অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমছে না : খুশি সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্ঝঞ্ঝাট মানুষের রক্ষাকবচ বলা হয় সঞ্চয়পত্রকে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণকারীরাই এর প্রধান গ্রাহক। এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসাকে যারা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, তারাও নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন। সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর দেশের অনেক সাধারণ পরিবারের জীবনযাপন নির্ভর করে বিধায় সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ানো-কমানোর দিকে অনেকেরই দৃষ্টি থাকে। বলা হয়, সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ালে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ে আর কমালে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে। চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। এ সময়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমালে জন-অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হতে পারে এজন্য সরকার সে পথে যাবে না বলে আগেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। অবশেষে ৭ এপ্রিল সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া। সরকারের এ সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ খুব খুশি হয়। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই বলা হচ্ছিল সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমছে।
সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাতে নানামুখী দাবি থাকলেও উপকারভোগীদের কথা চিন্তা করে এ খাতের ৪টি স্কিমের সুদের হার কমানো হবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া। রাজধানীর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভবনে সঞ্চয় সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ৪টি স্কিমের সুদের হার কমাবে না সরকার। কমানোর জন্য দাবি আছে, কিন্তু এ খাতের সুবিধাভোগীদের কথা চিন্তা করে আমরা কমানোর সিদ্ধান্ত নেব না। এ খাত থেকে সরকারও কর পায়। চলতি অর্থবছরের গত ৬ মাসে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা কর পেয়েছে।
সঞ্চয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ৭ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত অতীতের ন্যায় এবারো পালন হচ্ছে সঞ্চয় সপ্তাহ। এ উপলক্ষে ৭ এপ্রিল রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ে অবস্থিত এনএসসি ভবনে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শামসুন্নাহার বেগম। এর আগে এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর জন্য ব্যাংকাররা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা মনে করেন, ব্যাংকগুলোর চাইতে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ক্ষেত্রবিশেষে বেশি হওয়ায় ব্যাংকে টাকা না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনছে মানুষ। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও এ খাতের সুদের হার কমানোর পক্ষে। তাদের যুক্তি, এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থ আহরণ হওয়ায় এজন্য বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। কেননা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার মাধ্যমে সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে ঋণ নেয়। ফলে প্রয়োজনের চাইতে বেশি ঋণের বিপরীতে সরকারকে সুদসহ বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই থেকে ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত ৮ মাসেই এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আলোচ্য সময়ে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ১২০ কোটি টাকার। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকিং খাত নিয়ে নানামুখী আলোচনার কারণেও অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন বলে জানা গেছে।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই থেকে ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৫৩ হাজার ৮৩১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। এই অর্থের মধ্য থেকে অতীতে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল টাকা ও সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। শুধু মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। মূল ও সুদের অর্থ বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট অর্থকে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই হিসেবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে এই খাত থেকে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্র“য়ারিতে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। এর আগের মাস জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্র থেকে তা ছিল ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের ৮ মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ খাতে গত ৮ মাসে নিট ঋণ এসেছে ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, নিট ঋণ ৮ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ৫ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ এসেছে ২ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। তাছাড়া মেয়াদি হিসাবে জমাকৃত অর্থ রয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে নিট ঋণ আছে ১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের দিকে মানুষের আগ্রহের বড় কারণ এ খাতে বিনিয়োগ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। ফলে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার ব্যাংকের কাছাকাছি হলেও এ খাতে সাধারণ মানুষ বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বর্তমানে ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৫ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখন ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৩ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
তবে জানা গেছে, সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সায় না থাকলেও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের অনেকেরই সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ানোর প্রতি সায় আছে। সরকারদলীয় নেতাদের কথা হলো সঞ্চয়পত্রের সুদ যদি আগের মতো ১৩ শতাংশের মতো হতো, তাহলে সরকারের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যেত। সে হিসাবে, নির্বাচনি বছর হিসেবে এখনই মোক্ষম সময় সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ানো। অপরদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কথা হলো সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ালে মানুষ ব্যবসাবাণিজ্য বাদ দিয়ে জমাকৃত অর্থ সব সঞ্চয়পত্র কেনার কাজেই ব্যয় করবে। এতে দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেবে, ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়বে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় দিক ঠিক রাখার জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদ কমপক্ষে ১২ শতাংশ হওয়া উচিত এবং তা চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর করা উচিত। এতে সরকারের জনপ্রিয়তাও বাড়বে এবং মাত্র ১ শতাংশ সুদ বাড়ানোর কারণে তা অর্থনৈতিক স্থবিরতায় তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।