রাজনীতি

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ আওয়ামী লীগ-বিএনপি

বিশেষ প্রতিবেদক
আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আগামী ১৫ মে প্রথম ধাপের গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হতে দুই দলই মরিয়া। অনেক দিন পর নৌকা ও ধানের শীষের এই লড়াইকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে জমজমাট আলোচনা। উভয় পক্ষই অগ্নিপরীক্ষা দিতে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জয়ী হয়ে উভয় দলই নিজেদের পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিতে চায়। দুই দলই মনে করে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থীকে তারা মনোনয়ন দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ বেশি। কারণ সরকারকে একদিকে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজন প্রমাণ করতে হবে অপরদিকে নৌকার জয়ও ঘরে তুলতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই সিটিতে যে দল বিজয়ী হবে সে দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে।
খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার কৌশল নির্ধারণে নেমে পড়েছেন দুই দলের নীতিনির্ধারকরা। আওয়ামী লীগ বর্তমান সরকারের ব্যাপক সফলতা জনগণের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের দিকেই বেশি জোর দিচ্ছে। অনেকটা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই অতীতে এ দুটি সিটিতে পরাজয় হয় আওয়ামী লীগের।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলের জন্য ত্যাগ, অবদান, জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতাসহ সবকিছু বিবেচনা করেই প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সবাইকে এক হয়ে তার জন্য কাজ করতে হবে। কেউ বিরোধিতা বা অসহযোগিতা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অপরদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দুই সিটি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়াকে চেয়ারপারসনের কারামুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরিপূরক হিসেবে দেখছে বিএনপি। তাদের মতে, গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনে জয় মানে আন্দোলনেরও জয়। এ জয়ের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি আরো বেগবান হবে।
খুলনা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রে যে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে তাতে তালুকদার আবদুল খালেক ছাড়াও সদর আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজান, কাজী এনায়েত হোসেন, শেখ সৈয়দ আলী, সাইফুল ইসলামসহ ৯ জনের নাম ছিল। আর এই ৯ জনের তালিকা থেকে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ করে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে তালুকদার আবদুল খালেককে মনোনয়ন প্রদান করে।
এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেলসহ ১০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য আবেদনপত্র সংগ্রহ করেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘সবুজ সংকেত’ পেয়ে কয়েক মাস আগে থেকেই মাঠে নামেন জাহাঙ্গীর আলম। তবে আজমত উল্লাহ খানও মাঠে থাকেন। গাজীপুর মহানগর এলাকায় মনোনয়ন প্রত্যাশী এই দুই নেতা পোস্টারে পোস্টারে দেয়াল ছেয়ে ফেললেও গাজীপুর থেকে মেয়রের মনোনয়ন পান জাহাঙ্গীর আলম। ধারণা করা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
অন্যদিকে মেয়র পদে ধানের শীষ প্রতীকের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন গাজীপুরে ৭ জন ও খুলনায় ৩ জন। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে দলটির মনোনয়ন বোর্ড। দলীয় সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম জমা দেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও গাজীপুর সিটির বর্তমান মেয়র এম এ মান্নান, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসানউদ্দিন সরকার, শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকার, মেয়র মান্নানের ছেলে এম মঞ্জুরুল কবির প্রমুখ। গাজীপুর থেকে বিএনপির পক্ষে মনোনয়ন পান জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসানউদ্দিন সরকার। খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম জমা দেন বর্তমান মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম। খুলনা থেকে বিএনপির পক্ষে মনোনয়ন পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। জানা গেছে, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট দুই সিটিতে দলীয় প্রার্থীদের জয়ের মুখ দেখাতে এই নির্বাচনকে রীতিমতো বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবে দেখছে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরপরই বিএনপি নেতারা জোরেশোরে মাঠে নেমে পড়েছেন।
গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন যথাক্রমে জাহাঙ্গীর আলম ও তালুকদার আব্দুল খালেক। জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, অন্যদিকে খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন তালুকদার আব্দুল খালেক। ৮ এপ্রিল গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় তাদের মনোনয়ন দেয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল ভেদাভেদ ভুলে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করার নির্দেশ দেন। এছাড়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দলের নির্দেশ অমান্যকারীদের এবার আর কোনো ছাড় নয়। যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে গাজীপুরে হাসান উদ্দিন সরকার এবং খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান সরকার এবং খুলনায় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দুই দলের মেয়র প্রার্থীরা এখন ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিজয়ী হলে আধুনিক নগর উপহার দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। নৌকা ও ধানের শীষের এমন জমজমাট প্রচারণায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও চলছে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। নির্বাচন নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা ক্রমেই বাড়ছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ১৫ ও ১৬ এপ্রিল যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৩ এপ্রিল।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন নিয়ে দুই দলেই অসন্তোষ বিরাজ করছে। শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় দলের সব নেতাকর্মী নামবেন কি নাÑ এ নিয়ে এখনও সংশয় রয়েই গেছে। তবে প্রার্থীদের আশা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় কেউ বিরোধিতা করতে পারবেন না। এদিকে গাজীপুরে বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান আছে। তবে গত নির্বাচনে এখানে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছিল বিএনপি। এক্ষেত্রে নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলকে দায়ী করা হয়। তাই এবার দলীয় কোন্দল নিরসনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকা- জনগণের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচনে এগিয়ে থাকবেন। এক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীরা কিছুটা হলেও বেকায়দায় রয়েছেন। তাছাড়া দুর্নীতির দায়ে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার কারাভোগ এবং দলের দ্বিতীয় শীর্ষ প্রধান তারেক রহমানের লন্ডনে পলাতক জীবনযাপন নির্বাচনে বিএনপির জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।