কলাম

দারিদ্র্যপীড়িত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মাহেন্দ্রক্ষণে

ড. শামসুল আলম
প্রথমত, বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে তাদের নির্ধারিত মানদ-ে নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে উন্নীত করে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক মূলত ঋণ প্রদানের সুবিধার জন্য বিশ্বের দেশগুলোকে তাদের মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চারভাগে ভাগ করেছে। এ ভাগগুলো হলো : স্বল্পোন্নত দেশ, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং উচ্চ আয়ের দেশ। প্রতি বছর হালনাগাদকৃত এ তালিকা মূলত আয়ভিত্তিক বলে এখানে কোনো দেশের সামগ্রিক চিত্রটি ভালোভাবে বোঝা যায় না। কারণ অধিক মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক দেশই সামাজিক সূচকে পিছিয়ে থাকে; যেমন ভারত। এই শ্রেণীকরণের সঙ্গে জাতিসংঘের শ্রেণীকরণের সামঞ্জস্য নেই।
দ্বিতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশের (খউঈ) ধারণাটি বিশ্বে প্রথম চালু হয় ১৯৬০-এর দশকে। তবে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের পৃথক তালিকা করে ১৯৭০ সালে। মাথাপিছু কম আয়, অনুন্নত মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার নির্ধারিত সূচকে, জাতিসংঘ ঘোষিত নির্দিষ্ট সীমার (ঞযৎবংযড়ষফ) মধ্যে থাকা দেশগুলোই স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চিহ্নিত। এসব দেশের সাধারণত জীবনযাত্রার মান কম। শিল্প-বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশ্বের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়ন অভিযাত্রা ত্বরান্বিত করা ও বহুমুখী সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যেই জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের এ ধারণা প্রবর্তন করে। সর্বশেষ হিসাবে সর্বমোট ৪৭টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন প্রতিষ্ঠান স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নিয়ে এ পর্যন্ত ৪টি সম্মেলন করেছে (১৯৮১, ১৯৯০, ২০০১ ও ২০১১)। ২০১১ সালের সর্বশেষ সম্মেলন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ইস্তাম্বুল ঘোষণা ও ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। এ কর্মপরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হলো ২০২০ সালের মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ ঘটানো। এখন পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক দশকে সর্বমোট ৫টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে সক্ষম হয়েছে। এ দেশগুলো হলোÑ বতসোয়ানা (১৯৯৪), কেপ ভার্দে (২০০৭), মালদ্বীপ (২০১১), সামোয়া (২০১৪) ও ইকুয়েটরিয়াল গিনি (২০১৭)।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিল ইকোসক-এর উন্নয়ন নীতিমালা বিষয়ক কমিটি (সিডিপি) ৩টি সূচকের ভিত্তিতে ৩ বছর পর পর উন্নয়নশীল দেশ থেকে উত্তরণের বিষয় পর্যালোচনা করে। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসার সূচকগুলো হচ্ছেÑ ক. মাথাপিছু আয় (এৎড়ংং ঘধঃরড়হধষ ওহপড়সব ঢ়বৎ পধঢ়রঃধ); যা বিগত ৩ বছরের গড় মাথাপিছু জাতীয় আয় হতে বিশ্বব্যাংকের এটলাস পদ্ধতি অনুসরণ করে নির্ধারণ করা হয়। খ. মানবসম্পদ সূচক (ঐঁসধহ অংংবঃং ওহফবী) যেটি পুষ্টি, স্বাস্থ্য, মৃত্যুহার, স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হার বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হয়। গ. অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ঊপড়হড়সরপ ঠঁষহবৎধনরষরঃু ওহফবী) যেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আঘাত, কৃষি খাতের অবদান, উপকূলীয় এলাকার দুর্দশাগ্রস্ত জনসংখ্যার পরিমাণ এবং বিশ্ববাজার থেকে একটি দেশের বিচ্ছিন্নতাসহ ৮টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়।
উপর্যুক্ত যেকোনো দুটি সূচকের মান পরপর ত্রি-বার্ষিক মূল্যায়নে দুবার অর্জন করতে পারলেই একটি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। কাজেই উত্তরণের বিষয়টি খুব সহজ নয়। তবে ইচ্ছে করলে কোনো দেশ শুধু মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ভিত্তিতেও এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার মাথাপিছু আয় ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নের বছরে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় আয়ের দ্বিগুণ হতে হবে; অর্থাৎ ১ হাজার ২৩০ এর পরিবর্তে মাথাপিছু আয় তখন ২ হাজার ৪৬০ ডলার হতে হবে। কোনো দেশ পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় (৬ বছর) ৩টি সূচকের যেকোনো দুটিতে উত্তীর্ণ হলে অথবা জাতীয় মাথাপিছু আয় নির্ধারিত মানের দ্বিগুণ অর্জন করতে পারলে তাকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এরই সুবাদে, গত ১৫ মার্চ ২০১৮ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সিডিপি-এর ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সকল মানদ- পূরণের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে এ এক বড় সাফল্য।
