প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

জাতীয় এসএমই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করতে হবে

হাফিজ আহমেদ :
ষষ্ঠ জাতীয় এসএমই মেলা-২০১৮ ইতোমধ্যে সুসম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই এসএমই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এসএমই ফাউন্ডেশন এবং এফবিসিসিআই যৌথভাবে ৩ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় ৫ দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজক। অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সভাপতিত্ব করেন। এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, শিল্প সচিব মো. আব্দুল্লাহ এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন কে এম হাবিবুল্লাহ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সফল এসএমই উদ্যোক্তাদের মাঝে পুরস্কারও বিতরণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক, উন্নয়নসহযোগী সংস্থার সদস্য এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মেলা উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেয়া ভাষণে বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এ জন্য তাঁর সরকার দেশের সকল জেলা-উপজেলায় এসএমই পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করবে। যেগুলো এসএমই শিল্পের প্রসারে উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিসের সেবা প্রদান করবে। উদ্যোক্তাগণ ব্যবসা স্থাপন থেকে শুরু করে ব্যবসা সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সহায়তা, পরামর্শক সেবা ইত্যাদি এই ওয়ানস্টপ সেন্টার থেকে গ্রহণ করতে পারবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগীয় শহরে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে।’ শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় ৬ষ্ঠ জাতীয় এসএমই মেলা-২০১৮’র উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির লিখিত ভাষণে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শারীরিক অসুস্থতার দরুন তাঁর নির্ধারিত ভাষণ প্রদান করেননি। এর পরিবর্তে তাঁর ভাষণের লিখিত কপি অনুষ্ঠানে বিতরণ করা হয়।
বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে এসএমই’র গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসএমই সবচেয়ে শ্রমঘন ও স্বল্পপুঁজিনির্ভর খাত হওয়ায়, এই খাতের মাধ্যমে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে অধিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের অন্তর্ভুক্ত। তাই জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসএমই খাত যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষার মাধ্যমে দেশের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর সরকার ‘জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬’-তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শিল্প উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গণ্য করেছে। তাঁর সরকারের গৃহীত কর্মসূচির ফলে দেশব্যাপী টেকসই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের দ্রুত প্রসার ঘটছে। উদ্যোক্তাবান্ধব নীতির কারণে প্রতিনিয়ত নারীরা ব্যবসাবাণিজ্যে মনোনিবেশ করছেন। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নসহ আর্থসামাজিক অগ্রগতির অনেক সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিই, তখন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। অনেক দেশ বিশ্বমন্দার অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু আমরা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে এখন বাংলাদেশ মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে উন্নীত। বর্তমানে ১৯৯টি দেশে ৭৫০টি পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানির হার বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সারাদেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠন করা হয়েছে। ইকোনমিক জোনসমূহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
বাংলাদেশে কুটির শিল্পের সুদীর্ঘ গৌরবের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামদানি, নকশিকাঁথা এবং সিলেটের শীতল পাটি ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। উদ্যোক্তাগণ এ সকল পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে পারেন। উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্পায়নের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক কাঁচামালের সহজলভ্যতা বিবেচনা করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকার উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদান করবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পণ্যের বাজার অনুসন্ধান এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী সেসব পণ্য উৎপাদন করতে হবে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পণ্যের ওপর রপ্তানি নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের এখন রপ্তানি বহুমুখীকরণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ জন্য বর্তমান সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এসএমই খাতের সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের খ-চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকার নিজেরা ব্যবসা করে না; সরকার কেবল সহায়কের ভূমিকা পালন করে। ফলে আজ দেশে বেসরকারি খাত ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। সারাদেশ থেকে বাছাইকৃত ২৬৭টি এসএমই প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এ মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিভিন্ন দেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি আয়ত্তকরণ এবং পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
এসএমই মেলা দেশে উৎপাদিত এসএমই পণ্যের পরিচিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রেতা আকর্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। এ ধরনের মেলা আয়োজনের মাধ্যমে এসএমই খাতের অনেক সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হবে এবং যথাযথ স্বীকৃতি পাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।