প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দেশজুড়ে সাড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ উদযাপন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতিতে বর্ষবরণে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
১৪২৪ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশ ছিল জাতিসংঘের লো ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি বা এলডিসিভুক্ত দেশ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘের উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত। বাংলা নববর্ষে বাঙালির উৎসবের লগ্নে জাতিসংঘ থেকে এসেছে এ আনন্দ ও সাফল্যের খবর। বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পর বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি বর্ষবরণে এবার এনেছে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে উচ্ছ্বসিত পুরো বাংলাদেশ। বর্ষবরণের আনন্দে উদ্বেলিত পুরো জাতি। এবারের বর্ষবরণে জাতি স্মরণ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশ জাতিসংঘের এলডিসিভুক্ত দেশের তালিকায় স্থান পায়। ৪৩ বছর পর জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন চলতি বছরে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পায়। একটি দেশের দুইটি বড় অর্জনই এসেছে জাতির পিতা ও তাঁর কন্যার হাত ধরে। সে হিসাবে এবারের বর্ষবরণে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মুখেই উচ্চারিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জয়গান। ১৪২৫ বঙ্গাব্দে জাতি সশ্রদ্ধ চিত্তে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জননী জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি, মঙ্গল শোভাযাত্রার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি গত ৩ বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পহেলা বৈশাখে উৎসব ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত বর্ষবরণের উৎসবকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। গত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো পহেলা বৈশাখের আগেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ ভাতা পান। সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তাদের কর্মীদের উৎসব ভাতা প্রদান করে। ধর্মান্ধরা বৈশাখী ভাতা প্রদানকে বাড়াবাড়ি বললেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে স্পষ্ট বলে দেন, বৈশাখ উদযাপনে কোনো ধর্মীয় বাধা-নিষেধ নেই। আবার এও বলেন, মুক্তচিন্তার নামে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া সম্পূর্ণ বিকৃত ও নোংরা রুচির পরিচায়ক। পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ খাওয়া নিয়ে বাড়াবাড়ি না করারও পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে অতীতের মতো এবার কোথাও ইলিশের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়নি।
বৈশাখে এসেছে জাগরণের ডাক
বাঙালির জীবনে ১ বৈশাখ ১৪২৫ সাল, ১৪ এপ্রিল ২০১৮ সালের ভোর এসেছে নতুন বারতা নিয়ে। সার্বজনীন উৎসবে মেতেছে বাঙালি। চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে ৩০ চৈত্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে সে উৎসবের সূচনা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ বরণের প্রাক্কালে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, সংস্কৃতি যত ছড়াবে মানুষের মন তত আনন্দিত হবে। সংস্কৃতির সঙ্গে সৌন্দর্যের একটি যোগসূত্র রয়েছে। আমরা যদি সেটাকে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে মানুষ হত্যা, জঙ্গিবাদ, অন্যায় ও প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে।
ছায়ানট এবার বৈশাখ বরণ করেছে বিশ্বায়নের বাস্তবতায় বাঙালির আত্মপরিচয়ের তালাশ নেয়ার আহ্বানে। আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে লালনের দর্শনের চেতনায় বাঙালির হৃদয়ে শুভবোধের জাগরণের প্রত্যাশা নিয়ে। সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, নারী-শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিÑপেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সতর্কতার কারণে সারাদেশে নির্বিঘেœ বাংলা নববর্ষের উৎসব-কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে।
চৈত্রের শেষ দিনে হালখাতা করে ব্যবসার হিসাব চুকানো বাংলার পুরনো রেওয়াজ। আর রবি ঠাকুরের গানের বাণীতে কণ্ঠ মিলিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির প্রত্যাশা থাকে, বৈশাখের রুদ্র ঝড় পুরনো বছরের আবর্জনা উড়িয়ে নেবে; গ্রীষ্মের অগ্নিস্নানে শুচি হবে বিশ্ব ধরা।
