রাজনীতি

রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ : দেশের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির আবির্ভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের দ-প্রাপ্ত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা কিংবা না করার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অবস্থান কী হবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বিচিত্র হিসাব-নিকাশ। সমালোচকরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার পেছনে সরকারের চেয়েও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের তৎপরতা ছিল বেশি। কারণ এরশাদ মনে করেন ১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়ার কারণেই তাকে জেলে যেতে হয় এবং টানা ৬ বছর জেলের ঘানি টানতে হয়; এমনকি এরশাদকে জেলে থেকেই নির্বাচন করতে হয়েছিল। এখন দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে গেলে এরশাদ চাচ্ছেন খালেদা জিয়া টানা ৫ বছরই জেলে থাকুক। খালেদা জিয়া জেলে থাকলে জাতীয় পার্টির পক্ষে শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়া সম্ভব। এরশাদ এও মনে করেন, রাজনীতিতে বিএনপি যত চাঙা থাকবে, জাতীয় পার্টির অবস্থা ততই খারাপ হতে থাকবে। অপরদিকে বিএনপির অবস্থা যতটা খারাপ থাকবে তার জাতীয় পার্টির অবস্থা ততটাই চাঙা থাকবে। ফলশ্রুতিতে আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি একক দল হিসেবে নির্বাচন করার কথা এরই মধ্যে বহুবার বলেছে। এসব কথা থেকে এটি পরিষ্কার, আগামী নির্বাচনে বিএনপির পরিবর্তে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হয়ে ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়। এমনকি সারাদেশে ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণেরও স্বপ্ন দেখছেন এরশাদ। এদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতাই মনে করেন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এরশাদের জাতীয় পার্টিই হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল। জাতীয় পার্টি সর্বশেষ ২৪ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ করে সেই বার্তাই দিয়েছে। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশে দলটির নেতাকর্মী ও জনতার উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। নিকট অতীতে জাতীয় পার্টির এত বড় সমাবেশ আর দেখা যায়নি। মহাসমাবেশে জাপার কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেছেন, ‘আমরা আর কারো ক্ষমতার সিঁড়ি হব না। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতায় যাব এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করব।’ এর আগে বিদেশি একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ বলেছিলেন, সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে তার দলের সদস্যদের বের করে এনে তিনি জাতীয় পার্টিকে বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চান। সেই লক্ষ্যে এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলোকে নিয়ে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ গঠন করেছেন এইচ এম এরশাদ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বেশ কিছুদিন ধরে এইচ এম এরশাদ সারাদেশ সফর করছেন। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছেন।
এদিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমানে মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির এক মামলায় বর্তমানে কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। শিগগিরই তার মুক্তির সম্ভাবনা নেই। অপরদিকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তিনি দেশের বাইরে চলে যান। এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি। একটির পর একটি মামলায় তার সাজা হয়েছে। বর্তমানে সপরিবারে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেতৃত্ব বর্তমানে গভীর সংকটে পড়েছে। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে সক্রিয় ও দৃশ্যমান তেমন কোনো কর্মসূচি আসেনি, যা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার চিন্তিত হতে পারত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, জাতীয় পার্টি যতই চেষ্টা করুক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। সারাদেশে তাদের সে রকম সাংগঠনিক অবস্থা ও জনভিত্তি নেই। তারপরও রাজনৈতিক জটিল সমীকরণের কারণে ৫ জানুয়ারির মতো বিএনপি আবারও যদি নির্বাচনের বাইরে থাকে সেই ক্ষেত্রে আবারও বিরোধী দলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জাতীয় পার্টির। অবশ্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও মনে করছেন, দেশি-বিদেশি নানা চাপে এবং এবারের নির্বাচনকে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারও চাচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচনে রাখতে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কিভাবে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যায় তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সরকারের কট্টর সমর্থক একটি গ্রুপ চাচ্ছে বিএনপি নির্বাচনে আসুক অথবা না আসুক নির্ধারিত সময়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নিষ্কণ্টক করা। আর এই পরিকল্পনা ও কৌশলের অংশ হিসেবেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে; যা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদও মনেপ্রাণে চাচ্ছেন।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে তুলনা নয়। আমরা আমাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে জাতীয় পার্টিকে সমৃদ্ধ করব। তারই অংশ হিসেবে ২৪ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাসমাবেশ করেছে জাতীয় পার্টি।’ তিনি বলেন, ‘দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার নেয়ার জন্য দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। আমরা একটা নতুন বার্তা নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছি।’
আগামী নির্বাচন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। গত ১৬ মার্চ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার উন্নয়নে, অর্জনে জনগণ খুশি। নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।’ তার এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি নির্বাচনে বিএনপি আসছে না? বিরোধী দলের ভূমিকায় কি আবারও এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি থাকছে?