প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ষষ্ঠ জাতীয় স্কাউট সমাবেশ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে স্কাউটদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহ্বান

এম নিজাম উদ্দিন
এবারের ষষ্ঠ জাতীয় স্কাউট সমাবেশ চাঁদপুরের হাইমচরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই স্কাউট সমাবেশের উদ্বোধন করেন। ষষ্ঠ জাতীয় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্প কমডেকায় যোগ দিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে স্কাউট সদস্যদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ দেশ। আর আমরা বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তাই সমাজ ও দেশ থেকে জঙ্গিবাদ, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জনসেবায় অংশ নিতেও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ১ এপ্রিল চাঁদপুরের হাইমচরে ষষ্ঠ জাতীয় স্কাউট সমাবেশ উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে রোভার স্কাউট সদস্যরা দেশের নেতৃত্ব দেবে। তোমরাই জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে এবং সেই গতিধারা যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখবে। এ জন্য তোমাদেরকে দেশের জন্য যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে হবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দেশ এখন অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। এই উন্নয়ন আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি অভিভাবক ও স্কাউটদের উদ্দেশে বলেন, ছেলে-মেয়েরা যাতে সুশিক্ষা পায়, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়, তাদের মনমানসিকতা যেন আরো উন্নত হয় এবং সেগুলো যেন সৃষ্টিধর্মী হয়; সেদিকে দৃষ্টি রেখেই আমরা শিক্ষা দিতে চাই।
চাঁদপুরের হাইমচরে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং এই অঞ্চলের উন্নতি হবে। তাছাড়া খুব ভালো পর্যটন কেন্দ্র হবে এবং নৌভ্রমণের জন্যও এটি চমৎকার জায়গা।
প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে স্কাউট সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য দেন স্কাউটস-এর জাতীয় কমিশনার ও জনপ্রশাসন সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান এবং জাতীয় কমিশন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটওয়ারী। প্রধানমন্ত্রী সকাল সোয়া ১১টায় হেলিকপ্টারযোগে হাইমচরের চরভাঙা এলাকায় কমডেকাস্থলে পৌঁছলে আয়োজকরা তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় তিনি সমাবেশ উদ্বোধন করে পায়রা ও বেলুন উন্মুক্ত করে আকাশে ছেড়ে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সমাবেশে সালাম গ্রহণ করেন। সমাবেশ স্কাউট সদস্যরা মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে প্রদর্শন করে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্কাউটস-এর আয়োজনে ষষ্ঠ জাতীয় কমডেকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৭ হাজারের বেশি স্কাউট সদস্য অংশ নেয়। এ ছাড়া আমেরিকা, ভারত ও নেপাল থেকেও প্রতিনিধিরা এতে যোগ দেয়। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্প চলে। পরে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় যোগ দেন।

নৌকায় ভোট দিলেই দেশের
উন্নয়ন হয় : শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদপুরের বিশাল জনসভায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দেশবাসীর কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের উন্নয়ন হয়। নৌকায় ভোট দিলে কেউ খালি হাতে ফেরে না। নৌকায় ভোট দিলেই দেশের উন্নয়ন হয়। আর বিএনপি-জামায়াত সরকারে এলে লুটেপুটে খায়। নৌকা নূহ নবীর কিস্তি, নৌকা মানবজাতি, পশু-পাখি সব রক্ষা করেছিল। এই নৌকা বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে। আর যারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের গাড়িতে রক্তস্নাত পতাকা তুলে দেয়, যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে নাÑ তাদের দিয়ে কখনো দেশের উন্নয়ন হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চাই।
স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে তাদের হাতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দেয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ধিক্কার জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধিক্কার জানাই বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে, যারা ওই স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছিল এ দেশের পতাকা। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু থাকতে পারে না। অবশ্য তাদের লজ্জা-শরম একটু কম। তারা নিজেরাই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর যারাই (জিয়া-এরশাদ-খালেদা) ক্ষমতায় এসেছিল, কেউই দেশের উন্নয়ন করেনি। নিজেরা লুটপাট, চুরি ও দুর্নীতি করেছে।
১ এপ্রিল চাঁদপুর স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার অঙ্গীকার চাইলে উপস্থিত লাখো মানুষ দুহাত তুলে ভোট দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ সময় নৌকা মার্কার স্লোগানে পুরো স্টেডিয়াম ছাপিয়ে চতুর্দিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। জনসভায় ভাষণ দেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুর জেলার সার্বিক উন্নয়নে ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম পাটওয়ারী দুলালের পরিচালনায় বিশাল এ জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, ত্রাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হানুরুর রশীদ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য গোলাম মাওলা নকশীবন্দী, সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম (অব.) বীর উত্তম, ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ প্রমুখ।
এর আগে জনসভা প্রাঙ্গণ থেকে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নতুন ভবনসহ ৪৮ প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ২৫টি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, ২৩টি উদ্বোধন। প্রধানমন্ত্রী জনসভা মঞ্চে ওঠার সময় মাইক থেকে স্লোগান ওঠে জননেত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম, শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাত তুলে জনসভায় আগতদের অভিবাদন জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ইলিশ আকৃতির স্মারক তুলে দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ। এ সময় উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।
জনসভায় উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আমার কাছে কিছু না চাইলেও আমি খালি হাতে আসিনি। আমি আজকেই ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। চাঁদপুরে একটা মেডিকেল কলেজ নির্মাণ আমরা করে দেব। কারণ আপনাদের সংসদ সদস্য নিজেই একজন ডাক্তার। উনি দাবি করেছেন, এটা করে দেব। এ ছাড়া এই এলাকার হাইমচরে একটা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আমরা করে দেব, যাতে লোকজনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। পর্যটনের ব্যবস্থা করে দেব, কারণ এটা নৌভ্রমণের জন্য একটা সুন্দর জায়গা। কেননা এটি পদ্মা-মেঘনার সঙ্গমস্থল। এখানে পর্যটন বিকাশে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এতিমখানার জন্য টাকা এসেছে। বিদেশ থেকে টাকা দেয়া হয়েছে এতিমের জন্য। কিন্তু একটা টাকাও এতিমের হাতে যায়নি। সে টাকা বিএনপি নেত্রীরা সব লুটপাট করে খেয়েছে। আজকে এতিমের টাকা চুরির দায়ে সাজা ভোগ করছেন খালেদা জিয়া। তার জন্য নাকি আবার আন্দোলন করবে? তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে আছে, এতিমের হক কেড়ে নিও না। এতিমকে দাও। অথচ সেই অপকর্মটা করতেও তারা পিছ পা হয়নি। তাদের লোভ এত বেশি যে, লোভের মাত্রাটা ছাড়িয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের বিবরণ তুলে ধরে বলেন, চাঁদপুরের উন্নয়নের জন্য যা যা প্রয়োজন তা করেছি। আমরা যখনই সেবা করার সুযোগ পেয়েছি, তখনই জনগণের সেবা করেছি। নৌকায় ভোট দিলে কেউ খালি হাতে ফেরে না। নৌকায় ভোট দিলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যায় আমরা তা প্রমাণ করেছি। আর বিএনপি-জামায়াত সরকারে এলে শুধু লুটে খায়। সন্ত্রাস, বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলায় তারা পারদর্শী। তারা আন্দোলনের নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ দেশ গড়ে, উন্নয়ন করে। কিন্তু তারা (বিএনপি-জামায়াত) ধ্বংস করে। বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে নারকীয় তা-ব, ধ্বংসযজ্ঞ ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যার কথা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ৯২ দিন ধরে অফিসে বসে থেকে হুকুম দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করার হুকুম দিয়েছেন। ওই সময় অসহায় মা চোখের সামনে দেখেছে নিজের মেয়ে পুড়ে মারা যাচ্ছে, বাবা দেখছে সন্তানকে পুড়ে মরতে, সন্তানকে দেখতে হয়েছে বাবাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এ ধরনের নিষ্ঠুর নৃশংসতা তারা ঘটিয়েছে। আমরা এ ধরনের নৃশংস হত্যাকা- আর দেখতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছিল, কেউই উন্নয়ন করেনি। ক্ষমতায় থেকে শুধু নিজেরা লুটপাট করেছে, চুরি করেছে, দুর্নীতি করেছে। এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেয়া মামলায় উনি (খালেদা জিয়া) কারাগারে সাজা খাটছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। আমাদের অনেক নেতাকর্মী মারা গেছেন, এমনকি চাঁদপুরেরও একজন মারা গেছেন। বারবার তারা আঘাত দেয়ার চেষ্টা করেছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে গেছি। বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিণত করাই আমার লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণ শেষ করেন।