প্রতিবেদন

ক্রমেই বাড়ছে বিশুদ্ধ পানির সংকট : এখনই কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে বিশ্বজুড়ে পানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানি সেবা থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থায় ২২ মার্চ ‘পানির জন্য প্রকৃতি’ প্রতিপাদ্যে পালিত হয়েছে বিশ্ব পানি দিবস। দিবসটির লক্ষ্য একবিংশ শতাব্দীতে পানি সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতির সমন্বয়ে কিভাবে পানি ব্যবহারের উপযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় তা খুঁজে বের করা এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে জনসচেতনতা বাড়ানো। কারণ বিশ্বব্যাপী মানুষের পরিবেশ বিরূপ কর্মকা-ের ফলেই বনভূমি, কৃষিভূমি, নদ-নদী ও জলাভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বন্যা, খরা, পানির স্বল্পতা এবং পানি দূষণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। তবে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে পানি সংকটজনিত অধিকাংশ সমস্যা দূর করা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষ। ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ ভূমিক্ষয় ও মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত এবং কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ বনভূমি ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের পরিবেশবিরোধী কর্মকা-ের ফলে বর্তমানে মোট জলাভূমির ৬৪ থেকে ৭১ শতাংশই হারিয়ে গেছে। কৃষি ভূমির মাটি ক্ষয়ের ফলে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন টন টপসয়েল বিলীন হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ফলন কমে যাচ্ছে, অপরদিকে টপসয়েলে প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেন ও ফসফরাস থাকায় তা পানি দূষণে ভূমিকা রাখছে।
পানি সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। সংগঠনটির মতে, ভাটির দেশ হিসেবে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় দেশে পানি সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে এখানকার নৌ চলাচল, সেচ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বা না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এছাড়া, প্রকৃতিনির্ভর ধান চাষের পরিবর্তে খরা মৌসুমে সেচ ও রাসায়নিক সারনির্ভর ধান চাষের ফলে ভূপৃষ্ঠস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সমাধানের চেয়ে কম খরচে ইকো সিস্টেমস প্রাকৃতিক পানির আধার হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করে পবা। পরিবেশ আন্দোলন পবা’র মতে, নদীমাতৃক এই দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওরসহ এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি সরবরাহ জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খরা, বন্যা ও সুনামির মতো চরম বিপর্যয়ের প্রভাব হ্রাসে বনভূমি, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই কঠোরভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ নদ-নদী, বনভূমি, জলাভূমি, পাহাড়, প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
দুই.
চৈত্র মাস চলছে। গ্রীষ্মকাল এখনো শুরু হয়নি, এরই মধ্যে উজানে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। এসব নদীর ৬০ ভাগ অংশজুড়ে জেগে উঠেছে চর। বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা সবচেয়ে সংকটময় অবস্থায় আছে বাংলাদেশ। এরসঙ্গে পানির অপ্রতুলতা ও বিশুদ্ধ পানির অভাব বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। বাংলাদেশের এমন বাস্তবতায় ২২ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব পানি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও এ দেশের সাড়ে ৯ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ তথ্য জানিয়ে বলছে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। কারণ ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারার কারণে এবং মৌসুম ভেদে পানি সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘিœত হচ্ছে, শিল্পোন্নয়ন ও কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও সুষ্ঠু ব্যবহারের অভাবে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতি ও পানির যথাযথ ব্যবহার না করার ফলে পানির গুণাগুণ ও পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ সমস্যা নিরসনে দরকার প্রকৃতিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিমাত্রায় নগরায়ণ ও অসচেতনতার ফলে পানির অপচয় বাড়ছে। গৃহস্থালি কাজে, শহরে, কল-কারখানায় পানির অপচয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি এসব কাজে পানি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আমাদের জমিতে যাচ্ছে। যাচ্ছে নদীতে। এই পানির অপচয় ও বর্জ্যযুক্ত পানি নদীতে যাওয়া ঠেকাতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় যেমন পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে তেমনি বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার অন্যান্য নদীর দূষিত পানি এই পানির স্তরে প্রবেশ করছে। এতে ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৩ ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এক. পানি নিচে নেমে যাওয়ায় যেমন পানির উৎস হারাচ্ছে। দুই. ভূ-গর্ভের পানি দূষিত হয়ে তা এই পানি ব্যবহারকারীদের মাঝে রোগ ছড়াচ্ছে এবং তিন. পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়ছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি প্রবাহ কমতে থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থা। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় এ অঞ্চলের কৃষি কাজ ও জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ চিত্র দেশের প্রায় সর্বত্র।
নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় পানি বিশেষজ্ঞরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিতে বলেছেন বেশ কয়েক বছর ধরেই। দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ইতোমধ্যে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা শুধু উপকূলীয় এলাকায়ই নয়, সমগ্র দেশেই করা গেলে বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা যাবে। পানি বিশেষজ্ঞদের কথা হলো বৃষ্টির পানি হচ্ছে সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি; প্রকৃতির এই অপার দানকে সর্বোচ্চ উপায়ে কাজে লাগাতে হবে।