সাহিত্য

ভোগে নয়, ‘ট্যাগে’ই প্রকৃত সুখ!

অরুণ কুমার বিশ^াস
কথা মিছা না, ঘটনা আসলেই তাই। ভোগে আর কবে সুখ ছিল বলুন! সুখ-সমৃদ্ধি যা কিছু সব ট্যাগে আর ট্যাঁকে। ট্যাঁকে টাকা না থাকলে তো চোখে দুনিয়া আন্ধার। আর ট্যাগাইতে পারলেই ইদানীংকার পোলাপানের বড্ড সুখ। যে যা করতেছে, সমানে ট্যাগাচ্ছে। কোনোরকম বাছ-বিচার নাই, বুদ্ধি-বিবেচনা নাই, দিনরাত খালি ট্যাগাও আর ট্যাগাও। এই ট্যাগানির অত্যাচারে দেশান্তরি হবার কথাও ভাবছেন অনেক ভুক্তভোগী।
সেদিন ঘটনা কী ঘটলো শোনেন। বার বেলা, তাই মুড ভীষণ খারাপ। মাথার চাঁদি এতই গরম যে দুমুঠো চাল ফেলে দিলে দিব্যি মুড়ি হয়ে ফুটবে। এই দূষণ আর হাউকাউয়ের শহর তিলোত্তমা ঢাকায় মানুষের মন-মেজাজ কখনোই খুব একটা খুশ থাকে না, জানেন তো! ঘুম ভেঙে ফেবু অন করতেই দেখি একখানা ফুডু মানে ছবি। কে না কে ট্যাগাইছে, দেখে আমার চান্দি গরম। ফাজিলের বাসার কমোড নষ্ট, মেলা কষ্ট-কসরত করে তা সারানো হচ্ছে, সেই ছবি সে আমারে ট্যাগাইছে। ভাবেন একবার! আমি কি ভাই মুর্দাফরাস, নাকি গোরখোদক যে তিনি আমারে এই জাতীয় দুর্গন্ধযুক্ত ছবি ট্যাগাবেন। এমন জ্বালাতন কাঁহাতক সহ্য হয়। দিলাম তারে ব্লক।
ট্যাগের আভিধানিক অর্থ হলো গিয়ে ট্যাগ বা পরিচয়মূলক পট্টি লাগানো বা সংযুক্ত করা। একটু ব্র্যান্ড ধরনের কিছু কিনলেই দেখবেন তার কলারে বা পকেটে কিছু শক্ত কাগজ যুক্ত থাকে। সেখানে উল্টা-পাল্টা কী কী সব লেখা থাকে। ওসব আপনার না পড়লেও চলবে। আপনি বিদ্বান মানুষ, ট্যাগটোগ কেন পড়বেন! আপনি করবেন গবেষণা। ওটা অবশ্য আপনি চাইলে নিজে কষ্ট না করে অন্যেরটা মারিং-কাটিং এবং পরে মনের মাধুরী মিশিয়ে পোস্টিংও করতে পারেন। তাতেই অপনি ড-এর পরে ডট, মানে বিশিষ্ট বিদ্বান ‘ডক্টরেট’ হয়ে যাবেন। এসবই হচ্ছে ইদানীং। মুফতে পাইলে কে আর কষ্ট করে বলুন।
তো সেই ট্যাগের যথেচ্ছাচার চলছে এখন। বিশেষ করে ফেসবুকে। বাস্তবে যে হয় না এমন কিন্তু নয়। কাজ করলেন আপনি, আর নাম হলো অন্যের। মানে অন্য কেউ নিজ উদ্যোগে আপনার আয়াসলভ্য কর্মখানা মেরে দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিল। আপনি তাকিয়ে দেখলেন কিন্তু করার কিছুই নেই। কারণ আপনি তার মতো নির্লজ্জ বেহায়া নন, বা আপনার চাপার জোর কম। এই জামানায় ভদ্রতাকে দুর্বলতা আর চাপাবাজিকে পা-িত্য বলে ধরা হয়। প্রাচীন ভারতের সেই চাণক্য প-িতের দিন তো আর নেই। তিনি একখানা জবরদস্ত কথা অবশ্য বলেছিলেন, ছোবল না মারলেও ফোঁস করতে হয়। নইলে পাবলিক তোমার লেজ ধরে থ্রি-সিক্সটি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে বাঁই বাঁই করে ঘোরাবে।
সেদিন গেছি এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। গিয়ে দেখি এক বুরবক টাইপ মানুষ চরম গরমে একখানা সাফারি স্যুট পরিধান করে এসেছেন, সাথে তার পরির মতোন বউ। সেই লোকের সাফারির কাঁধে ঝুলছে দৃষ্টিনন্দন ট্যাগ। মেইড ইন ইতালি বা এই জাতীয় কিছু। দেখে জব্বর হাসি পেল। কাছে গিয়ে বেশ গলা চড়িয়ে বলি, ও দাদা, আপনার লেঙুড় এখনও ঝুলছে যে। ওটা সামলান, নইলে পাবলিক ধরে টানবে! তাতে কিন্তু ভদ্রলোকের মোটেও হেলদোল নেই। চালিয়াত হেসে বলল, ভাইজান, ওটা তো দেখানোরই জিনিস। এত দাম দিয়ে কিনলাম!