গেল বছরের রোহিঙ্গা সংকট নতুন বছরেও বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গী হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বানের বিপরীতে নারী ও শিশু নির্যাতন আর মৌলবাদের আস্ফালন এখনও বলে দিচ্ছে লালনের সোনার মানুষ হতে আরও অনেক পথ বাকি। আবার এ বছরই অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি এসেছে জাতিসংঘের কাছ থেকে, সাফল্য এসেছে আরও নানা পথে। এবারের বৈশাখী উৎসবে হয়েছে সেই অর্জনেরও উদযাপন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাঙালির ঐক্যকে আরো সুসংহত করবে। আর অতীতের গ্লানি ভুলে, দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়ার আহ্বান এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অভয় দিয়েছেন, বর্ষবরণে জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি নেই। নববর্ষের দিন শেষে সে শঙ্কা কেটে গেছে; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশাবাদই সত্য হয়েছে। সারাদেশেই বর্ষবরণ উদযাপিত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবের আমেজে শান্তিপূর্ণ উপায়ে। বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনকে হারাম আখ্যায়িত করে এবারও তাতে অংশ না নিতে আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ঈমান-আকিদাবিরোধী হিন্দুয়ানি শিরকি অপসংস্কৃতি দাবি করে তা বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে তারা। নিরাপত্তার কথা বলে এবারও উন্মুক্ত স্থানে নববর্ষের সব আয়োজন সন্ধ্যার আগে শেষ করতে বলা হয়েছিল পুলিশের তরফ থেকে। তারপরও কোনো বিঘœ ছাড়াই নির্বিঘেœ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে উদযাপিত হয়েছে বর্ষবরণের বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
পহেলা বৈশাখে সময় নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গত দুই বছর নগরে উন্মুক্ত আয়োজন থেকে বিরত ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাওয়ায় এ বছর তারা ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেখানে আগতরা বলেছেন, সংস্কৃতি হলো একটি জাতির পরিচয়। জঙ্গিবাদ, নারী নির্যাতন আর মাদকের ভয়াবহতায় সমাজে যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন মানুষের মধ্যে এই সংস্কৃতি বোধের স্তুতি করবো আমরা। এই বৈশাখে শপথ নেবো অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ গড়ার।
রাজধানীতে নতুন সূর্যের সঙ্গে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা হয়েছে ছায়ানটের গানে গানে। এই প্রভাতি আয়োজন এখন ৫ দশকের ঐতিহ্য। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা জানান, তাদের এবারের বর্ষবরণ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান’। তিনি জানান, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সামাজিক বিকার রোধে মানুষের ভেতরে সুপ্ত আলোটাকে জাগিয়ে তুলতে পারে সংস্কৃতি। পাশবিক মনোবৃত্তির বিপরীতে মানবিক সংস্কৃতির জাগরণ আর তাতে তরুণ প্রজন্মের সংযোগ ঘটাতেই আমাদের এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে দুই ঘণ্টার এ প্রভাতি আয়োজন শুরু হয় সকাল সোয়া ৬টায়, বাঁশিতে ভোরের রাগালাপে। পুরো অনুষ্ঠান সাজানো হয় ১৬টি একক গান, ১২টি সম্মেলক গান ও দুটি আবৃত্তিতে। সকাল সাড়ে ৮টায় ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের আবাহনী কথনে শেষ হয় অনুষ্ঠান।
বটমূলের প্রভাতি আসর ভাঙতে ভাঙতেই চারুকলা অনুষদে শেষ হয়ে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে; শোলার পাখি, টেপা পুতুল হাতে নিয়ে বৈশাখী সাজে সব বয়সের সব শ্রেণি পেশার মানুষের এই শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল হেরিটেজের অংশ। সকাল ৯টায় চারুকলার সামনে থেকে শুরু হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) চত্বর ঘুরে আবার চারুকলার সামনে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, লালন সাঁইজির গানের চেতনায় এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। এ প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের শিল্পকাঠামোগুলো। তিনি আরো জানান, মানবিকতার বোধ, বিবেচনাবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা যেন নিজেদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে আরও বেশি নিয়োজিত করতে পারি, সেই আহ্বানই ছিল এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরোভাগে ছিল মহিষ, পাখি ও ছানা, হাতি, মাছ ও বক, জাল ও জেলে, টেপা পুতুল, মা ও শিশু এবং গরুর আটটি শিল্পকাঠামো। এ বছর প্রথমবারের মতো টেপা পুতুলের ছেলে ফর্ম নির্মাণ করেছেন শিল্পীরা। টেপা পুতুলকে বসানো হয়েছে একটি সাইকেলের ওপর। বরাবরের মতো বাংলার লোকজ ফর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হয়েছে শোভাযাত্রার পরিকল্পনা। প্রতিটি প্রতীকেই ছিল বার্তা। মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতার বার্তা ছিল এসব কাঠামোতে। আর বরাবরের মতোই রাজা-রানী, ফুল ছিল সামনের দিকে।
বর্ষবরণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ছাড়াও ছিল বাউল গান ও নৃত্য। জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৯টায়। শাহবাগ শিশুপার্কের নারকেলবিথী চত্বরে সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান ‘জাগো নব আনন্দে’। এছাড়াও জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর ও প্রতœস্থানগুলো সরকারি ছুটির এ দিনে ছিল উন্মুক্ত। দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাংলা নববর্ষ বরণে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও সব উপজেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্থানীয় প্রশাসন। সারাদেশে হয় গ্রামীণ মেলা। এই মেলা আয়োজনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৬৪ জেলায় ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়।

পহেলা বৈশাখ বৈষয়িক
বিষয়েরও আধার : প্রধানমন্ত্রী
শুধু বিনোদন নয়, যুগ যুগ ধরে বাংলায় উদযাপিত পহেলা বৈশাখকে বাঙালির মনন-মানসের বৈষয়িক বিষয়ের আধার হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেয়া বাণীতে তিনি বলেছেন, বাংলা নববর্ষ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাঙালি জাতি বর্ষবরণ উৎসবকে ধারণ করেছে তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পণ্যের ক্রয়বিক্রয়, হালখাতা উৎসব, নতুন পোশাক এবং মিষ্টান্নসহ হরেক রকমের খাবারের জমজমাট ব্যবসা, সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ বিনোদনের পাশাপাশি আজ দেশের অর্থনীতিতে নতুনত্ব এনেছে। বাঙালির এই সার্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে সরকার যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, সে কথাও তিনি বলেছেন।

বৈশাখী ভোরে রমনা বটমূলে
যে মাটি দিয়েছে আশ্রয়, তার গভীরে শিকড় ছড়িয়ে, আবহমান বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির সুর কণ্ঠে নিয়ে বিশ্বায়নের ঐকতানে শামিল হওয়ার প্রত্যয় এসেছে রমনা বটমূলের বৈশাখী বার্তায়। নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুর মুখের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে তাই বৈশাখী রঙ। নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে সারাদেশে সুসম্পন্ন হয়েছে বাঙালির সার্বজনীন বর্ষবরণ উৎসব। সূর্যোদয়ের সঙ্গে মর্তুজা কবিরের বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজন। একক ও সম্মেলক কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতার পঙক্তিমালায় ছায়ানটের শিল্পীরা স্বাগত জানান পহেলা বৈশাখকে।
পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় জাগরণ গড়ে তুলতে ষাটের দশকে যে সংস্কৃতিকর্মীরা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট গড়ে তুলেছিলেন তাদেরই একজন সনজীদা খাতুন। ছায়ানটের উদ্যোগেই ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে হয় প্রথম বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। তার বিশ্বাস, অশুভ কালো অপশক্তির বিপরীতে আপন মাটির রস-সম্পদ আর বিশ্ব মানসের সহজ যোগ বয়ে আনবে কল্যাণ। সনজীদা খাতুন বলেন, বিশ্বায়ন আজ আমাদের কাছে বাস্তব সত্য। এ শব্দ নিন্দা অর্থে উচ্চারণ করছি না। বিশ্বের সংগীতে-সাহিত্যে, শিল্পকলায়-দর্শনে-বিজ্ঞানে যে মহান অর্জন তার স্বাদ নেব আমরা। আত্মস্থ করতে হবে সকল মানবিক অন্তরসম্পদ। সেই সত্য সুন্দর সমৃদ্ধ করবে আমাদের।
বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রোয় রমনা বটমূলের প্রভাতি আয়োজন শুরুর পর একক সংগীত পর্বে অভয়া দত্ত পরিবেশন করেন শুভ প্রভাতে পূর্ব গগনে; সুমা রাণী রায় শোনান প্রথম আলোর চরণধ্বনি; খায়রুল আনাম শাকিল শোনান জাগো অরুণ ভৈরব; সত্যম কুমার দেবনাথ গেয়েছেন প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে; সেঁজুতি বড়–য়া শোনান তোমার হাতের রাখীখানি। তাদের গানের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে ছায়ানটের শিশু ও বড়দের দলের সম্মেলক গানের পরিবেশনা। প্রভাতি আয়োজনের একেবারে শেষ অংশে ছোট ও বড়দের দল যৌথভাবে পরিবেশন করে ‘ওরে আইল বৈশাখ নয়া সাজে’ গানটি। ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের কথন পর্বের পর রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবেশনায় শেষ হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজন।

৫৬ হাজার বর্গমাইলে
বর্ষবরণের আনন্দ
এবারের বর্ষবরণে রাজধানীর পাশাপাশি ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ছড়িয়ে পড়ে বর্ষবরণের আনন্দ। তবে প্রধান প্রধান আয়োজনগুলো ছিল রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। তাই পহেলা বৈশাখে খুব চেনা শহর যথারীতি বদলে গিয়েছিল। ছোট-বড় সবাই ব্যস্ত হয়ে পথে নেমে এসেছিলেন। হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ। সবাই বাঙালি। তাদের উপস্থিতিতে ঢাকার বড় সড়কগুলো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। যেদিকে চোখ যায়, লাল-সাদা রঙ। বিশেষ করে লাল রঙ খুব চোখে পড়েছে। মেয়েদের শাড়িতে, জামায় ছিল উজ্জ্বল লাল। ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি পরে বের হয়েছিলেন। কারোর সাদা-লালের মিশেল। সুন্দর সেজে দীর্ঘপথ হেঁটে নগরবাসী যাচ্ছিলেন রমনার দিকে। আর তারপর শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর ও এর আশপাশের এলাকা। কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বিশাল রাস্তার দুই ধারে ছিল মানুষ আর মানুষ। ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সেখানকার মানুষ চারুকলার দিকে আসতে শুরু করেন। বাকিরা তারও আগে থেকে সমবেত হচ্ছিলেন। কেউ দলবেঁধে; কারও সঙ্গে স্ত্রী-সন্তান। বন্ধুরা, প্রেমিক-প্রেমিকা ঘুরে বেড়িয়েছেন। পায়ে পা লাগছিল; গায়ে গা। তবে কেউ কারও যন্ত্রণার কারণ হননি; বরং সব ভুলে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল বাঙালি। মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষ হলেও এলাকাজুড়ে এর রেশ রয়ে গিয়েছিল। তাই অনেক রাত অবধি মুখর ছিল গোটা এলাকা। তবে বিকেল থেকে সন্ধ্যানাগাদ বৈশাখী হালকা ঝড়-বৃষ্টিতে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পহেলা বৈশাখ পালনে বের হওয়া নগরবাসীকে।
পহেলা বৈশাখ বরণ করতে আসা অনেক মানুষের হাতে ছিল বাঁশি। কারও হাতে একতারা। অনেকেই ঢোল বাজিয়ে বর্ষবরণের আনন্দ প্রকাশ করেছেন। নাচছিলেন কেউ কেউ। রাস্তাজুড়ে বসেছিল বৈশাখী মেলা। একই রকম দৃশ্য চোখে পড়েছে ঢাকা শহরের অন্য সব রাস্তা, পার্ক, উদ্যানে। সব মিলিয়ে অন্যরকম একটি দিন। এই আনন্দ এই হাসিরাশি বাঙালির সব ঘরে পৌঁছে যাক। অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক। এমন সুন্দর বেঁচে থাকার বাংলাদেশ হোক; এগিয়ে যাক; দিনভর শোনা গেছে এমন প্রত্যাশা। এবারের পহেলা বৈশাখের সকাল ছিল বৃষ্টিবিহীন। দুপুরে ছিল তাপদাহ। তারপরও রাজধানীর যে জায়গাটিতে একটু ছায়া আছে, সেখানেই বসে গেছে গানের মেলা; প্রাণের মেলা। সাংস্কৃতিক, সামাজিক, নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই ছোট-বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে বরণ করে নিয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে হলেও এই আয়োজনের লক্ষ্য সবারই এক। সবাই চায় একটি শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ। রাজধানীতে ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই বর্ষবরণ উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে। উৎসবমুখর আমেজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপিত হয় সারাদেশে। রাজধানীসহ সারাদেশে ছিল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নÑর্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিñিদ্র নিরাপত্তা। সকালে রমনা পার্কে ঢোকার মুখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তা তল্লাশির পাশাপাশি মিষ্টি, ফুল, পাখা ও মাথার টুপি দিয়ে অভ্যর্থনা জানান দর্শনার্থীদের। এ উদ্যোগ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বহু সংগঠন বর্ষবরণ উৎসবে মাতোয়ারা হয়েছিল দিনভর। সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…’ গানটি। দিনভর দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে নগরবাসী মেতে ওঠেন বর্ষবরণের উৎসবে। মানুষ হারিয়ে যায় কথা, কবিতা ও সুরের ছন্দে। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র রমনা পার্ক ও এর আশপাশের এলাকাসহ পুরো রাজধানীতেই নামে মানুষের ঢল। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে এবার ঢাকা শহরের অনুষ্ঠানমালা বিকেল ৫টার পরে গুটিয়ে যেতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষ যার যার ঘরে ফিরতে শুরু করে। উৎসবে আসা মেয়েদের বসনে ছিল লাল-সাদা বর্ণিল শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া আর খোঁপায় ফুল। ছেলেরা পরেছিল লাল-সাদা পাঞ্জাবি, ফতুয়া ও টি-শার্ট। শিশুরাও কম যায়নি। ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে টিপ, পায়ে আলতা, শাড়ি, ফ্রক, সালোয়ার-কামিজ পরে মেতে উঠেছিল বৈশাখী আনন্দে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলা, টিএসসি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের গানের আসর ও বৈশাখী মেলার পাশাপাশি রাজধানীজুড়ে ছিল নানা অনুষ্ঠান। উৎসবে অংশ নিতে আসেন বিদেশিরাও। উপভোগ করেন বাঙালির প্রাণের উৎসব। তবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে এবারের পহেলা বৈশাখের আনন্দ-উৎসবে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।