রাজনীতি

খালেদার কারামুক্তিতে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ : ঘরে-বাইরে সমালোচনার ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের দ- পেয়ে জেলে যাওয়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশীয় আইনজীবীদের মাধ্যমে কিছুতেই জামিন পাচ্ছেন না। খালেদা জিয়ার জামিন বিলম্বের বিষয়ে বিএনপি নেতারা সরকারকে দায়ী করলেও লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন, এর জন্য দেশীয় আইনজীবীরা দায়ী। মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া প্রমুখের ওপর আস্থা রাখতে না পেরে তাই তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য নিয়োগ দিয়েছেন একজন বিদেশি আইনজীবীকে। লর্ড কারলাইল নামের ওই বিদেশি আইনজীবী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে সোচ্চার ছিলেন।
ইহুদি আইনজীবী লর্ড কারলাইল বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কট্টর সমালোচক। তিনি এই বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে নানা সভা, সেমিনার এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দূতিয়ালি করেছেন। আদালত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখার পর লর্ড কারলাইল বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। এতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং ওই আদালতের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার সুপারিশ করেন। আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর না করার দাবিতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ব্রিটিশ এই আইনজীবী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার সেই লর্ড কারলাইলই হচ্ছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পরামর্শক! সেই লর্ড কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পরামর্শক নিয়োগ দেয়ায় বিএনপির ভিতরে-বাইরে এখন সমালোচনার ঝড় বইছে। সমালোচকরা বলছেন, কারলাইল যে জামায়াতের একজন বেতনভোগী ব্রিটিশ আইনজীবী, এটি প্রমাণিত সত্য। এখন বিএনপি কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী নিয়োগ করে এটাই প্রমাণ করল, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সখ্য মোটেও কমেনি। আবার অনেকে বলছেন, কারলাইলকে নিযুক্তির মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের ভারটি এক প্রকার জামায়াতের হাতেই তুলে দিয়েছেন।
কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী নিয়োগে দলের ভিতরে-বাইরে সমালোচনার মুখে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, লর্ড কারলাইল দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও আইন পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। সেদেশে আমাদের রাজনীতির যারা সমর্থক রয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেবেন। খালেদা জিয়ার মামলাগুলো পরিচালনা করার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেবেন। লর্ড কারলাইল তার অফিস থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন জানিয়ে ফখরুল বলেন, এখন থেকে খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করবেন, পরামর্শ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা যতটুকু করা তার পক্ষে সম্ভব সেটা তিনি করবেন।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলে সিনিয়রদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট আবদুর রেজ্জাক খান ও অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন। খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনার জন্য দেশের আইনজীবীরা তাহলে কি যথেষ্ট নন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটা ঠিক না, তবে খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার জন্য লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য কারলাইলের আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, লর্ড কারলাইল কুইন্স কাউন্সিলের সদস্য। দীর্ঘকাল ধরে তিনি আইন পেশা ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি কমনওয়েলথ রাইটস ইনিশিয়েটিভের চেয়ারম্যান। ২৮ বছর ধরে তিনি পার্ট টাইম জজ হিসেবে কাজ করেছেন ‘ইনক্লুডিং ইন দি হাইকোর্ট অব জাস্টিস’। তিনি একজন সাবেক এমপি। খালেদা জিয়ার সব মামলায় দেশীয় আইনজীবীদের সহায়তা করতে লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সবগুলো মামলার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য হবেন তিনি। খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে তিনি ওখান থেকে কাজ করবেন। প্রয়োজনে বাংলাদেশেও আসবেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে ‘গ্রহণযোগ্য’ সরকার গঠনে উদ্যোগ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলেন লর্ড কারলাইল। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান এ লর্ড কারলাইল। জেনেভার ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশন ফর হিউম্যান রাইটসের হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে লর্ড কারলাইল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ১৫ জুন জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে ফলাও করে প্রচার করা হয় তাদের পক্ষে আইনজীবী লর্ড কারলাইলের কর্মকা-। ‘নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারে ব্যর্থতায় আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন লর্ড এরিক এভেবারি ও লর্ড কারলাইল’ এ শিরোনামে সংগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছিল তাদের তৎপরতার কথা। বলা হয়েছিল, ‘আইসিটির নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জানিয়েছেন লর্ড এরিক এভেবারি এবং লর্ড কারলাইল। জেনেভার ইউনাইটেড ন্যাশনস হাইকমিশন ফর হিউম্যান রাইটসের হাইকমিশনারের কাছে লিখিত এক চিঠিতে তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চিঠিতে তারা বলেন, ‘বেশ কিছুকাল থেকেই আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন কার্যক্রমকে সমালোচনা করে বেসরকারি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিবৃতি আপনার দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকবে। একজন অভিযুক্তের মৃত্যুদ-াদেশ নিয়ে করা আপিলের কার্যক্রম শেষ হয়ে তা এখন রায়ের অপেক্ষায় আছে। এই প্রেক্ষাপটে আপনার উচিত হবে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলকে পুরো বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমন্ত্রণ পাঠানোর অনুরোধ জানানো। এই প্রতিনিধি দল ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। কারাবন্দি বিচারাধীন ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানবে।
কারলাইলকে খালেদার আইনজীবী নিয়োগ করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যেও। এদের এক পক্ষ বলছে, খালেদা জিয়ার মামলার আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য একজন আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ দেয়া যুক্তিযুক্ত হয়েছে। আরেকপক্ষ বলছে, এটা দেশের আইনজীবীদের প্রতি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। আর এ নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে ভিতরে-বাইরে হতাশার পাশাপাশি চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।