সাহিত্য

পিৎজা-পাস্তা না ভরপেট পান্তা চাই

অরুণ কুমার বিশ^াস
পিৎজা-পাস্তা খেয়ে অভ্যস্ত সায়েবছানার আজ হঠাৎ পান্তার প্রতি প্রীতি এলো কেন! কাহিনি কী! হয়নি কিছুই, এসেছে বৈশাখ। বাঙালি হবার কমপিটিশনে নেমেছে সায়েবছানারা। মা-খালারা তড়িঘড়ি করে ‘শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা শেখা’র ওপর কিছু বইও কিনে আনলেন। সেই বই খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা। দেশে এত এত বই, কিন্তু পরিশুদ্ধ বানান ও শব্দরীতিতে কটি বই পাবেন বলুন! দেশের নামিদামি সব লেখকও আজকাল প্রমিত বাংলা ছেড়ে বয়-বেয়ারার ভাষায় গপ্পো লিখতে শুরু করেছেন। তাতে নাকি বই কাটে বেশি। কে কাটেÑ ইঁদুরে নাকি পাঠকে, বলা কঠিন।
বাপ বলেছে, টুকটাক বাংলাটা অন্তত শেখো। জগাখিচুড়িতে কি সারা জীবন চলবে! অবশ্য বঙ্গদেশ ছেড়ে ‘বহির্গমন করিলে’ সে অন্য কথা। কিন্তু তার বাঙালি হওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই সায়েবছানার অকস্মাৎ এই পান্তাপ্রীতি।
বাঙালি কী করে হয় ড্যাড? এমনভাবে বলল সায়েবছানা, শুনে মনে হয় যেন বাঙালি হওয়া অনেকটা ওই হলিউডি হিরো হবার মতোন ব্যাপার। এর সাথে জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই, তবে গ্রুমিংয়ের আছে। আদতেও ব্যাপারটা এখন অনেকটা সেই রকম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুলভাল বাংলায় কথা বলা, মাছে-ভাতে বাঙালির বদলে এখন দ্রুতই ফাস্টফুড সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়াÑ ফুটুর-ফাটুর ইংলিশ কপচানো- সব মিলিয়ে বাঙালি নয়, বাঙালও নয়, ক্রমশ আমরা একটি অদ্ভুত প্রজন্ম হিসেবে বড় করছি আমাদের সন্তানদের। এই যে সায়েবছানা, তার মাথাটা কিন্তু আরো আগেই খেয়েছে সেই ডিজুস বাংলা। মুফতে মুনাফা কামিয়েছে গ্রামীণফোন। এসব করপোরেট কোম্পানির মূল উদ্দেশ্যই হলো যেনতেন প্রকারে মুনাফা খাবে, তাতে দেশ থাক বা উচ্ছন্নে যাক, কী এসে যায়।
কথায় কথায় আকাশ সংস্কৃতির কথা বলি। স্যাটেলাইট চ্যানেলকে দুষছি। আর ভায়া, জোর করে কেউ তোমাকে টিভিমুখী করেনি বা হিন্দি চ্যানেল খুলে বসে থাকতে বলেনি। হরেক রকম খাদ্যখানা সামনে সাজানো, তুমি তোমার রুচি আর পছন্দমতো খাও না, কে বারণ করেছে! মুক্তবাজারে সবাই বাণিজ্য করবে। মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছে দুটো টাকা কামাতে। তুমি ক্রেতা, আবার বিক্রেতাও। নইলে এদ্দিন বাদে তোমার সায়েবছানা হঠাৎ পান্তাভাতের খোঁজ করবে কেন! কেউ একজন তাকে নিশ্চয়ই বুঝিয়েছে, অন্তত একবারের তরে বাঙালি হয়ে যা ভাই, নইলে যে ইজ্জত থাকে না। এরা সব ভাবের বাঙালি, আমি জানি। তাও শুরুটা তো হোক। বেটার লেট দ্যান নেভার!
বৈশাখের মুখে ইলিশ বাবাজিদের ভারী পায়াভারি। তাদের ছুঁয়ে দেখে সাধ্যি কার! ইলিশ এখন মাছে নয়, আঁশেও বিকোয়। দুজোড়া ইলিশের আঁশ দুশ টাকা। কিনবে! পাতে পান্তা এলো, কিন্তু ইলিশ নেই, তাই কি হয়! গরিবের ঘোড়ারোগ বলে কথা। যাদের নিত্য দুবেলা হাঁড়ি চড়ে না, তারাও হন্যে হয়ে ইলিশের খোঁজ করে। বাঙালি বলে কথা!
