কলাম

নারী ক্ষমতায়নে রোল মডেল বাংলাদেশ

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
নারীকে এগুতে দেয়া বা এগিয়ে নেয়া এখনো আমাদের কাছে নারী অধিকারের প্রশ্ন। বাস্তবতা কি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে? ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভাষ্য মতে, চলতি বছরে যে সকল দেশ তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে বিশ্ব বাজারকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হবে, তাদের অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীরা যদি কর্মক্ষম না হয়, তাহলে কিভাবে একটি দেশ পূর্ণ শক্তি অর্জন করবে? তাই নারীকে এগিয়ে নেয়ার বিষয় তাদের অধিকারের জায়গা থেকে বরং আমাদের স্বার্থের জায়গা হিসেবে দেখাই ভালো। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার তাগিদ থেকেই নারী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এই বিষয়টিতে নতুন করে গুরুত্ব দিলেও কথাটি নতুন নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাত ধরে বদলে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের কথায় এই বিষয়টি ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। আমরা বারবার শুনলেও, দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ হারানোর অযৌক্তিক ভীতি, পরিবর্তনের প্রতি মানসিক প্রতিরোধ আমাদেরকে যথাযথ উপলব্ধি থেকে বারবার পিছিয়ে নিয়ে গেছে।
আমাদের দেশে এই উপলব্ধির প্রথম সরকারি নীতিতে প্রতিফলন শুরু হয় ১৯৯৭ সাল থেকে। ১৯৯৫ সালে বেইজিং সম্মেলনে নারী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় পিএফএ (প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন) চিহ্নিত করা হয়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় ফোরাম থেকে সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে তখন থেকেই বারবার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। যার আলোকে ১৯৯৭ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়। বহু সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করেও তিনি নারী নীতি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু আমাদের দুঃখজনক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা হিসেবে ক্ষমতার পালাবদলে বিষয়গুলো স্থবির হয়ে যায় ২০০১ সালে। এ সময় বেশ কয়েকবার নারী উন্নয়ন নীতিতে সংশোধনী আনা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিষয়গুলো আবারো গতি পায় ২০১১ সালে। শেখ হাসিনা সে সময় সকল ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীকে অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা দেন এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা নেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় প্রায় ৮ বছরের মাথায় এসে আজ নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে, বিশ্বের অনেকেই বাংলাদেশকে রোল মডেলের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারপীড়িত আমাদের মতো একটি জনপদে এ অর্জন অসম্ভবকে সম্ভব করার নামান্তর।
২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নারী ও শিশু ক্ষমতায়নে একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়নের কোনো রূপরেখা দিতে পারেনি। শেখ হাসিনা সরকারে আসার পরে আলোর মুখ দেখে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১’। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের সিডিও বাস্তবায়নে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেয়া একটি রায়ের পর নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার ২০১০ সালে প্রণয়ন করে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন। এ ছাড়া নারী নীতি, মানব পাচার সংক্রান্ত আইন, পর্নোগ্রাফি আইন, শিশু নীতিসহ অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সুরক্ষা পাচ্ছে দেশের নারী ও শিশু।
লিঙ্গ বৈষম্য ইনডেক্সে বাংলাদেশের উন্নতি ছাপিয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশকে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুসারে বর্তমানে লিঙ্গ বৈষম্য ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। ২০০৬ সালে এই ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯১তম এবং ২০১৬ সালে ৭২তম। সেই ৭২তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে ২৫ ধাপ উন্নতি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। আমরাই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী ও স্পিকার সবাই নারী। প্রতিবেশী সব দেশের তুলনায় নারী ক্ষমতায়নে এগিয়ে আছি আমরা। নারী শিক্ষার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি, নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারী সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে সরকার। এর পাশাপাশি বিদেশে যাওয়া নারী শ্রমিকদের মাধ্যমেও রেমিট্যান্স লাভ করছে বাংলাদেশ। দেশের মাথাপিছু আয়, উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমানে ছেলে-মেয়ের অনুপাত প্রায় সমান। প্রত্যেক শিশুর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশে মোট মেয়ে শিশুর শতকরা ৯৯ দশমিক ৪ ভাগ অংশগ্রহণ করে; যা প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। দেশে মাধ্যমিক ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ আরো বেশি। ১০ বছর আগেও মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে অনুপাত ছিল ৬৫ ও ৩৫ শতাংশ। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ছেলে ও মেয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৪৭ ও ৫৩ শতাংশ! ২০১৬ সালে প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফল অনুসারে প্রতিটি বোর্ডে পাসের হারেও এগিয়ে নারীরা। বিগত ৫ বছরে উচ্চশিক্ষা লাভে বিদেশে নারীর অংশগ্রহণ হার বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি। তাছাড়া বর্তমান সরকারের নানাবিধ পৃষ্ঠপোষকতার কারণে উচ্চশিক্ষা লাভ ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বেগম রোকেয়া সমাজকে শকটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যার দুটি চাকা নারী ও পুরুষ। তাদের উভয়কে সমানভাবে পরিচালনা করলেই সমাজ সঠিকভাবে এগিয়ে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেই ভারসাম্য স্থাপনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। আর তার প্রমাণ ইকোনমিকস ফোরামের রিপোর্ট। নারী উন্নয়নে একটি দেশের সরকার আন্তরিক হলে কী করা সম্ভব তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এসব উদ্যোগ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তেমন একটি সময়ে নিতে হয়েছে, যখন নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে কাজ করতে গেলে, তার বিপরীতে বিরাট রাজনৈতিক মূল্য দেয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই তুলনায় ভোটের রাজনীতিতে নগদ প্রভাব খুব বেশি নেই। তারপরও শেখ হাসিনা আদর্শিক জায়গা থেকে সেই ঝুঁকি নিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকট, বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন, আসন্ন নির্বাচনসহ কিছু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এ সময় আয়রন লেডি খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, থাইল্যান্ডের ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের পাশে বারবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এসব নারী নেতৃত্বের তুলনায় মানবতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক : সভাপতি
ইয়ুথ বাংলা কালচারাল ফোরাম ও সম্প্রীতি