প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৫তম বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক করতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৫তম বৈঠক (সিএইচওজিএম)-এ উদ্বোধন হয় ১৭ এপ্রিল লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে। কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের এ বৈঠক উদ্বোধন করেন ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ। আর এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। সিএইচওজিএম-এর বৈঠকের প্রথম দিনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য কানেকটিভিটি এজেন্ডা বিষয়ক (উইন্ডসর) ঘোষণা গ্রহণ সংক্রান্ত ‘একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কমনওয়েলথভুক্ত ৫২টি দেশের সরকার প্রধানদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরো টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক করতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সালে মাল্টায় অনুষ্ঠিত সিএইচওজিএম-এ সূচিত ‘কমনওয়েলথ বাণিজ্য অর্থায়ন সুবিধা’র আশু কার্যকরকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সবসময় একটি নিয়মভিত্তিক স্বচ্ছ, অংশীদারিত্বমূলক ও ন্যায্য বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বিক শান্তি, অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ফিজিক্যাল কানেকটিভিটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) উপ-আঞ্চলিক কানেকটিভিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটন ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বলেন, কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণÑ যাতে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং কাক্সিক্ষত উন্নয়ন বিকশিত হয়। একটি জাতি হিসেবে জন্মের পর থেকেই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা এবং আমাদের জনগণের মানবাধিকার ও অভ্যন্তরীণ নীতিভিত্তিক উন্নয়ন আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
নীল অর্থনীতির সুফল পেতে
প্রযুক্তি ও গবেষণা বিনিময়ের
আহ্বান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
১৭ এপ্রিল কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের ২৫তম বৈঠক (সিএইচওজিএম)-এ উদ্বোধনী দিনে ‘একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ (কমনওয়েলথ ব্লু চার্টার)’ শীর্ষক এক অধিবেশনে অংশ নিয়ে তাঁর দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে সামর্থ্য বিনির্মাণ এবং প্রযুক্তি, গবেষণা ও উত্তম উদ্যোগ বিনিময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর তাদের অঞ্চলের বাইরেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। নীল অর্থনীতির ধারণা বেগবান হওয়ায় এই প্রয়োজনীয়তাটা আরো পরিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশ কমনওয়েলথ নীল সনদ গ্রহণকে পুরোপুরি সমর্থন করে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশ এবং বিমসটেক, সার্ক ও আইওআরএ-এর সদস্য হিসেবে মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ নীল অর্থনীতিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এই সনদে ব্লু চার্টার অ্যাকশন ফান্ড ও ব্লু চ্যাম্পিয়ন্স গঠনসহ বেশকিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগের কথা বর্ণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ সনদকে যথাশিগগির সম্ভব কার্যোপযোগী করে তুলবে।
একটি অধিকতর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ (কমনওয়েলথ সাইবার ডিক্লারেশন)’ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আইসিটি খাতের উন্নয়ন বাংলাদেশে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার, যা ইতোমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন অর্জন করেছে। ‘আমরা বিশ্বাস করি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং এ সংক্রান্ত সামর্থ্য নির্মাণ ডিজিটাল বিভাজন হ্রাস, দারিদ্র্য প্রশমন, টেকসই উন্নয়ন ও সার্বিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের গোড়ার কথা।’ শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বে বর্তমানে যেখানে আমাদের অর্থনীতিগুলো বর্ধমান হারে অবাধ ও তথ্য প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে সেখানে বিভিন্ন দেশ, সেক্টর ও সংস্থাগুলোতে একটি মুক্ত, গতিশীল ও নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য আমাদের বৈশ্বিক তথ্য ইকোসিস্টেমে ‘উন্মুক্ততার প্রসারে কাজ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, একই সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাইবার হামলা ও সন্ত্রাসবাদের প্রচারের হুমকি মোকাবিলাও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কমনওয়েলথ সাইবার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঘোষণার রূপরেখা অনুযায়ী সাইবার গভর্ন্যান্সে সহযোগিতার জন্য মূলনীতি ও দিকনির্দেশনাসমূহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এ ঘোষণা আশু বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে যথাযথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কমনওয়েলথ সচিবালয়ের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘কারিগরি ও বিশেষায়িত দক্ষতা বিনিময় ও সামর্থ্য বিনির্মাণ আমাদের জনগণের জন্য অবশ্যই একটি অগ্রাধিকার হিসেবে চাই।’

এশীয় অঞ্চলের ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীলতা : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এশিয়ার ভবিষ্যতের প্রধান চাবিকাঠি হচ্ছে শান্তি ও স্থিতিশীলতা। তিনি এ অঞ্চলের অধিকতর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এশিয়াকে আরো শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অঞ্চলে পরিণত করতে দেশগুলোর সেতুবন্ধ ও যোগাযোগ গড়ে তুলতে এশীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি স্থিতিশীলতার মাঝেই এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিহিত। এ জন্য আমাদের আন্তঃসম্পর্ক ও যোগাযোগ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের মত বিনিময় ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে’।
প্রধানমন্ত্রী ১৬ এপ্রিল লন্ডনের গিল্ড হলে ‘এশিয়ান লিডারস রাউন্ড টেবিল : ক্যান এশিয়ান কিপ গ্রোয়িং’ শীর্ষক কমনওয়েলথ বাণিজ্য ফোরামের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দানকালে এ আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সীমান্তের মধ্যকার সমৃদ্ধি ও সমতা প্রবৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং সম্মিলিত বিকাশের মাধ্যমে আমরা শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অঞ্চল গড়ে তুলতে পারি’।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুগো সুইরি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা দেন এবং এর সঞ্চালক ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সিইও জেরিন দারুওয়ালা। শেখ হাসিনা বলেন, এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে কেবল অভ্যন্তরীণ নয় বরং এশিয়ার অঞ্চলব্যাপী আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিপুল জনশক্তি, সবচেয়ে বড় বাজার এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই এশিয়ার আয়ত্তে ছিল বিগত দিনের বিশ্ব এবং আগামী বিশ্বও তাকিয়ে আছে এশিয়ার দিকে। গর্বের বিষয় হচ্ছে এশিয়ার মানুষ সহিষ্ণু, কঠোর পরিশ্রমী, সামর্থ্যবান, প্রতিভাবান ও আশাবাদী। এজন্য বিগত ৭০ বছরে এশিয়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিজ্ঞজন এশিয়ার এই সাফল্যকে বিস্ময়কর হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভাষণের এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথাও বলেন যে, সত্যিকার এশিয়ার চেতনার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে সচেতন থাকতে হবে। কারণ বিশ্ব এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে নিকটতর করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও সৃষ্টি করছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা স্থিতিশীলতার হুমকি হিসেবে সন্ত্রাসবাদ, সংঘাত, আর্থিক অভিঘাত ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এ অঞ্চলের অগ্রযাত্রার পথে আরো অনেক বাধা-বিপত্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। আর এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শেখ হাসিনা এশিয়ার প্রতিভা বিকাশে তরুণ, নারী ও সর্বোপরি নাগরিকদের আরো বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ডিজিটাল, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি চালিত আগামী দিনের এশিয়ার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রত্যাশা পূরণে কমনওয়েলথের
সংস্কার চাইলেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণের জন্য কমনওয়েলথকে তার লক্ষ্য অর্জনে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৪টি স্তম্ভের নিরিখে এই সিএইচওজিএম-এ চিহ্নিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলেও সংস্কার অপরিহার্য।’
শেখ হাসিনা বলেন, কমনওয়েলথের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কার্যক্রমের পুনর্গঠন প্রয়োজন, যাতে সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণ হয়। ‘আমরা কমনওয়েলথের একটি ব্যাপক সংস্কারের জন্য একটি বিশিষ্ট ব্যক্তি গ্র“প (ইপিজি) গঠনের সুপারিশ করছি। প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে কমনওয়েলথ সচিবালয় পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই সিএইচওজিএম সভায় নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনেই এর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি চার্টার এবং ২০৩০ উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে লক্ষ্যমাত্রার আলোকে মহাসচিবের কৌশলগত পরিকল্পনা-২০২০-২১-এর মূল্যায়ন করেন। বার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সচিবালয়ের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পদক্ষেপটিকে কমনওয়েলথের বৃহত্তর ও ব্যাপক সংস্কারের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এতে করে এটি আরো মানুষ এবং উন্নয়ন কেন্দ্রিক হবে। এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা পরামর্শ দেন যে, সচিবালয় যেনো উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সহায়তায় তার লক্ষ্যকে আরো জোরদার করে। তিনি বলেন, কমনওয়েলথ ঘোষণার কানেকটিভিটি, সাইবার সিকিউরিটি, গভর্ন্যান্স এবং ব্লু চার্টার সম্পর্কিত বিষয় বাস্তবায়নের জন্য কমনওয়েলথ সচিবালয়ের উচিত একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা। শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে কমনওয়েলথ তাদের কাজের ফলশ্রুতিকেন্দ্রিক প্রয়াসগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করবে, যার মধ্যে থাকবে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও টেকসই উন্নয়ন এবং অধিকাংশ সদস্য দেশের বাস্তব চ্যালেঞ্জসমূহ।
নাজুক পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ মিনিস্ট্রিয়াল অ্যাকশন (সিএমএজি) গ্র“পের ভূমিকা স্পর্শকাতর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে বলেন, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝে সে অনুযায়ী এবং কমনওয়েলথ ঐক্যের চেতনাকে সামনে রেখে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। গণতন্ত্র ও সুশাসন, আইনের শাসনই লক্ষ্য থাকতে হবে। কেননা এগুলো হলো টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর গণতন্ত্র রক্ষা, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সহায়তা ও সম্পৃক্ত হওয়াটাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
শেখ হাসিনা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২৫তম সিএইচওজিএম কমনওয়েলথকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দারিদ্র্যমুক্ত, প্রগতিশীল, সমৃদ্ধ, স্পন্দনশীল এবং স্বপ্নদর্শী কমনওয়েলথ হিসেবে অনুধাবনে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর
সমাধান চাইলেন শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর সমাধান চেয়ে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সাম্প্রতিক সময়ে নির্যাতনের মাধ্যমে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুরো চাপ বাংলাদেশ একাই সামলাচ্ছে।
১৭ এপ্রিল ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই)-এ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট স্টোরি : পলিসিজ, প্রগ্রেসেজ অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তৃতা উপস্থাপনকালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ এ সংকটের শান্তিপূর্ণ, টেকসই ও কার্যকর সমাধান চায়।’ তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী দমন অভিযান শুরু করার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লোকদের সংখ্যা এখন ১১ লাখ। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় তাদের আশ্রয় দিয়েছে।’ শেখ হাসিনা সরেজমিনে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিজ চোখে দেখেছেন উল্লেখ করে বলেন, অনেক বিশ্ব নেতা কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিগত কয়েক বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে বাংলাদেশকে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সাফল্যের মানে এই নয় যে, আমাদের সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বাংলাদেশের ভিতর ১০ লক্ষাধিক দেশান্তরি মিয়ানমার নাগরিকের অভিবাসনের পাশাপাশি আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় লড়াই করছি।’
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু দূষণে খুবই নগণ্য ভূমিকা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে মারাত্মক শিকারে পরিণত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ স্থানচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই গ্রহ, আমাদের জীববৈচিত্র্য এবং আমাদের জলবায়ু সুরক্ষিত করা বিশ্ব সম্প্রদায়ের অভিন্ন দায়িত্ব।’ এই পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। তাঁর দল ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, জঙ্গিবাদের উত্থান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য আমাদের রোডম্যাপ ভিশন-২০২১ প্রণয়ন করেছি। দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করি। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ষষ্ঠ পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। এতে পল্লীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং পল্লী এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে এসএমই’র জন্য তহবিল সংগ্রহ করছি। খাদ্য উৎপাদনে দেশকে স্বাবলম্বী করতে কৃষি সেক্টরে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছি এবং খাদ্যশস্য, মৎস্য, পোল্ট্রি ও শাকসবজি উৎপাদনে বিশেষ ইনসেন্টিভ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আমাদের পোশাক কারখানাগুলোকে নিরাপদ করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৭টি লিড সনদধারী তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। ৭টি পরিবেশবান্ধব কারখানা ও বস্ত্র কারখানা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, তার সরকার ব্যবসাবাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সকল দেশের সঙ্গে বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। রূপান্তরযোগ্য প্রযুক্তির জন্য আমাদের জ্ঞান ও ইনোভেশন অংশীদারিত্বের প্রয়োজন। আমরা জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছি। বাংলাদেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী ও শান্তিপূর্ণ দেশ করতে ভিশন-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম হবে বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।