এবার আসুন বাণিজ্যের প্রসঙ্গে। বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী! নববর্ষে শুধু প্রাণই মাতে না হরষে, মওকা বুঝে ব্যবসায়ীরও বেশ পোয়াবারো, মুফতে টু পাইস কামিয়ে নেয়। পেটে খিদে, ঘরে চাল বাড়ন্ত, কিন্তু রঙচঙে জামা চাই। আমি কিন্তু অনুষ্ঠানের পক্ষে, নৈরাশ্যবাদী নই। জীবন মানেই উৎসব-আনন্দ (জি বাংলা, স্টার জলসা নয়)। নতুন বছর আসছে, আমাদের পরিতুষ্টির সীমা নেই। কিন্তু আদতেই কি আমরা বাঙালি হয়ে উঠতে পেরেছি, নাকি সুবিধাবাদের চর্চা করছি কেবল! রাতদুপুরে ‘চুকা শো’ তে এই নিয়ে মেলা কথাবার্তা হবে। বাঘা বাঘা সব আলোচক বৈশাখ ও বাঙালির কালচার কপচাবেন, ভাবের সাগরে হাবুডুবু খাবেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বলতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলবেন, কিন্তু আসল কাজে লবডঙ্কা। বাঙালি কৃষ্টির মাঝে যে ঔদার্য ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা তো কারো মাঝে দেখি না। সবখানে শুধু লোভ আর প্রতিহিংসার রাজত্ব চলছে।
ঘুরে এলাম বৈশাখী বাজার। উড়িব্বাস! উত্তাপে টেকা দায়। শুধু ইলিশ কেন, পোশাক-পরিচ্ছদের দামও কি কম! পাঁচশ টাকার পাঞ্জাবি এখন বিকোয় তেরোশ’তে। কী করে বুঝলাম! চকচকে নতুন প্রাইস ট্যাগখানা সযতেœ টেনে তুলতেই বেরিয়ে পড়লো পুরনো মূল্য-ইতিহাস। এদেরকে কী বলবেন আপনি, বাঙালি নাকি গাঁটকাটা! আরে ব্যবসা করছিস কর, তাই বলে এত! বিবেক-বিবেচনা নেই! সেই যে নিয়মিত পাস্তাখাদকের সহসাই পান্তাপ্রীতি, এ যেমন অসহ্য, ঠিক তেমনি আরেক গ্রুপ আছে, যারা কিনা বৈশাখ উদযাপনের ঘোর বিপক্ষে। তারা মনে করে, এটি একটি ধর্মের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান। তারা আসলে ইতিহাসটা ঠিক জানেই না। এরা কূপম-ূক, মূর্খ। মূর্খের বিষয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চাণক্য প-িত যথার্থই বলেছেন, মূর্খের সাথে তর্ক করার চেয়ে ঘুমানো শ্রেয়। তাতে মস্তিষ্ক সতেজ হয়। অর্থাৎ উল্টোটা করলে মিছে সময় নষ্ট। যারা বৈশাখের বিপক্ষে, তাদের সম্ভবত অন্য মতলব আছে। আর মতলববাজদের থেকে সাবধান। ছোটখাটো একটা এমবার্গো আছে এবার। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় বিকেল পাঁচটার পরে কোনো জমায়েত নয়, বৈশাখ সেখানেই শেষ। বাহ বেশ বেশ! একশ্রেণি এটাই তো চায়। সান্ধ্য আইন না হয়ে পূর্বাহ্নে মানে সকাল দশটায় অনুষ্ঠানাদি ‘প্যাক আপ’ হলে আরো ভালো হতো। কেন, বিশ^বিদ্যালয়ে কি সব উন্মার্গগামী থাকে নাকি! আমিও তো সেখানে পড়েছি, এমন তো দেখিনি কখনও। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কতটুকু বাঙালি হবো! ফুল প্লেট, নাকি হাফ প্লেট! পান্তা খাওয়া বাঙাল, নাকি সত্যি সত্যি চর্চিত ও শিক্ষিত বাঙালি!
সায়েবছানা গপাগপ পান্তা খায়। কিন্তু সে ভাবতে পারেনি, পান্তা পাস্তার মতোন ‘ইজি টু ডিজেস্ট’ নয়। ইহা অন্য জিনিস। পান্তা সত্যি সত্যি বাঙালের খাবার। যারা ভান-ভণিতা জানে না। মানুষ ঠকায় না। দশ টাকার জিনিস একশ টাকায় বেচে না। পলিটিকস বোঝে না। ওরা সাচ্চা দিলের মানুষ। রোজ পোড়ামরিচ ডলে হাপুস হুপুস করে পান্তা খায়। মনের মতো করে জমিয়ে বাঁচে।
তাই আসুন, আমরা গিনিগিপ বাঙালি না হই। দুয়েকদিন পান্তা খেয়ে কী হবে! মরিচপান্তা খেলেই কি বাঙালি হওয়া যায়! নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার বুকে ধারণ করতে হয়। সর্বোপরি, দেশকে ভালো না বাসলে বাঙালিত্ব আসবে কোত্থেকে! সায়েবছানা মিছে পাস্তা খাবে আর ভুলভাল বাংলা বলবে। বাঙালি আর হয়ে উঠবে না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক