খেলা

আইপিএল জুয়ায় আক্রান্ত পুরো দেশ প্রশাসনের সক্রিয়তা জরুরি

ক্রীড়া প্রতিবেদক
ভারতের টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-আইপিএলকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারাদেশে বসছে জুয়ার আসর। ফাইভ স্টার হোটেল, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান ও খেলার মাঠে হচ্ছে জুয়া। বছর পাঁচেক ধরে চলে আসা এই আইপিএল জুয়ায় কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ফোনে, বিকাশে। ফলে ঢাকায় বসে রাজশাহী বা চট্টগ্রামের বড় কোনো আসরে অবলীলায় অংশ নিচ্ছে জুয়াড়িরা। তবে পাড়ার অলিগলিতে স্ক্রিন লাগিয়ে ও টিভিতে টাকা হাতবদল হচ্ছে সরাসরিই। প্রতিটি ম্যাচের প্রত্যেক বলে চলছে এসব জুয়া। এখন আইপিএল জুয়াকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে কেউ কেউ। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাদ দিয়ে অনেকেই মেতেছে আইপিএল জুয়ায়। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ নানা পেশার মানুষও মেতেছে এসব জুয়া খেলায়। প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। জুয়ার টাকা দিতে না পারায় ঘটছে আত্মহত্যার ঘটনাও। আইপিএল বাজি ধরে কেউ কেউ দামি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, স্ত্রীর সোনার গহনাসহ নানা দামি জিনিসপত্র বন্ধক রাখছে। আর সুদের ব্যবসায়ীরাও থাকছে জুয়ার বোর্ডের কাছাকাছিই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন সন্ধ্যায় টিভির পর্দার সামনে খেলার দর্শকের মধ্যে যে ভিড় দেখা যায়, এর প্রতিটিই ছোটখাটো জুয়ার আসর। টিভি মানেই একটি জুয়ার বোর্ড। ম্যাচে জয়-পরাজয়, এক ওভারে কত রান, এক বলে কী হবে, কোন খেলোয়াড় কেমন খেলবে এমন সব কিছুর ওপরই হচ্ছে জুয়া। চায়ের দোকানের এসব ছোটখাটো আসরে পুরো ম্যাচের জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে একেক ধরনের রেট থাকে। তবে সাধারণত ফেবারিট দলের পক্ষে দেড় হাজার ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের পক্ষে ১ হাজার টাকা ধরে খেলার প্রচলনই বেশি। মাঝারি মাপের জুয়ায় ১০ হাজার ও ১৫ হাজার টাকা হয় রেট। বড় আসরে বলই শুরু হয় পাঁচশ টাকা থেকে। সেখানে একাউন্টধারীরাই শুধু খেলার সুযোগ পান। হার-জিতে জুয়াড়িরা লাভ পেলেও মূল লাভ পায় আসর প্রতিষ্ঠাতা অর্থাৎ টিভির মালিক বা স্ক্রিনের মালিক। ডাকপ্রতি ৫ থেকে ১০ শতাংশ টাকা যে আসর বসায় তার জন্য নির্ধারিত থাকে। এর বাইরে জুয়াড়িদের দুই পক্ষের দুই ডাকের বাইরের যেকোনো ঘটনার জন্য পুরো টাকা যায় আসর মালিকের কাছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে আইপিএল ম্যাচকে ঘিরে নগরীর বাকলিয়া, ডিসি রোড, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে। গত আইপিএলে বাকলিয়া আহমুদ্যা কলোনি এলাকায় জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে রশি বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন মো. রাসেল নামে এক যুবক। জুয়া নিয়ে বাজিকরদের মধ্যে প্রতিদিন ঘটছে হাতাহাতি, মারামারি। ১৫-২০ বছর বয়সী কিশোর-যুবকরা ক্রিকেট জুয়ায় মেতে উঠছে। বেশি হচ্ছে মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস দিয়ে। রাজশাহী শহরের বিভিন্ন স্থানে সব মিলিয়ে ১০টি পয়েন্টে এবং জেলার বিভিন্ন থানায় ৩৫ থেকে ৪০টি পয়েন্টে আইপিএলকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসেছে। গত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও এই আসর বসেছিল। আবার ২-৩ বছর ধরেই এসব জুয়ার আসর বসছে। টাকা হেরে অনেকে নিজের সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসছেন। গত বছর আইপিএলের সময় জুয়ায় এক রাতে ২০ লাখ টাকা হেরে ওই রাতেই কিটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছিলেন এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
আইপিএলকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে প্রতিদিন জুয়ার আসর বসছে। টেলিভিশনের সামনে বসে লোকজন লাখ লাখ টাকা বাজি ধরছে। ব্যবসায়ী, তরুণ থেকে শুরু করে ছাত্ররাও আইপিএল-জুয়ায় যুক্ত হচ্ছে। ভৈরবের সমাজ ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জনপ্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রশাসন জুয়াড়ি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএল থেকে ক্রিকেটকে ঘিরে ভৈরবে জুয়ার আধিক্য বাড়ে। আইপিএলে প্রসার পায়। খেলাকে ঘিরে অঞ্চলভিত্তিক জুয়াড়ি চক্র সক্রিয় আছে। তারা দিনের শুরু থেকে ম্যাচ শুরুর আগ পর্যন্ত দর্শকদের কাছে যায়। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে। আগ্রহী ব্যক্তিরা পছন্দমতো খেলায় বাজি ধরে।
আজকের ম্যাচে জিতবে কোন দল? ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার যাবে কার হাতে? সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হবে কোন খেলোয়াড়? চার, ছক্কা হবে কয়টি? এসব প্রশ্নের ওপর বাজি ধরা হয়। এ ছাড়া খেলা চলাকালে ওভারে ওভারে বাজি চলে। পাড়ার ক্লাব, দোকানঘরগুলোতে বিকেলের পর থেকে জুয়ার এই আসর বসে।
ভৈরব চন্ডিবেরের একজন ক্রীড়া সংগঠক এ কে এম বজলুল হক এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, খেলাধুলা মানুষের বিনোদনের অংশ। খেলা নিয়ে জুয়া হলে সমাজে ও মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভৈরবে আইপিএলকে কেন্দ্র করে যে জুয়া চলে, এই জুয়া সারাদেশেই চলছে। আসলে এখন দেশজুড়ে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে না, হচ্ছে জুয়া খেলা। এই জুয়া খেলা এখনই বন্ধ করা উচিত। আইপিএল ও বিপিএল থেকে জুয়া বন্ধ না হলে ক্রিকেট জুয়ায় সর্বস্ব হারাবে দেশের যুবসমাজ।