আমি মনে মনে ভাবি, বলদের কত কিসিম। এদের কাছে আমি নেহাতই দুগ্ধপোষ্য সদ্যোজাত শিশু। এরা বড্ড দেখনধারি। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি বাজাতে অভ্যস্ত। দামি কিছু খেল কিন্তু কেউ গন্ধ পেল না, তাই কি হয়! কিছু পরলো, কিন্তু কেউ দেখলো না। এটা কি হতে পারে! এর নাম নাকি আবার ব্র্যান্ডিং! যে যত খুশি সাজো আর তালিয়া বাজাও। কেউ দেখবে কেউ দেখবে না, তাও বাজিয়ে যাও। মনে রাখবেন, নো ব্র্যান্ডিং ইজ ব্যাড ব্র্যান্ডিং। তোমার বউ গাড়ি চালকের সাথে পালিয়ে গেছে। এটা কিন্তু একটা মুখরোচক খবর। আর পাবলিকের মুখে যা রোচে, তাই কি কখনও খারাপ হয়! বউ পালানোর সাথে সাথে তোমার নামখানা বরাতজোরে পত্রিকার পাতায় ছাপা হবে। চাই কি ছবিও। লোকে তোমার নাম জানবে। কেউ হাসবে, কেউ নাচবে, আবার কেউ মুখে সহানুভূতির চুকচুক শব্দ করবে!
তো যা বলছিলাম, এই ট্যাগানির জেরে আমার জান জেরবার। মাঝে মাঝে মনে হয় ফেসবুকের ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু তাতে যে আমারও আখেরে বেজায় লস! বিনে মাগনায় এমন মার্কেটিংয়ের সুযোগ আর কই পাবো! বস্তুত, নিজেকে জাহির করবার এক মোক্ষম ক্যানভাস এই ফেসবুক। ইচ্ছেমতো রঙ চড়াও আর ছড়িয়ে দাও ফেসবুকের আকাশে। এখানে নিজের মতো করে ছবি আঁকিয়ে তা আবার মজবুত করে ঝুলিয়ে দেয়া যায়। তবে ব্যাপার কী জানেন তো, সবকিছুতে একটা পরিমিতিবোধ থাকা ভালো। নইলে বেশি পেটাতে গিয়ে বেমক্কা ঢোল ফেটে গিয়ে চরম গ-গোল বাঁধার সম্ভাবনা থেকে যায়। মাগনা পেলে আমরা অনেকেই আকণ্ঠ গিলি। তারপর বদহজম, মানে ডাইরেক্ট লাইন এবং হাসপাতালের বেডে শুয়ে টিকটিকির নাচ দেখা ছাড়া আর কিচ্ছু করার উপায় থাকে না। আমরা সকলেই ছুটতে জানি, কিন্তু বুঝতে পারি না ঠিক কখন থামতে হয়। গতির সাথে যতিচিহ্নের সম্পর্কটা আদি ও অনস্বীকার্য। অনেকেই দেখবেন শুরুটা বেশ ভালোই করে, কিন্তু পরে দিকদিশা ঠিক রাখতে না পেরে সহসাই বালুঝড়ে পড়ে উটের মতো নাক ডুবিয়ে ফেলে। মানে একরকম রিট্রিট বা পশ্চাৎপসরণ।
সে যে যাই বলুক, ফেসবুকে ট্যাগানোর মূল উদ্দেশ্যই কিন্তু নিজেকে অহেতুক জাহির করা। সেটা সচেতন হোক বা অবচেতনভাবে। এটুকু বিবেচনাবোধ নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি, যে আপনি কিছু ট্যাগানোর আগে ভাববেন উক্ত ছবি বা খবরখানা আমার কাছে কতটা আগ্রহের বস্তু। ট্যাগানো মানেই কিন্তু এগোনো নয়, বিবমিষা বিরক্তিতে পাবলিক আপনাকে দুয়োও দিতে পারে। তাই বলছি, সাধু সাবধান। আলতু মিয়ার মতো ফালতু জিনিস ট্যাগ বা যুক্ত করবেন না। তাহলে কিন্তু আপনাকেও আমি ফেবু থেকে বিযুক্ত করে দেবো। আর কখনওই নবনিযুক্ত করবো না।