২০১৮ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য এবার সিডিপি কর্তৃক যে পর্যালোচনা হয়েছে, তাতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত যে এটলাস পদ্ধতিতে এ আয় নির্ধারণ করা হয় সেই হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ২৭১ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচক যা কিনা পুষ্টি, স্বাস্থ্য, স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হারের সমন্বয়ে তৈরি হয়Ñ সেখানে একটি দেশের স্কোর থাকতে হবে ৬৬ বা তার বেশি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর হচ্ছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আঘাত, জনসংখ্যার পরিমাণ এবং বিশ্ববাজার থেকে একটি দেশের বিচ্ছিন্নতার ওপর ভিত্তি করে যা তৈরি করা হয়Ñ সেখানে একটি দেশের স্কোর হতে হবে ৩২ বা তার কম। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর এখন ২৪ দশমিক ৮।
এখন থেকে পরবর্তী ধাপে আঙ্কটাড (ঞযব টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈড়হভবৎবহপব ড়হ ঞৎধফব ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও উন্নয়ন প্রেক্ষাপটের আলোকে একটি ভঙ্গুরতা পর্যালোচনা বা প্রোফাইল তৈরি করবে। একই সঙ্গে উঊঝঅ (উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ ঊপড়হড়সরপ ধহফ ঝড়পরধষ অভভধরৎং) স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, বিশেষত দেশে বর্তমানে বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতা কার্যক্রম ও বহির্বাণিজ্যের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে তার আলোকে আরো একটি নিজস্ব প্রভাব পর্যালোচনা (রসঢ়ধপঃ ধংংবংংসবহঃ) তৈরি করবে ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার পর্যালোচনার পূর্বে। এরপর ২০২১ সালে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় বাংলাদেশ যদি পুনরায় সিডিপি-এর মানদ-গুলো পূরণে সক্ষম হয় তাহলে সিডিপি ইকোসক-এর নিকট বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ করবে। মার্চ ২০২১-এ বাংলাদেশ সিডিপিতে আবারো বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবে। এরপর ইকোসক তা অনুমোদনপূর্বক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নিকট বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করবে। সেক্ষেত্রে এর ৩ বছর পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ। উত্তরণের এটি হলো প্রক্রিয়া। জাতিসংঘের পরবর্তী শ্রেণীকরণ হলো উন্নত দেশÑ যে ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় হতে হবে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ডলার। জাতিসংঘের ৩টি শ্রেণীকরণ হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত দেশ।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পূর্বের ৩ বছরে (অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে) বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে একটি কৌশলপত্র তৈরি করবেÑ যা এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার পরবর্তী ৩ বছরে (২০২৪-২০২৭) বাস্তবায়ন করা হবে। এ কৌশলপত্র তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসার পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তাসমূহ কমে আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় তা ইকোসককে নিশ্চিত করা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলার। সময়স্বল্পতার কারণে বঙ্গবন্ধুর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে সরকার সফলভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ লাভের মধ্য দিয়ে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর সফল বাস্তবায়নে নতুন দিগন্তে উন্নীত হলো। উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এখন বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪১ সালে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে স্বপ্নের সমৃদ্ধ দেশের তালিকায়। অর্থাৎ নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনাগত প্রস্তুতি রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের স্ট্যাটাস থেকে বাংলাদেশের এ উত্তরণ একদিকে যেমন উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্জন ও সক্ষমতার স্বীকৃতি, অন্যদিকে এ অর্জন দেশের আর্থসামাজিক খাতে কিছু চ্যালেঞ্জ ও অভিঘাত নিয়ে আসতে পারে। শিল্পখাতে এ চ্যালেঞ্জ ও অভিঘাত অন্যান্য খাতের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হবে (গার্মেন্টস আমাদের রপ্তানি আয়ের বড় খাত)। এর প্রথমটি হবে বিশেষ বাজার সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ৯০ শতাংশই আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য রেয়াতি সুবিধা থাকবে না আর থাকলেও এর সঙ্গে কিছু কঠিন শর্ত যোগ হতে পারে (সেটা অবশ্যই ২০২৭ এর পর)। স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ রপ্তানি সুবিধা এবং করমুক্ত কোটামুক্ত ব্যবস্থাটি আর বলবৎ থাকবে না। ইউরোপ, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও ৭টি আন্তর্জাতিক বাজার বাংলাদেশের জন্য প্রচলিত জিএসপি সুবিধা উঠিয়ে নিতে পারে। এর ফলে রপ্তানিখাতে আর্থিক ক্ষতি এবং প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের শিল্প খাতকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হয়। বৈদেশিক সহায়তা ক্রমশ কমে যাওয়ায় অন্যান্য অভিঘাতের সাথে সাথে ঝপরবহপব ঞবপযহড়ষড়মু ্ ওহহড়াধঃরড়হ (ঝঞও) সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে বিশেষ সহায়তা তহবিল কম পাবে বাংলাদেশ। করমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা তুলে নেয়া হলে এবং বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য রপ্তানিবাজারে ক্রেতার কাছে অধিক মূল্যের হবে। এর ফলে পোশাক শিল্প রপ্তানি খাত কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নির্ধারিত বিশেষ সুবিধা উঠে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকে অতিরিক্ত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। ফলে রপ্তানি আয় প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে যেতে পারে, যা ২০১৫ সালের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮ শতাংশ। আঙ্কটাড বলছেÑ এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। কারিগরি সহযোগিতা হ্রাস পাবে। ফলে বৃত্তি, ফেলোশিপ, গবেষণা ইত্যাদি খাতে উন্নয়ন সহযোগিতা হ্রাস পাবে। রেয়াতি সুবিধা হ্রাস পাওয়ার ফলে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। তবে এ নিয়ে অহেতুক ভীতির কিছু নেই। কেননা বাংলাদেশে এমনিতেই বৈদেশিক সহায়তা কমছে। আমাদের বিদেশি ঋণের পরিমাণ আর্থিক বছর ২০১৭-তে ছিল দেশজ আয়ের মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ। তবে যা-ই পাওয়া যায়, বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে রেয়াত কম পাওয়া যাবে। এতে করে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের জোগান বাড়াতে হবে। দেশের সামগ্রিক সঞ্চয় বাড়াতে হবে এবং উৎপাদনমুখী খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে করের আওতা অনেকাংশে বৃদ্ধি করতে হবে। তবে দেশের সামর্থ্যরে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হওয়ায়, বিদেশি বিনিয়োগ অধিকমাত্রায় আসবে। সেজন্য প্রয়োজন হবে অন্য সবের মধ্যে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মজীবী মানবগোষ্ঠী। প্রশাসনে আরো গতিশীলতা ও দক্ষতা আনতে হবে। সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আর অভিঘাতের কথা বলেছি। এবার কিছু আশার কথায় আসতে চাই। ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আয় এবং কমে আসা আমদানি ব্যয়ের ধারাবাহিকতা আমাদের জন্য আশার বিষয়। তৈরি পোশাক, চামড়া, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ, সিমেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ নানা হালকা ও মাঝারি শিল্পের ক্রমবর্ধমান বিকাশ এদেশে হচ্ছে। এও আমাদের সামর্থ্যরে বড় বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর, শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর, শিল্পনির্ভর সেবামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর এখানেই ঘাতসহিষ্ণুতার আশার বীজটি লুকিয়ে আছে। নীতি ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই কঠিন হবে না।
এই সরকারের দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনীতি পরিকল্পনা এবং গতিশীল নেতৃত্ব, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ব্যবসায়ী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং পরিপক্বতা ইত্যাদি নিশ্চিতভাবে আমাদেরকে উত্তরণ-পরবর্তী অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো স্বল্পোন্নত স্ট্যাটাস থেকে সম্পূর্ণভাবে উত্তরণের সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি শেষ হতে আমরা ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় পাব, এটি প্রায় আরো এক দশক। এ সময়ের মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নীতিসমূহে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিতভাবেই এ অবস্থা মোকাবিলায় আমাদেরকে সক্ষম করে তুলবে। ওষুধ রপ্তানিতে মেধাস্বত্বের সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ ইতোমধ্যেই এলডিসি স্ট্যাটাস হতে উত্তরণ-পরবর্তী প্রভাব নিরূপণ এবং তা মোকাবিলার উপায় খুঁজে বের করার জন্য একটি সমীক্ষা প্রকল্প প্রণয়ন করেছে, যা অনুমোদনার্থে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এ সমীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবেÑ যা পরবর্তী সময়ে একটি প্রস্তুতি গাইডলাইন ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলপত্র হিসেবে আমাদের সকলের জন্য দিকনির্দেশনা দেবে। বাংলাদেশ উন্নয়নের বিস্ময়, ঘাতসহিষ্ণুতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ খুবই কৌশলী। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও অংশগ্রহণে এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে উত্তরণ-পরবর্তী অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করে ২০৪১ সালের মধ্যে এদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হবেÑ এ দৃঢ় আশাবাদ আমাদের রয়েছে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব)
সাধারণ অথর্নীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন