কলাম

কোরআন সুন্নাহর আলোকে বিশ্বনবীর ঈদে মি’রাজুন্নবী

মুহাম্মদ আবু তাহের মীর্জা
সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী আল্লাহতায়ালার প্রিয় হাবিব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির মধ্যে মি’রাজ একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা। আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে এক রাতে মক্কা শরিফ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস, সেখান থেকে ঊর্ধ্ব জগতে ভ্রমণ করান এবং সে রাতেই পুনরায় মক্কা শরিফে পৌঁছান। এ ভ্রমণকে ইসরা ও মি’রাজ নামে অভিহিত করা হয়।
কোরআন ও হাদিস শরিফে মি’রাজ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর এ ভ্রমণ কাহিনি নিজ জবান মুবারকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন, যা নিম্নে বিষয় ভিত্তিক উল্লেখ করা হলো :
আকাশ পানে বিশ্বনবী (সা.) প্রথম সফর বায়তুল মুকাদ্দাস। বায়তুল মা’মুর দর্শন। সিদরাতুল মুনতাহা গমন। মি’রাজ রাতে নামাজ উপহার। নামাজ ছাড়াও অন্য উপহার গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর দিদার লাভ করেন। মি’রাজের রাতে হযরত মূসা (আ.)’কে নামাজরত অবস্থায় দর্শন। কুরাইশদের অবিশ্বাসের কারণে আল্লাহ রাসূলের (সা.) সামনে বায়তুল মুকাদ্দাস হাজির করান। মে’রাজ রাতে যাত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ এবং এক পাদ্রির সাক্ষ্য প্রদান।
ভ্রমণের পথে কুরাইশের এক কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ ঘটে, অগ্নির কাঁচি দিয়ে ওষ্ঠ কর্তন। সুদখোরদের পরিণাম দর্শন। শিঙ্গা লাগানোর ব্যাপারে ফেরেস্তাগণের অনুরোধ। আল্লাহ্র পথে জীবনোৎসর্গকারীদের প্রতিদান। পাথর দ্বারা কতিপয় লোকের মাথা পেষণ।
জাকাত আদায় না করার পরিণাম দর্শন। দুর্গন্ধযুক্ত গোশত ভক্ষণকারী দর্শন, কাষ্ঠের ভারী বোঝা বহনকারী দর্শন। একটি ষাঁড়ের ছোট ছিদ্রের মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা দর্শন। জান্নাতের সুবাস গ্রহণ। জাহান্নামের আওয়াজ শ্রবণ। শয়তানের পশ্চাদ্বাবন দর্শন। বু’রাকের পরিচয় লাভ। বুরাকের বুদ্ধত আচরণের কারণ জানা। বিশ্বনবী (সা.)-এর সফর সাথী ছিলেন হযরত জিবরাইল (আ.)। জাহান্নাম দর্শন ও জাহান্নামের প্রহরীর (আবদুল মালেক) সাথে সাক্ষাৎ হয়। ৩টি স্থানে প্রিয়নবী যাত্রাবিরতি ও নামাজ আদায় করেন। বাবুল হেফজ দর্শন।
আকাশের প্রহরীগণের সাথে হযরত জিবরাঈলের (আ.) সওয়াল জওয়াবের কারণ ও নিজ নয়নে দর্শন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দুধ, মধু ও শরবত উপস্থিত করা হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু দুধ পান করেন। সিদরাতুল মুনতাহা প্রদর্শনে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অভ্যর্থনা প্রদান করা হয়। জান্নাতে প্রবেশ এবং হাউজে কাওসারে নবীগণের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ। মি’রাজ আত্মিক ছিল না, ছিল শারীরিক। নবীগণের (আ.) সাথে সাক্ষাৎ-এর ধারাবাহিকতা ও তাৎপর্য।
শায়খ ইবনে আবি যামরার অভিমত শ্রবণ অবগত ৫ ওয়াক্ত নামাজে রাজি থাকায় জমজমের পানি দ্বারা পবিত্র নবীজির আত্মা পরিশুদ্ধ করে আল্লাহ্র যিকির করা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে যত ঘটনা ঘটেছে এবং আল্লাহ পাকের যাবতীয় আদেশ-নিষেধ করণীয় ও বর্জনীয় সব কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা দানের জন্য আল্লাহ মি’রাজের আয়োজন করেছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর, সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে বড় অহংকার বিশ্ব মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়ার একমাত্র সোপান হলো মি’রাজ। এতে ইহলোক ও পরলোকের বাস্তব দৃশ্যাবলি ও আল্লাহর প্রচারিত ধর্ম ইসলামের মৌলিক বিষয়াদিকে বাস্তবতার নিরিখে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার জন্য আল্লাহ পাকের তরফ হতে মি’রাজ এক অপূর্ব ফয়েজ ও নেয়ামত।
কঠিন পরীক্ষার ফল হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগ্রামমুখর জীবনের মোড় পরিবর্তন বা টার্নিং পয়েন্টে এসে মি’রাজ সংঘটিত হয়। কারণ নবী করীম (সা.) মক্কা জীবনের শেষের দিকে নিতান্তই অসহায়ত্বের মাঝে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় তায়েফবাসীকে হেদায়েতের জন্য তিনি যায়েদকে নিয়ে তায়েফ গমন করেন। তায়েফবাসী তাঁকে ভালোভাবে গ্রহণ না করে তাঁর হেদায়েতের বাণী না শুনে বরং তাঁকে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ ও নির্যাতন করে তাড়িয়ে দেন। চাচা আবু তালিব ও সহধর্মিণী বিবি খাদিজাতুল কুবরার ইন্তেকালে এবং প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রক্তাক্ত ও অবসন্ন দেহে তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে আসেন এবং ফেরার পথে তিনি এক বাগানে বিশ্রাম করেন, কান্নায় ভেঙে পড়েন ও আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন, ‘ইয়া আল্লাহ্! আমি নিঃসঙ্গ অবস্থায় আপনার কাছে একান্তে আমার এ কষ্টের কথা বলছি। আপনি অতিশয় দয়ালু ও উত্তম রক্ষক। আমাকে সাহস দিন; আমার উম্মতদের ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে পরম সম্মানিত ও আশ্বস্ত করার মানসেই অনতিবিলম্বে মি’রাজ পুরস্কারস্বরূপ আয়োজন করেন। তায়েফ থেকে ফিরে এসে তিনি নবুয়তের দশম বছর ২৭ রজব কা’বা শরিফের চত্বরে বা হাতিমে মতান্তরে চাচা আবু তালিবের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে আবু তালিব কন্যা উম্মে হানির ঘরে মাদুরে শুয়ে পড়লেন। গভীর রাতে হঠাৎ উম্মে হানির ঘরের ছাদ ফেটে গেল। হযরত জিব্রাইল (আ.) ঘরে প্রবেশ করে মহানবীকে কা’বার হাতিমে নিয়ে গেলেন এবং বক্ষ বিদারণ করলেন এবং জমজমের পানিতে ধৌত করলেন।
অতঃপর হযরত জিব্রাইল (আ.)-এর বোরাক নামের একটি অদ্ভুত জ্যোতির্ময় বাহনে চড়ার ইঙ্গিত পেয়ে বোরাকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি কুদরতি সিঁড়ি বা সোপানে চড়ে আসমানের প্রবেশদ্বারে এসে উপনীত হলেন। এভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তমাকাশে প্রবেশ করে যথাক্রমে হযরত আদম (আ.), হযরত ঈসা (আ.), হযরত ইয়াহিয়া (আ.), হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত ইদ্রিস (আ.), হযরত হারুন (আ.), হযরত মূসা (আ.), হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে দেখতে পান এবং সালাম বিনিময় করেন। তারপর তিনি আরো ঊর্ধ্বে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উপনীত হন। এটি ঊর্ধ্বলোকের শেষ সীমানা।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল মামুরে ফেরেশতাদের নিয়ে প্রবেশের পর স্বয়ং ইমামতির মাধ্যমে নামাজ আদায় করেন। মি’রাজ থেকে ফেরার সময় আসমানের ওপর কালো ধোঁয়া উঠতে দেখেন। এখানে আল্লাহ তাঁকে ৩টি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উপাধিতে ভূষিত করেন : ১. সাইয়িদুল মুরসালিন অর্থাৎ নবীকুল শ্রেষ্ঠ। ২. ইমামুল মুত্তাকিন অর্থাৎ খোদাভীরুদের নেতা। এবং ৩. রাহমাতুল্লিল আলামিন অর্থাৎ বিশ্ব করুণা। উল্লেখ্য, ইতঃপূর্বে এ উপাধি অন্য কোনো নবী-রাসূল পাননি।