প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের রূপকার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মমাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস মার্চে বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত বা এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি দিয়েছে। একটি দেশকে এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি পেতে হলে জাতিসংঘের ৩টি শর্তের মধ্যে কমপক্ষে দুটো শর্ত পূরণ করতে হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ ৩টি শর্তই বড় ব্যবধানে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘের মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) হবে ১ হাজার ২৩০ ডলার অথবা তারচেয়েও বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলার। একটি দেশের মানবসম্পদ সূচক, হিউম্যান অ্যাসেটস ইনডেস্ক (এইচএআই) অবশ্যই ৬৬ অথবা বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেস্ক (ইভিআই) ৩২ অথবা তার নিচে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সূচক যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৯ এবং ২৪ দশমিক ৮।
উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশকে ৪৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেশের আপামর জনগণ একবাক্যে বলছেন, পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনা না ঘটলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বহু আগেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পেত। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য জাতিসংঘ যে ৩টি শর্ত বেঁধে দেয়, নির্ধারিত সময়ের আগেই সে শর্তগুলো পূরণে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে আপামর জনগণ বলছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের রূপকার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাই। তাঁর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের স্থায়ী মর্যাদা পাবে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে। এ জন্য অবশ্য তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন বলেও মতামত ব্যক্ত করেন।
এদিকে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দেয়ায় দেশজুড়ে আপামর জনগণের মাঝে উচ্ছ্বাস বয়ে যায়। স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে বর্তমান সরকারের ঐতিহাসিক সাফল্য শোভাযাত্রা, আনন্দর্যালি, লেজার শো, আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করে সর্বস্তরের জনগণ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ সংবর্ধনাও দেয়া হয়। একই সাথে ঐতিহাসিক এ সাফল্য অর্জন করায় ২২ মার্চ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শোভাযাত্রা বের করা হয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে উচ্ছ্বসিত জনতার শোভাযাত্রায় রাজধানী রূপ নেয় উৎসবের নগরীতে। এসব শোভাযাত্রা গিয়ে মিলে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে।
এ উপলক্ষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে বিকেল সাড়ে ৫টায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ আয়োজন। এরপর ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিশু শিল্পীদের সমবেত পরিবেশনা। আয়োজনের মধ্যে বাঁশি, ঢাক-ঢোলের বাদ্য, মঙ্গলযাত্রা, লাঠি খেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আচার-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়।
সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি গ্যালারিতে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আয়োজনের মূল পর্ব শুরু হয়। এরপর দেখানো হয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের পথপরিক্রমার ওপর একটি তথ্যচিত্র। অগ্রযাত্রার এ স্বীকৃতি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান স্টেডিয়ামে বসে প্রধানমন্ত্রী উপভোগ করেন। এ সময়ে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) গত ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার দেশব্যাপী এলডিসি থেকে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ উত্তরণ প্রক্রিয়া উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দুপুর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকায় সমবেত হতে থাকেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, পরিদপ্তর ও সংগঠনের ব্যক্তিরা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানটি সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ।
বাংলাদেশের এমন অর্জনে সবার মাঝে দারুণ উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উচ্চারিত হচ্ছিল বাংলাদেশ বাংলাদেশ ধ্বনি। অনেকের মাথায় দেখা যায় লাল-সবুজের ক্যাপ, গায়ে টি-শার্ট, হাতে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড। যেখানে লেখা ছিল হাতে রেখে হাত, উন্নয়নের ডাক, স্বপ্ন পূরণের উৎসবে আজ বাংলাদেশ, অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ, স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আজ হাসছে সুখী মানুষের প্রাণস্পন্দনে দেশ ভাসছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার, গতিরোধ করার সাধ্য কার ইত্যাদি স্লোগান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পৃথক পৃথক শোভাযাত্রা করে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের মূল অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। তবে শিল্পকলা একাডেমির শোভাযাত্রা ছিল চোখে পড়ার মতো।
সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ণিল সব ব্যানার-ফেস্টুন, হাতে জাতীয় পতাকা, ঢাক-ঢোল, হাতি, ঘোড়ার গাড়ি, নৌকার গাড়ি, একতারা, সারিন্দা, বাঁশি নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। শোভাযাত্রায় নারী-পুরুষ সব বয়সী মানুষের চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাসের ছাপ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে নানা প্ল্যাকার্ড চোখে পড়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ সংস্থার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ছিল সুসজ্জিত বাদকদল। শোভাযাত্রার বিশাল ব্যানার নিয়ে গায়ে বর্ণিল টি-শার্ট, মাথায় ক্যাপ দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে হাতে শোভা পায় ফেস্টুন। টি-শার্টে, ব্যানারে স্লোগানÑ অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ।
এর আগে সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এই উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) কর্তৃক আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সভাপতিত্ব করেন। এ সময়ে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ফজিতা ম্যানুয়েল কাতুয়া ইউতাউ বক্তৃতা করেন। ইউএনডিপি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আসীম স্টেইনারের একটি লিখিত বার্তাও অনুষ্ঠানে পড়ে শোনোনো হয়। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশপত্রের রেপ্লিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী একটি স্মারক ডাকটিকেট অবমুক্ত করেন। এরপর একটি ৭০ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোট অবমুক্ত করেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল মালেক এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা বেগম কামরুন্নাহার প্রধানমন্ত্রীর হাতে ৭০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির একটি ফটো অ্যালবাম তুলে দেন।
এরপরই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, কেন্দ্রীয় ১৪ দল, সরকারি কর্মকর্তা, তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশ বাহিনী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিক, শিল্পী, পেশাজীবী সংগঠন, মহিলা সংগঠন, এনজিও প্রতিনিধি দল, ক্রীড়াবিদ, শিশু প্রতিনিধি দল (স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসি), প্রতিবন্ধী প্রতিনিধি দল, শ্রমজীবী সংগঠন এবং মেধাবী তরুণ সমাজের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এছাড়াও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জনের ঐতিহাসিক সাফল্যে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আনন্দ শোভাযাত্রা, মানববন্ধন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।