খেলা

বলটেম্পারিংয়েক্রিকেট বিশ্বে উত্তেজনা : আতঙ্কমুক্তবাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক
ক্রিকেট বিশ্বে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। যদিও বাংলাদেশ বাদে পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশের ক্রিকেটারের বিরুদ্ধেই এ ধরনের অনেক অভিযোগ উঠেছে। তারপরও এবার বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। এই ঘটনায় ক্রিকেট বিশ্বে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দাবি ওঠে অস্ট্রেলিয়াকে ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধের। তবে আতঙ্কমুক্ত আছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা। কারণ এর আগে কখনোই বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ ওঠেনি।
জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে সতীর্থ ক্যামেরন ব্যানক্রফটের বল টেম্পারিংয়ের দায় স্বীকার করে নিজে ডুবলেন, ডোবালেন কুলীন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকেও। বলের আকৃতি পরিবর্তন করে বোলারের বাড়তি সুবিধা নেয়ার চেষ্টা নতুন নয়, টেম্পারিংয়ের নৈতিক-অনৈতিক বিষয়টিও তাই বহু পুরনো। তবে স্মিথরা ছাড়িয়ে গেছেন আর সব কিছুকে। ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষ বিকেলে ফিল্ডিংয়ে থাকা ব্যানক্রফট পকেট থেকে রীতিমতো সিরিশ কাগজ বের কর বল ঘষামাজা করেন। টিভি আম্পায়ার ফুটেজ দেখে বার্তা পাঠালেও ফিল্ড আম্পায়ারদের কাছে সেটি অস্বীকার করেন ব্যানক্রফট। তবে মুহূর্তে ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়লে দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে বিষয়টা স্বীকার করেন অধিনায়ক স্মিথ।
খোদ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এটিকে ক্রিকেট, দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন স্মিথ। সহ-অধিনায়কত্ব হারান ডেভিড ওয়ার্নারও। কঠোর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) তাৎক্ষণিক কেপটাউনে তদন্ত দল পাঠায়। জানা গেছে, তদন্ত সাপেক্ষে আজীবনের জন্য ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হতে পারেন স্মিথ। ডেভিড ওয়ার্নারসহ সিনিয়র ক্রিকেটাররা ঘটনার নেপথ্যে থাকায় তাদের উপরও আসতে পারে বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ক্যামেরন ব্যানক্রফট বল পেয়ে পকেটে হাত দেন। সেখান থেকে হলুদ রঙের একটি টেপ জাতীয় বস্তু (সিরিশ কাগজ) বের করেন। আঙুলের ভাঁজে গুঁজে নেন সেটি। এরপর বলটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে যে পাশটাতে একটু ক্ষত হয়েছে সে দিকটায় ঘষতে থাকেন। এরপর সেই হলুদ রঙের বস্তুটি আবার পকেটে পুড়ে রাখেন।
ঘটনাটি কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু ক্যামেরার চোখ এড়ায়নি। এরপর জায়ান্ট স্ক্রিনে বার বার ব্যানক্রফটকে দেখাতে থাকে। ব্যানক্রফট বিষয়টি লক্ষ্য করে পকেট থেকে হলুদ বস্তুটি বের করে ট্রাউজারের গিঁট খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে আড়াল করেন! ফুটেজ দেখেই টেলিভিশন আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড মাঠের দুই আম্পায়ার নাইজল লং ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থকে সতর্ক করেন। আম্পায়াররা অবশ্য মাঠে কিছুই খুঁজে পাননি। ব্যানক্রফটকে চ্যালেঞ্জ করলে পকেট থেকে একটি সানগ্লাস কভার বের করে দেখান। পরে অবশ্য আম্পায়াররা ব্যানক্রফটের বিরুদ্ধে বল বিকৃতির অভিযোগ আনেন। সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার নিজেই পকেটে সিরিশ কাগজ থাকার কথা স্বীকার করেন। আর এর প্রতিক্রিয়ায় অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে ক্রিকেট দল যে কা- করেছে, এরপর স্মিথ অধিনায়ক থাকার সব অধিকার হারিয়েছেন। আমি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) সঙ্গে কথা বলে, হতাশার কথা জানিয়েছি। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা। এর সঙ্গে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক গর্ব জড়িয়ে আছে। ব্যাগি-গ্রিন ক্যাপ পরে কেউ সেটার অপমান করলে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
স্মিথকে এক সময় অস্ট্রেলীয়দের ক্রিকেট দেবতা স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে তুলনা করা হতো। বর্তমান সময়ে দেশটির পতাকাবাহক হিসেবেও সবার আগে ছিল তার নাম। কিন্তু একটা ঘটনাতেই চূর্ণ হয়ে গেল তাকে ঘিরে থাকা সম্মানের বলয়। এক মুহূর্তে বিশ্বনন্দিত থেকে বিশ্বনিন্দিত স্মিথ।
টেস্ট ক্রিকেটের এই ঘটনায় সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এর ঢেউ এসে লাগে বাংলাদেশেও। এ বিষয়ে তিন সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজন ও হাবিবুল বাশার তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। আকরাম ও সুজন দাবি করেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক স্বচ্ছ এবং সুশৃঙ্খল। বল টেম্পারিংয়ের কোনো ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের কোনো পর্যায়ে ঘটেনি বলেই দাবি করেন তারা। আর হাবিবুল মনে করেন এটি শৈল্পিক কাজ, যা বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড় রপ্ত করতে পারেনি।
স্মিথ ও ওয়ার্নারের ইন্ধনে বল টেম্পারিংয়ের দুঃসাহসিকতা দেখানো ক্যামেরন ব্যানক্রফট পেয়েছেন ৩টি ডিমেরিট পয়েন্ট। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এ ধরনের কিছু কি কখনো কোনো পর্যায়ে হয়েছে? সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে জাতীয় দলের নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, কখনোই না। আন্তর্জাতিক ম্যাচে তো কখনোই হয়নি আর ঘরোয়াতেও নয়। মূলত বল টেম্পারিং হয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট পর্যায়ে। কিন্তু আসলে বলের আকৃতি পরিবর্তন করার মতো সেরকম কিছু দেখিনি। এখন পর্যন্ত আমাদের ছেলেদের এই জিনিসটা দেখিনি। আমরা আসলে অভ্যস্ত না, আমাদের ছেলেরা অভ্যস্ত না। তবে হাবিবুল এও বলেন, বর্তমান সময়ে ক্রিকেটে যেভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বল টেম্পারিংয়ের কাজটা বেশ দুরূহ।
টেম্পারিংয়ের এই অভিযোগের পর এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কি কিছুটা সতর্ক হবে? ক্রিকেটারদের কাছে কোনো বার্তা দেবে? এ বিষয়ে বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান ও সাবেক অধিনায়ক আকরাম বলেন, না, আমাদের ক্রিকেট বোর্ড থেকে এ ধরনের কোনো বার্তা নেই। যেহেতু যারা খেলছে তারা সবাই খুবই সৎ। তারা সবসময় ক্রীড়াসুলভ মনোভাব নিয়ে থাকে। সবকিছু অতি সাধারণভাবেই করার মনোভাব থাকে, কখনো কোনো নেতিবাচক কিছু করে কিংবা বাজে কিছু করে জয় করার বিষয়টা আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে নেই এবং থাকবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। সবখানে ম্যাচ রেফারি থাকেন, থার্ড আম্পায়ার ও ম্যাচে দায়িত্বপ্রাপ্ত আম্পায়াররা থাকেন। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কথা আসেনি এবং আমার মনে হয়নি এ ধরনের কোনো চিন্তা কেউ কখনও করছে। আল্লাহর রহমতে আমাদের ক্রিকেট এখন খুবই সুশৃঙ্খল।