প্রতিবেদন

দৃশ্যমান হচ্ছে মেট্রোরেল : যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের প্রথম থেকেই প্রাধিকার হিসেবে বিবেচনায় নেয়। এরই অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ওঠে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। এই ফ্লাইওভারটি রাজধানী ঢাকার একাংশের দুর্বিষহ যানজট পরিস্থিতির অভাবনীয় অবসান ঘটায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে সড়কপথে সুদূর কাঁচপুরে যেতে সময় ১৫ মিনিটে নেমে আসে; যেখানে এই পথটুকু আগে অতিক্রম করতে সময় লাগত কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা। একইভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনা ও এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হাতিরঝিল প্রকল্প রাজধানী ঢাকার একাংশের যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কুড়িল ফ্লাইওভার ঢাকার আরেকটি অংশের যানজট পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি ঘটায়। বনানী ওভারপাস, বনানী-মিরপুর মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারও যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এতসবের পরেও রাজধানী ঢাকার যানজট পরিস্থিতির শতভাগ উন্নতির কথা বলা যাবে না। বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ের মতো রাজধানীর যানজটকেও জাদুঘরে পাঠানোর জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার হাতে নেয় কিছু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। এগুলো হলো মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। এই ৩টি প্রকল্পের প্রতিটিই ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প। সরকার আশা করছে ২০২৪ সালের মধ্যে এই ৩টি প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ হলে রাজধানী থেকে যানজট পুরোপুরি বিদায় নেবে।
যানজট নিরসনে সরকার যে বৃহৎ ৩টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে মেট্রোরেল। সেই স্বপ্নের পদ্মাসেতুর মতো মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বপ্নের এই প্রকল্পের প্রথম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে দুইটি পিলারকে যুক্ত করে এই স্প্যানটি বসানো হয়েছে। চলতি মাসেই আগারগাঁও এলাকায় বসানো হবে আরেকটি স্প্যান। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগেই মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পসমূহের একটি এই মেট্রোরেল প্রকল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানী ঢাকার চলমান যানজট নিরসন ও চলাচলে স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে হলে মেট্রোরেল স্থাপনের বিকল্প নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদও দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি রাজধানীর আশপাশের জেলাসমূহে দ্রুত গতিসম্পন্ন ট্রেন সার্ভিস চালুরও পরামর্শ দিয়ে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ মহল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের কাজ। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রকৌশলী ও কর্মীরা। এরই অংশ হিসেবে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় দুটি পিলারকে যুক্ত করে বসানো হয়েছে স্প্যান। এছাড়া মেট্রোরেল প্রকল্পের পুরো এলাকাতে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মোট ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ৭৭০টি স্প্যান বসবে। তবে প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আগারগাঁও পর্যন্ত চলাচলের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে চলছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ। শিগগিরই আগারগাঁও পয়েন্টে বসানো হবে দ্বিতীয় স্প্যান। বাকি অংশে সয়েল স্টেস্টের কাজ চলছে। পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর কাজও চলছে দ্রুত গতিতে। চলতি মাসেই স্প্যান বসানোর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। দুটি অংশে ভাগ করে মেট্রোরেলের কাজ চলছে। এর একটি ডিপো নির্মাণ এবং অন্যটি চলাচলের লাইন নির্মাণ। এরই মধ্যে আগারগাঁও পর্যন্ত পাইলিং শেষ হয়েছে। এখন মাটির ওপরের অংশে পিলার নির্মাণ করে তার ওপর বসানো হবে স্প্যানগুলো।
প্রায় ৫৯ একর জায়গার ওপর নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেলের মূল ডিপো। যেখান থেকে ৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড পর পর ছেড়ে যাবে ৬ জোড়া বগি নিয়ে বিদ্যুৎচালিত অত্যাধুনিক ট্রেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিপোর কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শাহজাহান স্বদেশ খবরকে বলেন, পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী উভয় দিক থেকে আসা যাওয়া করবে মেট্রোরেলে। আগামী বছর জাপানের গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাওয়াসাকি-মিৎসুবিশি থেকে কোচ আমদানি করা হবে। বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেনে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে দুটি বিদ্যুৎ প্ল্যান্টও নির্মাণ করা হচ্ছে। এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য কাজে লাগানো হবে বলে জানান প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শাহজাহান।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লাইওভারের চেয়ে মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পের বেশি সুফল পাবেন সাধারণ মানুষ। তাছাড়া যানজট এড়াতে মেট্রোরেলের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রকল্পটিই হবে যানজট নিরসনে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকার যানজটের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) অনুযায়ী প্রস্তাবিত সবকটি মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
রাজধানীর উত্তরায় দিয়াবাড়ি খালের দুপাশের জমিতে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণ করা হয়েছে। এখান থেকেই ২০১৯ সালে চলবে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। মাত্র ৩৭ মিনিটে পৌঁছে যাবে উত্তরা থেকে মতিঝিল। উত্তরা থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলের-৬ রুটের নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের সহায়তা হিসেবে জাইকা দেবে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ এলিভেটেড রুটের মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশন থাকবে। প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে ট্রেনগুলোর। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মেট্রোরেল রুট-৬ এর পাশাপাশি আরও দুটি রুট নির্মাণের প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল রুট-১ (এমআরটি-১) হচ্ছে গাজীপুর থেকে ঝিলমিল প্রকল্প পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রথম পর্যায়ে এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর এবং খিলক্ষেত হতে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটারের কাজ করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার হবে আন্ডারগ্রাউন্ড।
সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট বা মেট্রোরেল প্রকল্পটি জুন, ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালে। মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শুরু করে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর, কালশী মোড়, মিরপুর ১১ নম্বর, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকা, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা এবং আগারগাঁও এলাকা পর্যন্ত দিন-রাত কয়েকশ শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে কালশী মোড় ও আগারগাঁও মোড়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিশেষ করে আগারগাঁও এলাকায় মেট্রোরেলের একটি অবকাঠামো গড়ে উঠছে। সেখানে মেট্রোরেলের কাজে ব্যবহৃত বড় বড় ক্রেন, পাইলিং যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। কাজের সুবিধার্থে আগারগাঁও-এ নির্মাণ স্থাপনার পাশেই প্রকল্প অফিস তৈরি করা হয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক (ফ্যাসিলিটিজ অ্যান্ড অ্যাডমিনিসট্রেটিভ) হারুন-অর-রশিদ জানান, মেট্রোরেলের মূল পাইল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায়নি। অর্থাৎ প্রকল্পটির পূর্বের ব্যয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকাই আছে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিষেবা স্থানান্তর ও রিলোকেশনের কাজ গত বছর শেষ হয়েছে। এছাড়া আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্যাকেজ ০৫ এবং ০৬ এর পরিষেবা স্থানান্তর ও রিলোকেশনের কাজও চলমান রয়েছে। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নে টোকইউ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের সঙ্গে ডিএমটিসিএলের ৫৬৭ কোটি ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৪০৯ টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে স্যান্ড কম্পেকশন পাইল শতভাগ, ডাইনামিক কম্পেকশন পাইল ও প্রি ফেব্রিকেটেড ভার্টিকাল ড্রেনের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। এছাড়া মাটি ভরাটের কাজ ৭৫ ভাগ শেষ। ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত এই প্যাকেজের বাস্তব গড় অগ্রগতি ছিল ৮৪ শতাংশ। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী সুকুমার চন্দ্র কুমার জানান, সর্বশেষ তারা রুলিং স্টক (যে রেলগাড়িতে যাত্রী চড়বেন) তা ক্রয়ের জন্য একটি চুক্তি করেছেন। ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাপান থেকে এই রেলগাড়ি আনা হবে। আশা করা যাচ্ছে ২০১৯ সালের শেষের দিকে এই গাড়ি দেশে আসতে শুরু করবে। তবে ২৪টি ট্রেন একসঙ্গে আসবে না। প্রতিবার একসেট ট্রেন শিডিউল অনুযায়ী আনা হবে।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বহুল প্রত্যাশিত দেশের প্রথম মেট্রোরেল ‘ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট-এমআরটি, লাইন-৬’ ও ‘বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)’ নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মেট্রোরেল ও প্রথম বিআরটি নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, যেসব উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করে দেশের জনগণকে আমরা আরও সুন্দরভাবে চলাচলের সুযোগ করে দিতে সক্ষম হবো। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত সেই নির্মাণযজ্ঞই দেশজুড়ে চলছে। তাই দেশের অনেক সচেতন নাগরিকই এখন বলছেন এবং বিশ্বাস করেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন চলমান উন্নয়নের মহাসড়কে আধুনিক উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ এখন আর স্বপ্ন নয়; বরং বাস্তবতার দিকেই দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।