প্রতিবেদন

জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ উদ্বোধন করলেন শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ১টি করে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৯টি স্থানে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ৯টি জেলা-উপজেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রাথমিকভাবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঝালকাঠি, খুলনা, বগুড়া, নোয়াখালী এবং রংপুরে এই মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব আনিসুর রহমান প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ প্রান্ত থেকে এবং বাংলাদেশ ইমাম সমিতির সভাপতি কাজী শাকের আহমেদ চট্টগ্রাম প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বক্তৃতা করেন। ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেয়া ভাষণে ইসলামকে শান্তির ধর্ম উল্লেখ করে বলেন, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের কাছে তুলে ধরতেই তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম। এই শান্তি যেন বজায় থাকে সেইদিকে আমরা লক্ষ্য রাখছি।’
এদেশে সকল ধর্মের মানুষ বাস করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের মানুষই এদেশে স্বাধীনভাবে তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। এটাই ছিল জাতির পিতার চেতনা এবং চিন্তা। তাই তিনি বলেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। যেটা ইসলামেরও মূল কথা। কারণ ইসলাম ধর্ম সকল ধর্মকে সম্মান করে। বাংলাদেশ সেভাবেই একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠবে, আমরা সেটাই চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম প্রচার ও প্রসারের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই ধর্মের প্রচার ও প্রসারে জাতির পিতা আরো অনেক কাজ করে দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ইসলামের নাম নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেয়া এবং নিরীহ মানুষ হত্যা করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের এই পবিত্র ধর্মের সুনাম নষ্ট করা হচ্ছে। আমরা চাই ধর্মের মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে জাতির পিতা আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু এই দেশটা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সেই লক্ষ্যে গড়ে তুলতে সে পথে যাত্রাও শুরু করেছিলেন; কিন্তু তা আর সম্পন্ন করতে পারেননি। কারণ ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর এরপরই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা যেন মানুষ পায় এবং ইসলামি সংস্কৃতি মানুষ যেন ভালোভাবে রপ্ত করতে পারে, চর্চা করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিটি জেলায়-উপজেলায় আমরা ৫৬০টি মডেল মসজিদ তৈরি করে দেব। যেখানে সত্যিকারভাবে ইসলাম ধর্মের চর্চা হবে। উল্লেখ্য, জেলা লেভেলে নির্মিত প্রতিটি মডেল মসজিদে ১২০০ মুসল্লির একত্রে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং উপজেলা লেভেলে ৮০০ মুসল্লির একত্রে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। এসব মডেল মসজিদে নারী-পুরুষের নামাজের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। মডেল মসজিদ ক্যাম্পাসের মধ্যে আরো থাকবে ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি, পড়ার রুম, ইসলামিক বই বিক্রয় কেন্দ্র, গেস্ট রুম, ডেড বডি ওয়াশ রুম, মক্তব ও হেফজখানা, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ট্রেনিং সেন্টার, রিসার্চ অ্যান্ড অটিজম কর্নার, ই-সার্ভিস সেন্টার, সঠিক উচ্চারণে কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রসহ পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে বেতারে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ইনসাফের ইসলামে বিশ্বাসী। আমাদের ইসলাম হযরত নবী করিম (সা.)-এর ইসলাম। যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছেÑ ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।’ আমরা সেটাই বিশ্বাস করি এবং আমাদের ধর্মের সেই মর্যাদা সমুন্নত থাকবে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদক থাকবে না। প্রতিটি মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে। তাদের আর্থসামাজিক উন্নতি হবে এবং বাংলাদেশ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠবে।
দেশ যেন সব দিক থেকে উন্নত হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সেই প্রার্থনা করে শেখ হাসিনা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করি আমাদের পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে মানুষ যেন জানতে পারে এবং ধর্ম পালনে আরো উৎসাহিত হতে পারে। তারা ধর্ম চর্চাটা যেন করে এবং বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর সরকারের উদ্যোগে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, আগে তাদের জন্য (ইমাম-মুয়াজ্জিনদের) কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমি প্রথমবার যখন প্রধানমন্ত্রী হই সেই সময় এই ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট ফান্ড করে দিই। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করারও আহ্বান জানান।