অর্থনীতি

এডিবির পূর্বাভাস : চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলে ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। গত দুই অর্থবছরের ন্যায় চলতি অর্থবছর (২০১৭-২০১৮) শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হবে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি। সংস্থাটির নিয়মিত প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ১১ এপ্রিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এডিবি কার্যালয়ে আউটলুক প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
এডিবি তার প্রতিবেদনে বলেছে, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। যদিও সরকারি হিসাবে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির এ হার হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রশ্ন তুললেও এডিবি বলছে, তথ্য-উপাত্তের পার্থক্যের কারণে পরিসংখ্যান ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এটাই বড় কথা। পরপর ৩ বছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এরই প্রমাণ। একই দিন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিশ্বব্যাংক বা এডিবি কেউই আমাদের প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রত্যাখ্যান করেনি, কিছু প্রশ্ন তুলেছে। আমরা একে স্বাগত জানাই। প্রশ্নগুলোর উত্তরও আমাদের কাছে আছে। তারা চাইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখতে পারে। মন্ত্রী আরও বলেন, রক্ষণশীল পদ্ধতিতে ৯ মাসের হিসাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থনীতির সব সূচক ভালো অবস্থানে আছে। অর্থবছর শেষে ১২ মাসের হিসাবে চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
এডিবির সংবাদ সম্মেলনে আউটলুকের বাংলাদেশ বিষয়ক মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থাটির ইকোনমিস্ট সুন চ্যান হং। এ সময় এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে মনমোহন প্রকাশ স্বল্পোন্নত দেশের এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণে প্রাথমিক মূল্যায়নে যোগ্যতা অর্জন করায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যারা এলডিসি থেকে উত্তরণের ৩টি শর্তই পূরণ করতে পেরেছে। এমনকি বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিও শক্ত অবস্থানে। রাজস্ব ঘাটতিও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। তবে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। পোশাক শিল্পের বৈচিত্র্য ও শ্রমঘন শিল্প খাতে গুরুত্ব দেয়া হলে আগামীতে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। তাছাড়া আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চলতি অর্থবছর কৃষি খাতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে ধারণা দিয়েছে এডিবি। গত বছর ৩ খাতে পূর্বাভাস ছিল ৩ শতাংশ। এবার শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। রপ্তানি বেড়ে যাওয়ার কারণে শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সেবা খাতে এ সময়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
এডিবি বলছে, রপ্তানি সম্প্রসারণের গতি কমে আসার পাশাপাশি রেমিট্যান্সে নিম্নগতি সত্ত্বেও গত অর্থবছর প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রবণতাও কমেছে। তবে চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছর কৃষি ও সেবা খাতে ধীরগতি সত্ত্বেও অর্থনীতির ভালো প্রবৃদ্ধি হবে। তবে এ সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি আরও বাড়বে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে এডিবি। এডিবির মতে, চলতি অর্থবছরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা গত অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তেল ও অন্য নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাবে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের সমন্বয় করা এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে।
চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আহরণে ৩১ দশমিক ৮০ শতাংশ ও ব্যয়ে ২৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল। উন্নয়ন খাতে ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়তি ব্যয় ধরায় পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রামপাল ও মাতারবাড়ির মতো মেগা প্রকল্পে গতি আসার সম্ভাবনা ছিল। রাজস্ব আয় জিডিপির ১৩ শতাংশ ও সরকারি ব্যয় জিডিপির ১৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। আয় ও ব্যয় বৃদ্ধিও বিশাল লক্ষ্যমাত্রা আদায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রত্যাশিত হারে আয় ও ব্যয় না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯০ দেশের মধ্যে ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭তম। দেশের সম্ভাবনাকে উন্নয়নে রূপান্তর করতে বাংলাদেশে ব্যবসার উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এখানে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের ঘাটতি আছে। বিদ্যুৎ, সড়ক ও রেলওয়ের মতো অবকাঠামোতে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। বর্তমানে দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ৩ শতাংশ। উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে তা ৬ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। দেশের কর কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। বাড়তি রাজস্ব আহরণে ভ্যাট আইন কার্যকর করতে হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিবেচনায় আমদানি শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার চেয়েছে এডিবি।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধির হিসাব ছাড়াও বিশ^ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির ব্যাপক প্রশংসা করেছে। অর্থনীতির উন্নতির জন্য তারা বেশ কিছু সুপারিশও করেছে, যেগুলোর বেশিরভাগের সঙ্গে আমিও একমত। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) পর্যন্ত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) বাস্তবায়িত হয়েছে ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করেছে ৭১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। ওই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। তাই আশা করছি, চলতি অর্থবছর শেষে শতভাগ সংশোধিত এডিপিই বাস্তবায়ন হবে।