প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

বিএন ডকইয়ার্ডকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান ও বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্র সম্পদ কাজে লাগাতে নৌবাহিনীর সদস্যরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১ মার্চ চট্টগ্রামে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একাডেমিতে বিএন ডকইয়ার্ডকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান ও বিএনএ বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স দেশের নৌবাহিনীর জন্য প্রথম সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ একাডেমি। কর্ণফুলী নদীর মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই একাডেমিতে নির্মিত অত্যাধুনিক বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্সটি আধুনিক স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। জাহাজের আদলে নির্মিত এই কমপ্লেক্সের সামনে ৪১ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জ নির্মিত জাতির পিতার এক আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ১৮ ফুট মুর্তিটিকে ২৩ ফুট উঁচু কালো বেদির ওপর স্থাপন করা হয়েছে।
১৬টি ভবনের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই কমপ্লেক্সে একাডেমিক এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি আবাসিক সুবিধা রয়েছে। এতে ওয়ার্ডরুম, প্যারেড গ্রাউন্ড, সুইমিং পুল, বোট পুল এবং অন্যান্য সুবিধাদি রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে কমপ্লেক্সটি গড়ে তুলতে এখানে সিম্যানশিপ, অ্যান্টি সাবমেরিন, যুদ্ধাস্ত্র এবং কমিউনিকেশন মডেল রুম, চার্ট রুম, লাইব্রেরি, কম্পিউটার এবং ল্যাংগুয়েজ ক্লাব, আধুনিক মিলনায়তন এবং ৭ ধরনের বিভিন্ন ল্যাবরেটরি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই কমপ্লেক্সটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী এখানে নৌবাহিনীর ক্যাডেট, মিডশিপম্যান এবং নৌবাহিনী স্কুল ও কলেজের পরিবেশনায় একটি মনোজ্ঞ ডিসপ্লেও উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, নৌবাহিনীর ক্যাডেট ও মিডশিপম্যানগণ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌবাহিনী একাডেমিতে পৌঁছলে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ তাঁকে স্বাগত জানান।
বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দক্ষতার সঙ্গে বিপুল সমুদ্রসম্পদ আহরণের মাধ্যমে তা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে আমরা অর্জন করেছি প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বিশাল এক সমুদ্র এলাকা। এই বিস্তৃত সমুদ্রসম্পদকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে নৌবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের ব্লু ইকোনমির বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। আমি আশা করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আপনারা অর্পিত দায়িত্ব সফল ও নিরাপদভাবে পালন করবেন।
শেখ হাসিনা ২১ মার্চ চট্টগ্রামে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির বানৌজা ঈসা খান প্যারেড গ্রাউন্ডে বিএন ডকইয়ার্ডকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান এবং বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএন ডকইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মান (আইএসও : ৯০০০) বজায় রেখে যুদ্ধজাহাজের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে ডকইয়ার্ডের নিজস্ব ফ্লোটিং ডক বিএনএফডি সুন্দরবন ও বিএন স্লিপওয়ে ১ হাজারেরও বেশি দেশি-বিদেশি যুদ্ধজাহাজের সফল ডকিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পন্ন করেছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব জনবল, প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে এই ডকইয়ার্ড সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধজাহাজসমূহকে নৌবাহিনীতে দীর্ঘকাল অপারেশনাল রাখছে। ফলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে। বিএন ডকইয়ার্ডের এ অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজ (২১ মার্চ) ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করা হলো, যা নৌবাহিনীর ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিএন ডকইয়ার্ডের এ কৃতিত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানান।
শেখ হাসিনা আস্থা প্রকাশ বলেন, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রাপ্ত বিএন ডকইয়ার্ড আরও কার্যকরভাবে সেবা প্রদানের মাধ্যমে নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ডকইয়ার্ডে পৌঁছলে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদ এবং ডকইয়ার্ডের কমোডর সুপারিন্টেন্ড কমোডর মনিরুল হক তাঁকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীকে এ সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী সালাম গ্রহণ করেন এবং কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বিএন ডকইয়ার্ডের কমান্ডিং অফিসার ইমতিয়াজ উদ্দিনের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন।
সমুদ্র পথে দেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগের বেশি পরিচালিত হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিশাল সমুদ্র এলাকার সুষ্ঠু পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছে। সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় মানব পাচার, চোরাচালান রোধ, জেলেদের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৌবাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের সহায়তায় নৌবাহিনী ভাসানচরে অস্থায়ী আশ্রয়স্থল নির্মাণ করছে। শেখ হাসিনা বলেন, নৌ-সদস্যদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে নেভাল একাডেমিতে আজই (২১ মার্চ) উদ্বোধন করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স। ফলে জাতির পিতার স্বপ্নের আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা একটি আধুনিক ও শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে স্বাধীনতার পরপরই বেশ কয়েকটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সংগ্রহ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি নৌবাহিনীর বৃহত্তম প্রশিক্ষণ ঘাঁটি বানৌজা ঈসা খান কমিশন করেন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নেভাল এনসাইন প্রদান করেন। একই সাথে দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে দ্য টেরিটরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট প্রণয়ন করেন।
বর্তমান সরকার জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকারের ১৯৯৬-২০০০ মেয়াদে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ব্যাপক উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধন করা হয়েছিল। ২০০৯ সাল হতে গত ৯ বছরে নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌবহরে সাবমেরিন সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আজ ত্রিমাত্রিক শক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নৌবাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে সর্বোচ্চ সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ, গড়ে তোলা হয়েছে হেলিকপ্টার ও টহল বিমানসমৃদ্ধ নেভাল এভিয়েশন এবং বিশেষায়িত ফোর্স সোয়াডস। সেই সাথে সমুদ্রে নজরদারি ও টহল জোরদার করতে আরও অত্যাধুনিক মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্র্যাফট ও হেলিকপ্টার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পটুয়াখালীতে এভিয়েশন সুবিধা সংবলিত নৌবাহিনীর সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি ও ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নৌঘাঁটি নির্মাণের কাজ চলছে। সাবমেরিনের সুষ্ঠু পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জেটি সুবিধা প্রদানের জন্য কুতুবদিয়ায় একটি সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামের সীতাকু-ে সন্দ্বীপ চ্যানেলে জাহাজ বার্থিং সুবিধা সংবলিত ফ্লিট সদর দপ্তরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ফলে সমুদ্র এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ সমুদ্রে নৌবহরের সকল অপারেশনাল কর্মকা-কে নিরবচ্ছিন্ন রাখার প্রধান চালিকাশক্তি বিএন ডকইয়ার্ড উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিমাত্রিক ও উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং আধুনিকায়নের জন্য বিএন ডকইয়ার্ড দেশপ্রেম ও পেশাগত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পরিচিতি এখন আন্তর্জাতিক পরিম-লে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌবাহিনী জাহাজ বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে এবং নিজেরাও সফলভাবে মহড়ার আয়োজন করছে। উপমহাদেশে শুধু বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজই ভূ-মধ্যসাগরে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম টাস্কফোর্সের আওতায় সফলভাবে নিয়োজিত থেকে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় তাঁর সরকারের শাসনামলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন খ-চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছি। এ স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী মাইলফলক। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে গেলাম। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের আগেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব, ইনশাআল্লাহ।