কলাম

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

মেজর সুধীর সাহা (অব.)
আর্মি অফিসার এবং জাস্টিসদের চালচলন ঠিক এখন যেমন দেখছেন, এমনটা ছিল না পাকিস্তান আমলে এবং ১৯৭২ সালের পর বাংলাদেশে। সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য বিদেশি কোনো নাগরিকের সঙ্গে কথা বলা কিংবা দেখা করার কথা চিন্তাও করতে পারতেন না। বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে শুধু এমনটা করা যেত। একবার একজন কর্নেলের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা রিপোর্ট হলো যে, কর্নেল সকালে প্রাতঃভ্রমণ করার সময় এক বিদেশির সঙ্গে কথা বলেছেন। কর্নেল সাহেবকে পরদিন মুখোমুখি হতে হলো আর্মি হেডকোয়ার্টারে জ্যেষ্ঠ অফিসারের সামনে। প্রশ্ন করা হলো, ‘তুমি কি কোনো বিদেশির সঙ্গে কথা বলেছো?’ উত্তরে কর্নেল বললেনÑ ইয়েস স্যার। প্রশ্ন করা হলো কি কথা বলেছো? উত্তরে তিনি বললেন, বিদেশি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন বনানী কোনদিকে? আমি তাকে বনানীর রাস্তাটা দেখিয়ে বলেছিলাম- এই দিকে। অতঃপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন জ্যেষ্ঠ অফিসার এবং কর্নেলকে অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দিলেন। অন্যদিকে, জাস্টিসরা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা পরিচিত কোনো মানুষের অনুষ্ঠানে যেখানে সাধারণ মানুষের আগমন হতে পারে এমন কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান করতেন না। এমনকি আত্মীয়স্বজন কারো কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তারা যোগদান করা থেকে বিরত থাকতেন। কেননা সেখানে অন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। আজ আর এমনটা নেই। গুলশান ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাব কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখবেন বিচারপতিদের আগমন ঘটা করে হচ্ছে। ভাব আদান-প্রদান হচ্ছে, এমনকি রাজনৈতিক বিষয়েও মতবিনিময় হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর অফিসাররা এখন অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। হাতিরঝিল, পদ্মাসেতু ইত্যাদি প্রকল্পে সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করছেন। ডেপুটেশনে কাজ করছেন সিভিল প্রশাসনে। এসব প্রশাসনে বিদেশি পরামর্শদাতা এবং বিদেশি সংস্থাও কাজ করছে পাশাপাশি। এর বাইরে জাতিসংঘ মিশনে কাজ করছেন হাজার হাজার অফিসার এবং সৈনিকরা। কাজেই বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলা বা দেখা করা নিষিদ্ধ করার মতো পরিবেশ আর নেই কোথাও।
জুজুর ভয় দেখানো হয়েছে বহু বছর তৎকালীন পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশের শুরুর দিকে। ভারত ভয়, আমেরিকা ভয়Ñ এসব দেখিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অবৈধ ফায়দা লুটেছে বছরের পর বছর। আজ আর তেমন ভয় দেখিয়ে লাভ হচ্ছে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে শত্র“তা নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই যে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি তা আজ সবার নিকট দিবালোকের মতো সত্য। প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের একটি প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ তুলে ধরছি। পৃথিবীর মানুষ যারা কানাডার নায়াগ্রার জলপ্রপাত দেখতে গিয়েছেন, তারা সবাই দেখেছেন কানাডার মাটিতে ঠিক জলপ্রপাতের পাশে পতপত করে উড়ছে কানাডার পতাকা এবং আমেরিকার পতাকা। ঠিক একইভাবে আমেরিকার মাটিতেও উড়ছে কানাডা ও আমেরিকার পতাকা। এমনটা করতে তাদের সার্বভৌমত্ব কখনো নষ্ট হয়নি; বরং সুপ্রতিবেশী দেশ হিসেবে দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে। আমেরিকার মানুষের অনেকেই কানাডার কোনো কোনো শহরে শৌখিনতার বশবর্তী হয়ে বাড়ি কিনে রেখেছেন। অপরদিকে কানাডার মানুষেরও ফ্লোরিডাসহ আমেরিকার অন্যান্য শহরে সম্পত্তি আছে। এতেও তাদের দুদেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জিত হয়নি। কিন্তু এক সময় ভারতকে বাংলাদেশের শত্র“দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ভারতে চলে গেলে ফেলে যাওয়া সম্পত্তিকে বলা হতো ‘শত্র“সম্পত্তি’। ব্যক্তিগতভাবে অনেক হিন্দু নাগরিককে দেখেছি নিগৃহীত হতে। কারণ ওই হিন্দু ভদ্রলোকের একটি বাড়ি ছিল ভারতে। ভারতে কোনো সম্পত্তি থাকা মানেই সেই নাগরিক দেশের শত্র“। এমনটা চলছিল বছরের পর বছর। কোনো সম্পত্তি না থাকলেও প্রচুর ধনাঢ্য হিন্দু নাগরিককে বাংলাদেশে নিগৃহীত হতে দেখেছি। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বলা হতো ভারতে তার সম্পত্তি আছে। ভারতের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমেরিকা, কানাডা, লন্ডন অথবা পৃথিবীর যেকোনো দেশে সম্পত্তি থাকা যাবে; কিন্তু ভারতে থাকা যাবে না! ভারতে সম্পত্তি থাকা মানেই সে দেশদ্রোহী।
ভারত আমাদের সুপ্রতিবেশী। অপরদিকে ভারতের বাঁকা চোখও বাংলাদেশের প্রতি পরিবর্তিত হয়েছে কালক্রমে। বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসপূর্ণ চাহনি থেকে ভারত যেন বেরিয়ে এসেছে। দুদেশের সরকারেরই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে। আর তাতেই সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আজ বাংলাদেশ থেকে ভারতে বেড়াতে যাচ্ছে, চিকিৎসা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, ব্যবসা করতে যাচ্ছে। অতীতের মতো এখন আর জুজুর ভয় নেই।
এমন একটি বাস্তবতায় গত ২১ ফেব্র“য়ারি ভাষা আন্দোলনে শহীদদের সম্মিলিতভাবে শ্রদ্ধা জানাল ভারত ও বাংলাদেশ। ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে শুধু ভাষার টানে দু’বাংলার মানুষ একই মঞ্চে গাইলেন বাংলার জয়গান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট নোম্যান্স ল্যান্ডে অস্থায়ী ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চ’তে এভাবেই কাটালেন দুই বাংলার বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ। মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা সভা আর গানে গানে মাতোয়ারা হলো দুই বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস। এ অনুষ্ঠান ঘিরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী। দুই দেশের জাতীয় পতাকা, নানা রঙয়ের ফেস্টুন, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড আর ফুল দিয়ে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছিল নোম্যান্স ল্যান্ডকে। দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলায় উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের ছিল বিরামহীন উৎসাহ-উদ্দীপনা। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করে উভয় দেশের আবেগপ্রবণ মানুষগুলো নাড়ির টানে এক বাঙালি অন্য বাঙালিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।
ভাষা দুই বাংলার মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে এল। একই অনুভূতিতে দুই বাংলার মানুষের মনে জাগলো প্রেমের বন্যা। এই সম্পদ প্রতিবেশী দুই দেশের স্থায়ী সম্পদ। এই মানবীয় সম্পদকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোনো দেশেরই সার্বভৌমত্বের কোনোরকম ক্ষতি হতে পারে না। শুধু প্রয়োজন হচ্ছে ভাবনার পরিবর্তন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কামনা করি, বেনাপোলের একুশে মঞ্চের মতোই দুই বাংলার হৃদয়ে জেগে উঠুক একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা। চিরস্থায়ী হোক বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন।