরিতেও মনোনিবেশ করেন। স্বল্প সময়েই যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামোগুলোর পুনর্নির্মাণ শেষ করে প্রগতিশীল এক বাংলাদেশ গড়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের আচমকা আক্রমণে তাঁকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট তাঁর দেশবাসীর কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী উল্টো পথে হাঁটতে থাকে বাংলাদেশ। অনেক সংগ্রাম শেষে ১৯৯৬ সালে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসে। নানা দুর্যোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ওই সরকার বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলে স্থিতিশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে। কিন্তু ২০০১ সালে ফের ঘটে ছন্দপতন। নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে দেশ চলে যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের হাতে। আবার সংগ্রাম। আন্দোলন। প্রচ্ছন্ন সামরিক শাসন। ২০০৮ সালের শেষ দিকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হয় মহাজোট সরকার। এই সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসায় বড় বড় অবকাঠামোসহ নানামুখী উন্নয়ন কর্মকা- সচল রাখা সম্ভব হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই সরকারের সুদীর্ঘ ৯ বছরের অভিযাত্রা আসলেই চোখে পড়ার মতো।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’-এ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা (ভিশন-২০২১) নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। ওই ইশতেহারে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের যে বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়নের কারণেই এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথ প্রশস্ত হয়। সংশ্লিষ্ট বাধাগুলো দূর করে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অঙ্গীকার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, উপজেলা ও গ্রাম পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, বন্দর উন্নয়ন, সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগের প্রসার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রক্রিয়া চালুর অঙ্গীকার করা হয় ওই ইশতেহারে। এছাড়াও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল করা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে মানবসম্পদের উন্নয়ন করে কর্মসংস্থান বাড়ানো, দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন, কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে তার প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, সামাজিক সংরক্ষণমূলক কর্মসূচির প্রসার; চর, হাওর ও উপকূলে দুঃখী মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক সহযোগিতার ব্যাপ্তি বাড়ানোর মতো সুদূরপ্রসারী সব অঙ্গীকার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দিনবদলের ওইসব অঙ্গীকার নিরন্তর পূরণ করে যাচ্ছে। এই ৯ বছরে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচকসমূহের যে বিস্ময়কর অর্জন ঘটেছে, তা খালি চোখেও দেখা যায়। তবু সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর-এর পক্ষ থেকে পরিসংখ্যান দিয়ে বিগত ৯ বছরের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কিছু সূচকের অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হলো।
১. জিডিপির প্রবৃদ্ধি : ২০০৭-০৮ অর্থবছরের জিডিপির (অর্থনীতির আকার) পরিমাণ ছিল চলতি মূল্যে ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকায়। এ ৯ বছরে অর্থনীতির আকার বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও পাঁচ-ছয় শতাংশের গ-ি পেরিয়ে গত দু’বছর ধরে ৭ শতাংশের বেশি হচ্ছে। গত অর্থবছরে তা বেড়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ হারে।
২. মাথাপিছু আয় : একদিকে জিডিপির আকার বেড়েছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও ক্রমান্বয়ে কমেছে। ফলে মাথাপিছু আয় দ্রুত বাড়ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ৪৩ হাজার ৭১৯ টাকা। আর তা এই ৯ বছরে বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। গত অর্থবছর শেষে তা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ১৫২ টাকা। আর মূল্যস্ফীতি পাঁচ-ছয় শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল বলে মানুষের প্রকৃত আয় বেড়েছে।
৩. দারিদ্র্য নিরসন : মাথাপিছু আয় বাড়লে দারিদ্র্য কমে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের আয় রোজগার কৃষি ছাড়াও অকৃষি খাত থেকেও বেড়েছে। গ্রামের তরুণরা নগরে ও বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের আয়-রোজগার করে গ্রামে পাঠাচ্ছে। তাই গ্রামীণ শ্রমবাজার বেশ চাঙা। সেজন্য গ্রামীণ মজুরিও বেড়ে চলেছে। তাই সারাদেশেই দারিদ্র্য কমছে। অতি দারিদ্র্যের হারও কমেছে। তবুও বিরাট সংখ্যক মানুষ অতিদরিদ্রই রয়ে গেছে। তাদের জন্য সরকার নানা ধরনের ভাতা দিচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর সংস্কার করে সমুন্নত করা হয়েছে।
২০০৭ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ৪০ শতাংশ, সেখানে ২০১৭ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। গ্রামীণ দারিদ্র্য ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ছিল ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা হয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হারও দ্রুতই কমছে। ২০০৫ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ২৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা ১২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।
৪. গড় আয়ু : দারিদ্র্য কমেছে এবং সামাজিক সংরক্ষণ বাড়ার কারণে গত ৯ বছরে গড় আয়ুও বেড়েছে। ২০০৭ সালে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল ৬৪ দশমিক ৫ বছর। ২০১৭ সালের শেষে তা ৭২ বছরে দাঁড়িয়েছে।
৫. আমদানি-রপ্তানি : এই ৯ বছরে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। রপ্তানির জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি অপরিহার্য। তাছাড়া বেশ কিছু ভোগ্য পণ্যও আমাদের আমদানি করতে হয়। গত ২০০৭-০৮ অর্থবছরে আমাদের আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তার মানে আমদানি বেড়েছে ৩৩ গুণ। অন্যদিকে রপ্তানি ওই সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৫ গুণ।
৬. রেমিট্যান্স : ২০০৭-০৮ অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রেমিট্যান্স ওই সময়ে ৫৪২ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ১০১১ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণসহ সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার অনুমতি দিয়েছে। টাকার বিনিময় মূল্যও স্থিতিশীল ছিল। তাই রেমিট্যান্স দ্রুত বেড়েছে। রেমিট্যান্স বাড়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদাও বেড়েছে। তাই গ্রামীণ ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংখ্যাও বেড়েছে। আর দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহযোগিতায় মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রচলন হওয়ায় দ্রুত রেমিট্যান্সের লেনদেন হচ্ছে। গ্রামে ব্যাংকের শাখাও এই ৯ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে গ্রামে বসেই মানুষ আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। গ্রামবাংলার অর্থনীতির এই অগ্রগতি সারাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
৭. রিজার্ভ : রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই ৯ বছরে বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। ২০১৭ শেষে তা ছিল ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আর ২০০৭-০৮ সালে ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের মতো।
৮. সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ : গত ৯ বছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণও তিনগুণেরও বেশি হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে তা আড়াই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এফডিআই ছিল ৭৬৮ মিলিয়ন ডলার। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো। প্রস্তাবিত শতাধিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে এর পরিমাণ আরও দ্রুত গতিতে বাড়বে।
৯. বাজেট : ২০০৭-০৮ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ৮৭ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকায়। এ ক’বছরে বাজেটের আকার পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১০. অবকাঠামো উন্নয়ন : বাংলাদেশ সরকার এই ৯ বছরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অসংখ্য উদ্যোগ ছাড়াও ১০টি মেগা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই ১০টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই মেগাপ্রকল্পগুলো হলো : সেতু বিভাগ-এর পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ক. পদ্মা রেল সেতু সংযোগ ও খ. দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (এমআরটি), নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ক. পায়রাবন্দর নির্মাণ প্রকল্প (১ম পর্যায়) ও খ. সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিদ্যুৎ বিভাগের ক. মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোলফায়ার্ড পাওয়ার ও খ. মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার (রামপাল), জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন।
১১. জ্বালানি : শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সাহসী নানা পদক্ষেপের কারণে জ্বালানি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। ২০০৮ সালে ৪৫ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ যেত। ২০১৫ সালে তা ৭৪ শতাংশ মানুষের ঘরে পৌঁছায়। পরবর্তী দুই বছরে বিদ্যুৎ প্রাপ্তির হার আরও বেড়ে তা আশি শতাংশেরও বেশি মানুষের ঘরে পৌঁছে গেছে।
১২. ব্যাংকিংখাত : নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল ও ঝুঁকিসহনে সক্ষম অবস্থানে রয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা অস্বস্তিকর পর্যায়ে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদ- প্রয়োগের কারণেও এ হার খানিকটা স্ফীত হয়েছে। তারপরও সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে এখনও ব্যাংকিং খাত জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
নারী শিশুর উন্নয়নে ১৪ উদ্যোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের ৯ বছরের অনেক যুগান্তকারী অর্জন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ নারী ও শিশু। নারী ও শিশুর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং সামগ্রিক উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সরকারের কিছু সাফল্যের বিবরণ তুলে ধরা হলোÑ
গত ৯ বছরে নারী ও শিশুর উন্নয়নে প্রণীত নীতিমালা, আইন ও বিধিমালাগুলো : সরকার গত ৯ বছরে নারী ও শিশুর উন্নয়নে বেশকিছু আইন-নীতি ও বিধিমালা তৈরি করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১; জাতীয় শিশু নীতি ২০১১; শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের সমন্বিত নীতি ২০১৩; মনোসামাজিক কাউন্সেলিং নীতিমালা ২০১৬ (খসড়া); জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নকল্পে কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০১৫; পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০; ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন, ২০১৪; পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩; বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭।
ভিজিডি কার্যক্রম : দুস্থদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তামূলক কিছু প্রকল্প; যাকে বলা হয় ভিজিডি কার্যক্রম। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ভিজিডি কর্মসূচির মাধ্যমে ২ বছর মেয়াদি চক্রে উপকারভোগী নারীদের মাসিক ৩০ কেজি হারে খাদ্য সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ এনজিওর মাধ্যমে উন্নয়ন প্যাকেজ সেবা প্রদান করা হয়।
গত ৯ বছরে ভিজিডি সুবিধাভোগী নারীর সংখ্যা : ২০০৯ থেকে জানুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত ভিজিডি কার্যক্রমের সহায়তা প্রাপ্ত মোট উপকারভোগী নারীর সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ।
দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান : মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে এবং শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের ভাতা প্রদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। এ সময় সরকার ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ লাখ ৯২ হাজার গর্ভবতী নারীকে ভাতা প্রদান করেছে।
কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা : মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত শহর অঞ্চলে নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মা ও তাদের শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিমান বৃদ্ধি করে তাদেরকে আর্থসামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব তহবিল থেকে ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ‘কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচি চালু করে।
অর্জন : কর্মসূচির শুরু থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ২ লাখ ৪৫ হাজার ১২৫ জন কর্মজীবী দুগ্ধদায়ী মাকে সেবা প্রদান করা হয়েছে। ১৬-১৭ অর্থবছরে ১ লক্ষ ৮০ হাজার মাকে এই ভাতা প্রদান করা হয়। জেলাভিত্তিক নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রকল্প (৬৪ জেলা) : শিক্ষিত বেকার মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতীয় মহিলা সংস্থার মাধ্যমে দেশের সবকটি জেলার শিক্ষিত বেকার মহিলাদের কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট ৪ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষিত বেকার নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ৫ হাজার ৮৮২ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ১১ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ৬৩৫ জন বেকার নারীকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৯ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত এসব পদক্ষেপের ফলেই মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে, বিভিন্ন মানবসম্পদ সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচকে আশানুরূপ উন্নতি ঘটেছে। এসবের ফলশ্রুতিতেই জাতিসংঘ এলডিসিভুক্ত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশকে।