আন্তর্জাতিক

ঘরে-বাইরে নানামুখী সংকটে ডোনাল্ড ট্রাম্প

স্বদেশ খবর ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হু কেয়ারস মুড এখন আলোচনার তুঙ্গে। দেশে এবং দেশের বাইরে যাকেই বৈরী মনে হচ্ছে তার বিরুদ্ধেই অধৈর্য হয়ে সপাটে চড় কষিয়ে চলেছেন তিনি। ফলে ক্রমান্বয়ে অস্থিরতা বাড়ছে ওয়াশিংটনে। সিরিয়া প্রসঙ্গে সোচ্চার হওয়ার আগেই ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্য লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছেন। চীন থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক বসিয়ে এই সংকটের সূচনা ট্রাম্পই করেন। পরে চীনও এর পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি-ধমকি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর রেশ গিয়ে পড়ছে চীন ও আমেরিকাপন্থি শিবিরেও।
ট্রাম্প চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৬ হাজার কোটি ডলার শুল্ক আরোপ করেছেন। হোয়াইট হাউজ থেকে বলা হয়েছেÑ চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত অর্থনীতির তরফ থেকে অসম প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করার জন্যই এটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এর জবাবে চীন ৩ হাজার কোটি ডলার মূল্যের ১২৮টি মার্কিন পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। মার্কিন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে ট্রাম্পের সহকর্মীরা বৈঠকের পর বৈঠকে মিলিত হয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে, এমন পদক্ষেপের জন্য যথেষ্ট মূল্য দিতে হতে পারে। এতে মার্কিন শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেয়ারবাজারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তারা ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগে মার্চ মাসেই তিনি অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাতের ওপর যে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছিলেন তার জবাবে ইউরোপীয় মিত্ররাও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি নেয় এবং পরিণতিতে হোয়াইট হাউজের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন।
গত ১৩ মার্চ ট্রাম্প এক টুইট বার্তার মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে বরখাস্ত করেন এবং উগ্রপন্থি সিআইএ প্রধান মাইক পোম্পিওকে তার স্থ’লাভিষিক্ত করেন। এর তিনদিন পর ট্রাম্পের তাড়নায় উৎসাহিত হয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেসশন্স এফবিআইএ’র ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু ম্যাকেরকে বরখাস্ত করেন। ব্যুরোর তরফ থেকে এই অ্যান্ড্রুই রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারের সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত করেছিলেন। ট্রাম্পের পরবর্তী টুইটগুলোতে বিশেষ কৌঁসুলি বরার্ট মুয়েলারকে প্রথমবারের মতো স্বনামে সমালোচনা করা হয়। তা থেকে এমন আশঙ্কার সৃষ্টি হয় যে প্রেসিডেন্ট তাকে বরখাস্ত করতে পারেন। যার পরিণতিতে এক সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে দারুণ প্রভাব ফেলার মতো নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ এবং উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের রদবদল এই দুইয়ের মিশ্রণের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরে। সেখানে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার এক কালো ছায়া বিস্তার করেছে। হোয়াইট হাউজ স্টাফদের ভয় কখন কার চাকরি যায়। পরবর্তী ই-মেইল বা ফোন কলটাই হয়ত জানিয়ে দেবে যে, কাউকে না কাউকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ সাংবাদিকদের পর্যন্ত জিজ্ঞেস করছে যে, স্টাফ পরিবর্তনের যেসব গুজব শোনা যাচ্ছে সেগুলো সত্য কি না। হোয়াইট হাউজের কর্মীরা ধারণা করছেন, যারা সরকার চালাচ্ছেন তাদের চেয়ে সাংবাদিকরা এ সম্পর্কে ভালো জানতে পারেন। ট্রাম্পের নিজস্ব এইডরা পর্যন্ত আশঙ্কা করছেন যে, ট্রাম্পের কা-কারখানা দেশে ও বিদেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
হোয়াইট হাউজ থেকে প্রথম বেরিয়ে গেছেন চিফ অব স্টাফ রেইনস প্রাইবাস এবং সেই সঙ্গে তার বেশ কয়েকজন সহকর্মী। ট্রাম্পের বরখাস্তের সিদ্ধান্তের মধ্যে এ পর্যন্ত সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত হলো টিলারসনকে বিদায় দেয়া। অন্যরা হয় কেলেঙ্কারির বোঝা মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন নয়ত ট্রাম্পের হুকুম তামিলকারী চিফ অব স্টাফ অবসরপ্রাপ্ত মেরিন জেনারেল জন কেলি তাদের বিদায় দিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের স্টাফ সেক্রেটারি রব পর্টার তার প্রাক্তন স্ত্রীদের মারধর করতেন এটা জনসমক্ষে জানাজানি হওয়ার পর তাকে বের করে দেয়া হয়। এরপর বিদায় নেন ট্রাম্পের শীর্ষ মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট হোপ হিকস। ট্রাম্পের ওপর তার যথেষ্ট প্রভাব ছিল এবং হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছিলেন যে তার বিদায়ে ট্রাম্প অসুবিধায় পড়বেন। শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গ্যারি কোহেন ধাতব পদার্থের ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে হোয়াইট হাউজের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর পদত্যাগ করেন। ১৯ মার্চ প্রেসিডেন্ট তার আইনি টিমকে ঢেলে সাজিয়ে ওয়াশিংটনের সুপরিচিত আইনজীবী জোসেফ ডি জেনোভাকে টিমে যুক্ত করেন। এই জেনোভাই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য এফবিআই ও বিচার বিভাগকে অভিযুক্ত করেছিলেন।
প্রশাসন কর্মকর্তাদের ধারণা সামনে আরও পদত্যাগ ও বহিষ্কারের ঘটনা আসছে। অবশিষ্ট যেসব উপদেষ্টা আছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুজন কেলি এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচআর ম্যাকমাস্টারও শিগগিরই ট্রাম্পকে ছেড়ে যাবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিক পার্টির প্রভাবশালী নেতা ও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ান সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সহকারী উপদেষ্টা নাদিয়া স্কাডলো পদত্যাগ করেছেন। নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে জন বল্টনকে দায়িত্ব দেয়ার ২ দিনের মাথায় স্কাডলো পদত্যাগ করেন। অবশ্য এর আগে ৯ এপ্রিল পদত্যাগের ঘোষণা দেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র মাইকেল অ্যান্টন। এতে ট্রাম্প মঞ্চে অনেকটা একাকী হয়ে পড়বেন। এদিকে রেক্স টিলারসন সরে যাওয়ার প্রায় ১ মাস ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াই চলতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। কিন্তু দেশ পরিচালনায় নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে অধিকতর আস্থাবান ট্রাম্প নিজের চারপাশে তার পছন্দের লোকদের রাখতে চান। আর পছন্দের লোকজন বলতে টেলিভিশনে তিনি যেসব লোকদের দেখতে পছন্দ করেন। কোহেনের শূন্যস্থান পূরণের জন্য তিনি তার শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়ে এসেছেন ল্যারি কাডলোকে যিনি এক সময় ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের জুনিয়র এইড এবং সিএনবিসির নিয়মিত অনুষ্ঠান শিল্পী। তিনি ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসে প্রাক্তন শিল্পী হিদার নুয়াটকে পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ পাবলিক ডিপ্লোমেসির পদে নিযুক্ত করেছেন। সমস্যাকবলিত ভেটারান অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব দেয়ার জন্য ফক্সের আরেক কনট্রিবিউটর পিট হেগসেথের ওপরও তার দৃষ্টি রয়েছে। এসব কা-কারখানা ঘটিয়ে ট্রাম্প তার বন্ধুদেরই শুধু যে আহত করছেন তা নয়, উপরন্তু আমেরিকার মিত্রদেরও ক্ষুব্ধ করছেন এবং শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছেন। সম্ভবত তিনি কারোর কথাই শুনছেন না এবং নিজেই যা ভালো মনে করছেন তা করে ছাড়ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন এ ধরনের যাকে-তাকে যখন-তখন বহিষ্কারের ফলে এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘরে-বাইরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে। এর ঢেউ যুক্তরাষ্ট্র পেরিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। আর ট্রাম্পের এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয় বরং সারা বিশ্বই এখন শঙ্কিত-আতঙ্কিত।