অর্থনীতি

সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও চাঙা হচ্ছে না পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাংক আমানতে সুদের হার বাড়িয়েছে সরকার। এটি সঞ্চয়কারীর জন্য সুখবর হলেও পুঁজিবাজারের জন্য শঙ্কার বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, সুদের হার কমলে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হয়। অনেকে সঞ্চয় উঠিয়ে বিকল্প হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। আমানতে সুদ হার বাড়ায় মানুষ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে ব্যাংকে সঞ্চয়ে ফিরছে। এতে ব্যাংকের মূলধন স্ফিত হচ্ছে আর চালেঞ্জের মুখে পড়েছে পুঁজিবাজার। ব্যাংকের এডিআর কমানোয় ঘাটতি পূরণে আমানত সংগ্রহে সুদের হার বাড়িয়েছে ব্যাংক। গ্রাহকের মাসিক পেনশন স্কিম (ডিপিএস) ও স্থায়ী আমানতে (এফডিআর) আগের চেয়ে বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। বিদ্যমান হারের চেয়ে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদ হার বাড়ানোর ঘোষণাও দিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক।
আগ্রাসী ঋণে লাগাম টানতে ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণ (এডি) অনুপাত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া আমানতের ৮৫ টাকা ঋণ দিত ব্যাংক আর ১৫ টাকা জমা রাখত। এই অনুপাত কমিয়ে ৮৫ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৮৩ টাকা আর শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ৯০ শতাংশের বদলে ৮৯ শতাংশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের হাতে গ্রাহকের আমানতের সাড়ে ১৬ শতাংশ রাখতে হবে; অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানতের মধ্যে সাড়ে ১৬ টাকা জমা রেখে বাকি অর্থ ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। আগে ছিল ১৫ শতাংশ; অর্থাৎ এই বাড়তি দেড় শতাংশ অর্থ পূরণে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি আমানত সংগ্রহ করতে হবে। নির্দেশনা মানতে গিয়ে ঘাটতি থাকা অর্থ পূরণে ব্যাংককে আমানত সংগ্রহ করতে হবে। তবে বর্তমানে আমানত সুদের হার অনেক কম হওয়ায় অনেকে ব্যাংক সঞ্চয় উঠিয়ে পুঁজিবাজার কিংবা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে। কাজেই নতুন আমানত সংগ্রহ করতে হলে বাড়তি অর্থেই আমানত সংগ্রহ করতে হবে। যার জন্য ব্যাংকগুলো আমানতের হার বাড়িয়ে ঘাটতি অর্থের পূরণ করতে চাইছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুদের হার কম হলে বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়কারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। শেয়ার দাম-হ্রাস বৃদ্ধি ঘটলেও বছর শেষে ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ পায় বিনিয়োগকারী। আর কেনা দামের চেয়ে শেয়ার দাম বাড়লে বাড়তি মুনাফাও হয়। এতে দুইদিক থেকেই লাভ হয়। একদিকে কোম্পানির লভ্যাংশ অন্যদিকে শেয়ার দাম বৃদ্ধি। তবে শেয়ার দাম কমে লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোকে ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে হয়। কেউ কেউ ১০ শতাংশ আবার কেউ কেউ ৩০ শতাংশও লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। তবে এটা নির্ভর করে কোম্পানির আয়ের ওপর। শেয়ারের বর্তমান মূল্য যত টাকাই হোক, ফেসভ্যালু ১০ টাকার ওপর লভ্যাংশ দেয়া হয়। বর্তমানে পুঁজিবাজারে দু-একটি ব্যাংক ছাড়া বেশিরভাগ শেয়ারের দাম ১৫ থেকে ২৫ টাকা। ১০ টাকার বেশি ৯টি, ১০ টাকার কম দামে ১টি, ২০ টাকার বেশি ৯টি, ৩০ টাকার বেশি ৪টি, ৪০ টাকার বেশি ৩টি আর ৫০ টাকার বেশি ২টি আর ১০০ টাকার বেশি দামে ১টি কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হচ্ছে। জানা গেছে, ২০১৭ সালে ডিএসইর বাজার মূলধন বাড়ে ২৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১ বছরে মূলধন বাড়ে ৮১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলোর আমানতের হার ৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যেই ছিল। ওই বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহে সুদের হার ছিল ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে এটা কমতে কমতে ডিসেম্বরে এসে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৯১ শতাংশে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমানতের হার বাড়ানো হলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে পুঁজিবাজার। আমানতে সুদের হার কমায় অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে এসেছে। এই হার বাড়ানো হলে অনেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে সঞ্চয়ে ফিরে যাবে। এতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এই সময়ে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো খুবই জরুরি। ব্যাংকগুলো ভালো লভ্যাংশ দিলে বিনিয়োগকারী যাবে না, তবে লভ্যাংশ খারাপ হলে অনেকের চলে যাওয়ার শঙ্কা থাকছে। এ জন্য সুদের হার একেবারেই বাড়ানো, আবার একেবারেই না কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।
এই উপসর্গের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের যথাযথ বিনিয়োগের অভাবেও পুঁজিবাজার চাঙা হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। পুঁজিবাজারে দরপতন হলে সাপোর্ট দেয়ার (শেয়ার কেনার) সক্ষমতা নেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরÑ বিএমবিএ (বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন) এবং ডিবিএর (ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন) পক্ষ থেকে এমন মন্তব্য করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। সম্প্রতি শীর্ষ স্টক ব্রোকারদের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ ধরনের মন্তব্য করেন সংগঠন দুটির সভাপতি। মন্তব্যের পরপরই শেয়ার বাজারে ব্যাপক দরপতন হয়।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সক্ষমতার অভাব রয়েছে এটা মিডিয়ায় বলায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে কথা না বলে তাদের উচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি কিংবা অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলা। তারা এর সমাধানে কাজ করতে পারেন। তা না করে মিডিয়ায় এ ধরনের কথা বলায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। ফলে লোকসানেও শেয়ার ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা গেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এটিও পুঁজিবাজার চাঙা না হওয়ার আরেকটি কারণ।
এদিকে বাজারে নতুন শঙ্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি)। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো সম্প্রতি গ্রাহকদেরকে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনার জন্য যে মার্জিন ঋণ দিয়েছে সেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অনেক কমে গেছে। ফলে অনেক গ্রাহকের ক্ষেত্রেই আইনগতভাবে ফোর্সড সেল দেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মার্চেন্ট ব্যাংকাররা বলছেন, উদাহরণস্বরূপ গ্রাহক নিজের ১০০ টাকার সাথে ১০০ টাকা মার্জিন ঋণ নিয়ে মোট ২০০ টাকা দিয়ে শেয়ার কিনলে শেয়ারের দাম যদি ১৩০ টাকার নিচে চলে আসে তখন মার্চেন্ট ব্যাংককে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে তা সমন্বয় করতে হয়। গ্রাহক চাইলে ঋণের টাকা জমা দিয়েও এটি সমন্বয় করতে পারেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এমন কোনো বাবল হয়নি যে, শেয়ার কিনে রেখে দিলে লোকসান হবে। বরং আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার ছেড়ে না দিয়ে ভালো কোম্পানির শেয়ার রেখে দিলে লভ্যাংশের টাকা দিয়েও ভালো আয় করা সম্ভব।